“অ্যাওয়ার্ডের চেয়েও দর্শকের ভালোবাসা আমার আসল পুরস্কার ” রাজচন্দ্র নূর !

রাণী

‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালের জনপ্রিয় চরিত্র বাবু রাজচন্দ্র দাশ। এই দীপ্তমান চরিত্রের ভূমিকায় করেছেন গাজী আবদুন নূর। এই ঐতিহাসিক চরিত্র করে কি কি অভিজ্ঞতা হল, কেমন লাগল, নতুন কি রূপে কামব্যাক করবেন নূর? সেইসব কথা নূর অকপটে জানালেন Gulgal.com কে।

গাজী আবদুন নূরের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ও লিখেছেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালের দর্শক তাঁরা সবাই জানেন ইতিহাস ও সিরিয়ালের গল্পানুযায়ী রাজা রাজচন্দ্র দাশের মহাপ্রয়াণ ঘটেছে। তাই সিরিয়াল থেকে ইতি টানছেন গাজী আবদুন নূর। নূরকে আর দেখা যাবেনা এই সিরিয়ালে। নূরের গুণমুগ্ধরা ফ্যানরা খুবই মিস করবে নূরকে। দেখা গেলেও ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে আসবেন রাজচন্দ্র। এই মেগায় শেষ দিনের শ্যুট সারলেন নূর। তারপর ? আমরা কি ভাবে পাবো নূর কে? তাই এই সাক্ষাৎকার।

ইতিহাসে রাজা রাজচন্দ্র দাশের তুলনায় সব জায়গাতেই রাণী রাসমণির বিবরণ ও প্রচার বেশী হয়ে এসছে। মাস লেভেলে রাণী রাসমণি ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দক্ষিনেশ্বর মন্দির নিয়ে চর্চা প্রচার আলোচনা হয়ে এসছে। কিন্তু এই রাজা রাজচন্দ্র দাশের অবদান কম নয়। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে আমরা কতটা ওয়াকিবহাল ছিলাম? হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পাতা থেকে রাজচন্দ্রকে জনতার দরবারে এনেছেন যিনি তিনি গাজী আবদুন নূর। আমাদের সবার প্রিয় নূর। বাংলাদেশের ছেলে নূর। যদিও নূর এখন কলকাতার ও দুই বাংলার নয়নের মণি। নায়ক তাঁর ব্যস্ত শ্যুটিং শিডিউল শেষ করে বাড়ি ফিরে রাত বারোটায় নিজেই ফোন করলেন। সকালে সময় দিতে পারেননি বলে আক্ষেপ করলেন শুরুতেই। এত জনপ্রিয় মহাতারকা এত অমায়িক যা মুগ্ধ করার মতো।

এবার চলে আসি মূল পর্বের প্রশ্নোত্তর পর্বে,

প্রশ্ন – ‘‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালে রাজা রাজচন্দ্র দাসের ঐতিহাসিক ভূমিকায় অভিনয় করে কেমন লাগল?

নূর – রাজা রাজচন্দ্র দাস একজন ঐতিহাসিক চরিত্র যে চরিত্রটি করতে পেরে আমি ধন্য। চরিত্রটি একজন মুক্তমনা শিক্ষিত ব্যক্তির যে সবার আদর্শ। চরিত্রটি নিয়ে মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও বিশ্বাস জড়িত। আমি চেষ্টা করেছি সেই মর্যাদা রাখতে। এই চরিত্রটি আমার অভিনয় জীবনে আরো দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দিয়েছে। একটা প্রবাদ বাক্য আছে, একজন পুরুষের সাফল্যের পেছনে তাঁর স্ত্রীর ভূমিকা থাকে। কিন্তু এখানে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। রাজচন্দ্র স্ত্রীকে বলেছিলেন, “আমার লোকসমাজে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি বড় হও। সবাই তোমাকে জানুক রাণী।” সেই যুগে একজন স্বামী কতটা উদার তাঁর স্ত্রীকে সবরকম অধিকার দেন, নিজের সম-মর্যাদা দেন সহধর্মিনীকে। স্ত্রীকে কুসংস্কার আছন্ন সমাজের আলোকবর্তিনী করে তোলেন। ইতিহাসে রাজচন্দ্র দাশ সেরকম একজন মানুষ। যার সম্পর্কে মানুষ কম জানে। রাজচন্দ্র দাস হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা, সড়ক নির্মাণ, বিখ্যাত বাবু ঘাট নির্মাণ, সতীদাহ প্রথা রোধ এগুলো সব করেছেন। তাই তাঁর ভূমিকা কম নয়। আর আমি যে সেই চরিত্র করে মানুষের মন জয় করতে পেরেছি সেটা ভগবানের আর্শীবাদ।

প্রশ্ন – এবার আসি শুরুর গল্পে, ছেলেবেলার গল্প একটু বলুন,

নূর – আমার জন্ম বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা। কিন্তু ছেলেবেলা, পড়াশুনো,বড় হওয়া সব যশোরে। যশোর জেলা স্কুলে পড়া ছোটো থেকে ক্লাস টেন বোর্ড পরীক্ষা। তারপর যশোর সিটি কলেজ থেকে টুয়েলভ উচ্চমাধ্যমিক। এরপর কলকাতা চলে আসা এক নতুন স্বপ্ন নিয়ে। নাটক নিয়ে পড়তে আগ্রহী হই। মঞ্চনাটকের সঙ্গে জড়িত হই বাংলাদেশেই। এরপর কলকাতায় আসা। ওই সময় কলকাতায় নাটক নিয়ে পড়াশোনা করার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয়। যোগাযোগ করি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। নাটক নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়ে যাই। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা বিভাগে ভর্তি হই অনার্স নিয়ে। স্নাতক ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে পাশ করার পর রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ি। আমার খুব অল্প বয়সে বাবা মারা যান। তাই মা একা হাতে আমাদের ভাই বোনদের মানুষ করেছেন। মা বাংলাদেশের পৈতৃক ভিটে মাটি ছেড়ে কলকাতায় থাকতে রাজী হন না তাই আমি এখানে থাকি। মা বাংলাদেশে। মাঝেমধ্যে মা বোনরা আসে কলকাতায়। কলকাতায় শুরু থেকেই কাজের সন্ধানে ছিলাম। সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে যেমন হাতে কলমে কাজ করেছি তেমনি ক্যামেরার পিছনেও কিছুদিন কাজ করেছি।

প্রশ্ন – এরপর রাণি রাসমণি করার সুযোগ কি ভাবে এল?

নূর – ক্যামেরার পিছনে বেশীদিন কাজ করতে হয়নি। চলে এলাম অভিনয়ে ক্যামেরার সামনে সুযোগ পেয়ে। প্রথমেই রাসমণি নয়। আগে একটা দুটো সিরিয়ালে করেছি কিন্তু প্রথম দিন গিয়েই তারপর দিন থেকে আর যাইনি। ইন্ডাস্ট্রিতে প্রযোজক পরিচালক কারুর সঙ্গেই আমার সম্পর্ক খারাপ নয়। কিন্তু ঐ মেগা গুলোতে আমার চরিত্রের করার মতো কিছু ছিলনা। নিজে যে কাজটায় পূর্ণতা না পাব ভালো না বাসতে পারব সেটা করে কি লাভ। আর ঐ চরিত্র গুলোতে নতুনত্ব কিছু ছিলনা। নিজের মন থেকেই আর যেতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু তারপরই একজনের সূত্রে জানলাম রাণী রাসমণির জীবন অবলম্বনে মেগা আসছে অভিনেতা খুঁজছে। আমায় অডিশন দিতে বলেন।

প্রশ্ন – কি ভাবে সিলেক্ট হলেন রাজচন্দ্র দাশের র চরিত্রে?

নূর – কাজ পাওয়াটা মোটেই সোজা ছিলনা। অডিশনে গেছিলাম একটা মনের জোর নিয়ে। নাটক নিয়ে পড়ার জন্য কিছুটা আত্মবিশ্বাস ছিল। অডিশনে রাজচন্দ্র চরিত্রের জন্য অডিশন দিতে প্রায় দুশো জন এসছিল। আমার সিরিয়াল নম্বরও একশোর পরে ছিল। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি।

প্রশ্ন – এই ঐতিহাসিক চরিত্র করতে গিয়ে নিজেকে কি ভাবে গড়লেন?

নূর – রাজচন্দ্র দাস কে ইতিহাসে সেভাবে পাওয়া যায়না। রানিমার মতো প্রচার পাননি সেভাবে। তাই সেই চরিত্র করতে আমি নিজে অনেক রিসার্চ করেছি এই চরিত্রটি হয়ে উঠতে। আমাদের এই ‘ করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালের গবেষক শিবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিহাসধর্মী মেগায় শিবাশীষদার মতো গবেষক এখন আর কেউ নেই। উনি অসাধারন। যার জন্য আমার চরিত্র সহ সব চরিত্র গুলোই এত জনপ্রিয় হয়েছে।

প্রশ্ন – এই পাকানো রাজা সুলভ গোঁফ টার রহস্য কি?

নূর – এই গোঁফ টা অরিজিনাল। এই আমার গোঁফ, এই দাড়ি এই লুকস আমি নিজে নিজে তৈরী করেছি, রাজচন্দ্রর সম্বন্ধে যা যা তথ্য পেয়েছি সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে। পুরো নিজের লুকস আমি খেটে তৈরী করেছি। উচ্চারন শুদ্ধ করেছি। হাঁটা চলা বসা তাকানো এগুলো রীতিমত খেটে তৈরী করেছি। জমিদার লুক, রাজচন্দ্র সুলভ লুক আনতে চেয়েছি।

প্রশ্ন – তার মানে নিজেকে রাজচন্দ্র তে যাপন করেছেন?

নূর – একদম। শুধু লুকস নয়। আমার কলকাতার বাড়ির ঘরটা যদি দেখেন, এই যে খাটে বসে ইন্টারভিউ দিচ্ছি সেটা পুরনো আমলের বড় পালঙ্ক খাট, এমনকি আলমারি প্রভৃতি আসবাব আমার ঘরের লুকটাই সব পুরনো সব আসবাব প্রাচীন জমিদারবাড়ির। আমি এই প্রাচীন জমিদার রাজাদের বাড়ির আসবাব সব সংগ্রহ করেছি নিলামে। শ্যুটিংর সেট আর আমার নিজের ঘর সাজানোতে কোনো তফাৎ রাখিনি। চরিত্রটাতে যাতে আরো মনোনিবেশ করতে পারি তাই পরিবেশটাও ঐ জমিদার দের সময়কার মতো করেছি। ইভেন আমি এই ‘ করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ করতে করতে অন্য সিরিয়াল করিনি। যাতে এই চরিত্রে প্রভাব না পড়ে। রাজচন্দ্র হয়ে থাকতেই চেয়েছি। কিন্তু এখন আমার রাজচন্দ্র রোল শেষ এবার নিজেকে পাল্টাবো। নিজেকে আরো সময় দেব।

প্রশ্ন – আমাদের এখানে ‘রাণী রাসমণি’ নিয়ে ফিচার ফিল্ম হয়েছে স্বর্ণযুগে মলিনা দেবী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত, নব্বই দশকে মেগা সিরিয়াল হয়েছে ‘রাজেশ্বরী’ নামভূমিকায় অনুরাধা রায়। সেগুলোও আইকনিক কিন্তু এতকাল রাণী রাসমণির বিধবা বেলা থেকেই দেখানো হয়েছে। রাসমণির কিশোরীবেলা, যৌবন বেলা, বিবাহ, স্বামী, জীবন যৌবন ইত্যাদি দেখানো হয়নি। সোজা কথায় বলতে গেলে রাণী রাসমণি তো মহানারী ভগবতীসম তাঁর প্রেম, ভালোবাসা, রোম্যান্টিসিজম দেখানো হয়নি। কিন্তু এই জি বাংলার ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ ই প্রথম রাজা রাণী র রোম্যান্টিসিজম দেখালো। এইটা তো সাধুবাদযোগ্য।

নূর – মানুষ তো অজানাকেই জানতে চায়। অদেখাকেই দেখতে চায়। এগুলো ইতিহাসে আছে কিন্তু রাজচন্দ্র রাসমণি শুধু নয় তাঁদের পূর্বপুরুষ পূর্বনারীদেরও এখানে দেখানো হয়েছে। বললাম যে শিবাশীষ দা (বন্দ্যোপাধ্যায়) এত সুন্দর ডিটেল রিসার্চ করেছেন যে সিরিয়াল টা এত জনপ্রিয় হয়েছে। আর আমাদের প্রতি শটের পরে পরিচালক বলতেন আমরা খুশি তো শট টা দিয়ে! প্রতিটা শট খুব খুঁটিয়ে করা হয়। সবার মিলিত প্রচেষ্টায় রাজচন্দ্র-রাসমণির টি আর পি তে এক নম্বরে থেকেছে, থাকে। অজানা ঘটনা দেখাতেই এই মেগা বানানো। এবার মেগা সিরিয়াল কিছু একটু বাড়তি দেখাতেই হয়। কিন্তু ইতিহাসকে বর্তমান করেছে এই সিরিয়াল। এই সিরিয়াল দেখেই রাজচন্দ্র সম্পর্কে এত লোক জানল, জানতে আরো আগ্রহী হবে। এখানেই সার্থকতা।

প্রশ্ন – রাসমণি দিতিপ্রিয়ার সঙ্গে অভিনয় করে কেমন লাগল? রাণী ডাকটা কতটা মিস করবেন?

নূর – দিতিপ্রিয়া গড গিফটেড অভিনেত্রী। ও এতো ছোটো বয়সে এত কঠিন চরিত্র যে ভাবে অভিনয় করছে সেটা কুর্নিশযোগ্য। পরবর্তী রাসমণির চরিত্রেও ও সেরা। ওকে আরো বড় জায়গায় দেখতে চাই। দিতিপ্রিয়ার এত ভালো অভিনয়ের জন্য আমাদের কেমিস্ট্রি দর্শক এত পছন্দ করেছে। রাণী ডাকটা মিস করব। দিতিপ্রিয়া শুধু নয় গৌরবদা, চন্দ্রনীভদা, সুছন্দা দি, সমতাদি সবাই খুব ভালো অভিনয় করে। এদের সবাইকেই মিস করব। ফোনে যোগাযোগ থাকবে। মাঝেমাঝে মিটও হবে নিশ্চয়ই। ঐ সেট টাকে খুব মিস করব। টেকনিশিয়ানস দের খুব মিস করব।

প্রশ্ন- রাজচন্দ্র করে কোনো স্মরণীয় মুহূর্ত?

নূর – অনেক মানুষের ভালোবাসা। যেটার ঋণ আমি শোধ করতে পারবনা। অ্যাওয়ার্ড ফাংশানের অ্যাওয়ার্ডের চেয়েও দর্শকের ভালোবাসা আমার আসল পুরস্কার। স্মরণীয় দুটো ঘটনা বলছি, রাজচন্দ্রের ভূমিকায় আমার অভিনয় দেখে বাপ্পি লাহিড়ী আমার সঙ্গে দেখা করেন। উনি এখানে কলকাতায় এসছিলেন এবং আমার সঙ্গে নিজে এসে দেখা করেন। এই ঘটনা আমার জীবনে একটা বিশাল প্রাপ্তি। উনি আমার কাজ ফলো করেছেন। বাপ্পিদার মতো লিভিং লেজেন্ড আমার প্রথম কাজ এত ভালোবেসেছেন প্রশংসা করেছেন ওনার ভালোবাসা আমার কাছে আর্শীবাদ।

আরো একটা মুহূর্ত এটা সুখের নয় যদিও কিন্তু একটা ভালোবাসা।

একজন ভারতীয় তিনি ক্যান্সার পেসেন্ট। কেমোথেরাপি চলছে। মাথার সব চুল উঠে গেছে। তাঁর এই মর্মান্তিক রোগ ভোগের দিনগুলোতে ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ দেখে শান্তি পান আরাম পান। আমি ওনাকে চিনতাম নাহ। উনি এখন আমেরিকায় চিকিৎসা করাচ্ছেন। ওখানেই রয়েছেন। উনি বাংলাদেশের হাইকমিশনে যোগাযোগ করে আমার খোঁজ নেন। কমিশন মারফৎ উনি আমার ফোন নম্বর পেয়ে যোগাযোগ করেন। একজন মানুষ জীবন-বাঁচন লড়াইয়ে শক্তি পাচ্ছেন মনের জোর পান আমার অভিনয় দেখে রাসমণি দেখে। এই একটু আগেও ফোনে কথা হল ওনার সঙ্গে। আমেরিকায় তো বারো ঘন্টা পরে টেলিকাস্ট হয়। কিন্তু উনি আমার লাস্ট এপিসোড দেখবেন নাহ। রাজচন্দ্র কে উনি শেষ যাত্রায় দেখতে চাননা। উনি ওনার মনে রাজচন্দ্রকে রাজার মতোই বাঁচিয়ে রাখতে চান। সেই কথাই বলছিলেন ফোনে। এগুলো তো বিশাল প্রাপ্তি। দর্শকের এত ভালোবাসা। আমি কায়মনোবাক্যে চাই উনি সুস্থ হয়ে উঠুন।

প্রশ্ন – আপনার বাংলাদেশে পরিবারের লোকরা মা বোন আত্মীয় পরিজনরা দেখে এই সিরিয়াল?

নূর – আমার বাড়িতে সিরিয়াল দেখেনা। কিন্তু আমি রাজচন্দ্র করছি আর এমন একটা ঐতিহাসিক সিরিয়াল রাণী মার ইতিহাস নির্ভর তাই দেখে এটা এবং আমি সিরিয়ালে আর না থাকলেও ওরা দেখবে। একটা ভালোবাসা জন্মে গেছে সিরিয়ালটার প্রতি।

প্রশ্ন – এই রাসমণি সিরিয়ালে রাজচন্দ্রর গান গুলো তো বিশাল হিট। ভীষন রোম্যান্টিক ভাবে করেছেন যা বাংলা সিরিয়ালে বিরল। গান গুলো কি আপনার গাওয়া?

নূর – গান গুলো সব ‘সারেগামাপা’ র জীমূত র গাওয়া। জীমূত অসাধারন গেয়েছে। আমার নিজের কন্ঠে গান অনেকেই শুনেছে। অনেক অনুষ্ঠানে কি লাইভে। আমার আর জীমূতের গানের গলা একদম এক। তাই অনেকেই ভাবে আমি নিজে গেয়েছি গান গুলো সিরিয়ালে। গান গুলো আমার জানা। খুব জনপ্রিয়ও। কিন্তু সিরিয়ালে জীমূত খুব ট্যালেন্টেড ও গেয়েছে।

প্রশ্ন – ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালে নূরকে চন্ডী পাঠ করতে দেখা গেছে। বেদ পাঠ, বিভিন্ন হিন্দু ধর্ম গ্রন্থের সংস্কৃত শব্দ নিঁখুত ভাবে উচ্চারন করতে দেখা গেছে। একটা অন্য ধর্মের সবকিছু নিয়ে এত অগাধ জ্ঞান কি করে নূরের? যা হলফ করে বলা যায় কলকাতার বর্তমান কোনো অভিনেতার এত ডিটেলে কাজ করার চর্চা ক্ষমতা কোনোটাই নেই। কাউকে ছোটো না করেই বলছি। এ কারনেই দুশো জনের থেকে নূর রাজচন্দ্র এবং সেরার সেরা।

নূর – ধর্মের কোনো সীমারেখা নেই। আরো অনেক অনেক ধর্ম আছে যে গুলো অবলুপ্ত কিংবা অজানা। আমরা এই কটা ধর্ম নিয়ে বলি কিন্তু আরো অনেক অনেক ধর্ম আছে যেগুলো প্রচার পায়নি। তাঁদের তো আমরা খোঁজ রাখিনা। সবার ঈশ্বর সবার সৃষ্টিকর্তা কিন্তু একজনই। তাই ধর্ম যত জানা যায় তত নিজেকে সমৃদ্ধ করা যায়। আমার বাড়িতে বেদের সব গুলো ভাগ, উপনিষদ, কোরান, বাইবেল একসঙ্গে আছে। সবগুলোই পড়ার চেষ্টা করেছি করি। এ তো জানার শেষ নেই তবু চেষ্টা করি পড়তে। রাসমণী করতে গিয়ে এত বছর আগের ইতিহাস নিয়ে যতটা জানা যায় পড়ার জানার চেষ্টা করে গেছি নিরন্তর। আমি রাজচন্দ্র চরিত্রে যেমন তাঁর বাবামশাইয়ের পারলৌকিক ক্রিয়ায় চন্ডী পাঠ নিজে করেছি। বেদ উপনিষদ কোরান বাইবেল চর্চা আমি করি। যেমন ইতিহাসেও সমাজের নবজাগরণ আনতে হিন্দু মুসলিম খ্রীষ্টান সবার ভালো কাজেরও অবদান আছে। তাই ধর্ম আলাদা বলে কিছু নেই। সবার স্রষ্টা এক পরমেশ্বর তাই সবাই যে কোন ধর্ম চর্চা করতেই পারে। আমার তো কাজে লেগেছে। একজন শিল্পী র কাছে শিল্পই সবচেয়ে বড় ধর্ম।

প্রশ্ন – বাবু রাজচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় শ্যুট এসব তো শেষ এই সিরিয়ালে। এবার কি ভাবে ফিরবেন? দর্শকরা তো আপনাকে বিশাল ভাবে মিস করছে। আপনি আর রাসমণিতে অভিনয় না করলে সিরিয়াল দেখবেনা বলছে। তাই ঘোষনা হচ্ছে মাঝেমাঝে আপনাকে দেখানো হবে সিরিয়ালে। কিন্তু শ্যুট শেষ আপনি আর নেই এই সেটে। এরপর কি? এত দর্শক রাণী ডাকটা মিস করছে? রাজচন্দ্রর লুক কথা বলা মিস করছে।

নূর – আমি টানা দু বছর এই রাসমণি সিরিয়াল করে গেছি। সিরিয়ালটা টি আর পি তে এক নম্বরে পৌঁছে গেছে। তাই প্রায় সপ্তাহে সাত দিনই শ্যুট থাকত আমার। বাড়ির লোকদের একদমই সময় দিতে পারিনি। ইভেন অনেক অভিনয়ের অফার ফিরিয়ে দিয়েছি শুধু রাজচন্দ্র চরিত্রটা তে যাতে এফেক্ট না পড়ে। আমার মা বাংলাদেশে থাকেন। ওখানে আমাদের খুব পুরনো বাড়ি আছে। যেমন হয় পূর্বপূরুষের বাড়ি। আমার অল্প বয়সে বাবা মারা গেছেন। মা ঐ বাবার স্মৃতি ছেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে কলকাতায় থাকতে চায়না। ওখানে আমার বোন আছে। বোনের যদিও বিয়ে হয়ে গেছে। একটা বেবি হয়েছে। তাই আমি এখন বেশ কিছুদিন মা কে সময় দেব। পরিবারের সঙ্গে থাকব। আর এই সিরিয়াল করতে করতে নিজের পড়াশুনোর সময় দিতে পারিনি। আমি আরও উচ্চতর শিক্ষা করতে চাই। সেটা আমার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই করব। পড়ায় মনোনিবেশ করব। আর একটা ছবি শ্যুট করা অনেকদিন আছে সেটার আশা করি রিলিজ হবে এখন। সেই ছবিটির প্রচার শুরু করব আমরা। এটি বাংলাদেশের ছবি। নাম ‘যৈবতী কন্যার মন’। সেলিম আল দীনের কাহিনি থেকে ছবিটি তৈরি করেছেন নারগিস আক্তার। নায়িকা নতুন। সাহিত্যধর্মী গল্প তে ছবি হলে আমার সবসময় অভিনয় করতে ভালো লাগে। অভিনয়ের সুযোগ বেশী থাকে। রাসমণিও ইতিহাসধর্মী ছিল।

প্রশ্ন – মেগা কি করবেন এখন? সবাই চাইছে টিভি খুললেই আবার নূর কে যেন দেখতে পায়।

নূর – এখন আপাতত নয়। গতানুগতিক মেগা চরিত্র করবনা। আমি অন্য সব প্রফেশন ছেড়ে এই প্রফেশনে এসছি যখন কাজটাকে যোগ্য মর্যাদা দিয়ে করতে চাই। দেখুন সেলেব হতে সবাই পারে আজকাল টিভিতে মুখ দেখাতে রোজ পারি কিন্তু ভালো শিল্পী হতে কজন পারে? ভালো শিল্পী হতে চাই সেটাই চেষ্টা করি। আর রাজচন্দ্র-র রেশটা কাটিয়ে একটু বিরতি নিয়ে ফিরব। নিজেকে আরো উন্নত করব।

প্রশ্ন – রাজচন্দ্র র মতো নূরও সতন্ত্র। মেরুদন্ড সোজা করে চলে তার মানে। আবার কি ধর্মীয় / ইতিহাস ভিত্তিক চরিত্র করবে? এখানে টাইপকাস্ট হয়ে যায় অনেকে।

নূর – আমার সেরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভালো করার মতো চরিত্র পেলে করব। অবশ্যই অন্যধরনের চরিত্র সবসময় করতে চাইব। একজন শিল্পীতো বহুমুখী হতে চায়। যেমন ‘যৈবতী কন্যার মন’ সেলিম আল দীনের কাহিনিতে আমি একদম রাজা রাজচন্দ্রর উল্টো চরিত্র করেছি। যে রাজা তো দূর একেবারে প্রজা। একদম ভিন্ন চরিত্র। অনেক মাটির কাছাকাছি। রাজচন্দ্রের বয়স্ক লুক আনতে গিয়ে আমি ওজন বৃদ্ধি করেছিলাম। এমনিতে আমার আগে সিক্স প্যাকস এসব ছিল। একটু মোটা হয়েছিলাম চরিত্রের জন্য। এখন যদি আবার আমায় দেখেন আমি ঝরাচ্ছি নিজেকে। আবার আগের মতো চেহারায় ফিরছি। এখনকার লুক দেখলেই বুঝবেন। তাই একটু বিরতি নিয়ে নিজের লুক, পড়াশুনো চর্চা আরো উন্নত করে ফিরব। এত দর্শকের আশা আকাঙ্খা সেটার দায়িত্ববোধ থেকেই এই চেষ্টা।

প্রশ্ন – রাণী রাসমণির জানবাজারের বাড়িতে আপনি দিতিপ্রিয়া গেছেন। এমনকি আমিও রাণী রাসমণির বাড়ি গুলোর পুজোয় গিয়ে দেখেছি এই সিরিয়াল দেখে ওঁদের জানবাজারের বাড়িগুলোতে দর্শনার্থীর কি ঢল। ওঁরা স্বীকার করছেন সিরিয়ালের কৃতিত্ব। ওঁনারা কি বলছেন মেগা দেখে?

নূর – ওঁরা আমাদের কাজ দেখে প্রশংসা করেছেন। দেখুন এটা মেগা সিরিয়াল তাই একটু এদিক ওদিক করতেই হয় কিন্তু মূল গল্প চেঞ্জ হয়নি। সেটা ওনারা বোঝেন। তাহলে তো দর্শক চাইছে টি আর পি রাখতে রাজচন্দ্রর শ্যুটিং আরো আমি করতাম। না ইতিহাস বিকৃত করে কোনো চরিত্রের সীমা বাড়ানো হবেনা। রাসমণির গল্প এবার রামকৃষ্ণদেব দক্ষিনেশ্বর মন্দির এদিকে ঘুরবে সত্যিকারের রাণী মা আরো বেশী হয়ে উঠবে রাসমণি। জানবাজারের বাড়ির সপ্তদশ প্রজন্মের বিবাহ অনুষ্ঠানে আমায় নিমন্ত্রণ করেছিল। আমি গেছিলাম। ওঁদের কনের যে সোনার হার সেটা দেখার মতো। সেটা ওরা বাইরে কোনো দোকানে পালিশ করেনা ফর সিকিরিউটি। বাড়িতে পালিশ হয়। সেটা কিন্তু পুরো আসল হারের সোনার একভাগ এত প্রজন্ম পর ওঁদের পরিবারের মধ্যে ভাগ হয়েছে। আসল যে হারটা ছিল সেটা কত সোনা কত দেখার মতো ছিল ভাবুন। খুব ভালো ব্যবহার ওঁনাদের। দক্ষিনেশ্বর মন্দিরেও গেছি। মানুষ ভালোবেসেছে। আমাকেই আসল রাজচন্দ্র ভাবছে এগুলো আর্শীবাদ।

শেষ প্রশ্ন – রাজচন্দ্র কে কতটা মিস করছেন এখন? দর্শকদের উদ্দেশ্যে কি বলবেন? তাদের ধৈর্য্য ধরে রাখতে কি বলবেন?

নূর – দর্শকরাই সব। আমার প্রথম কাজ তাতে যা ভালোবাসা পেয়েছি দুই বাংলার, সেটা আশাতীত। রাজচন্দ্র র মতো কেউ স্বামী চায়, কেউ প্রেমিক চায়, কেউ দাদা চায়, কেউ ছেলে চায়, কেউ দেওর চায় বাস্তবে। আমি একটা কাজ করে এই ভালোবাসা গুলো পেয়েছি যেটা আমার কাছেও আশাতীত। রাসমণী শুধু বয়স্ক লোকরা দেখত দেখে তা কিন্তু নয়। আমার বয়সী ছেলে মেয়েরা ছোটোরাও জেন ওয়াইরা আর গুরুজনরা তো আছেনই। আট থেকে আশি এই সিরিয়ালের দর্শক আমায় ভালোবাসেন। এটা ভগবানের আর্শীবাদ ছিল বলেই হয়তো সম্ভব হয়েছে। শ্যুটিং শেষ করে আমি বাবু রাজচন্দ্রর বানানো বাবুঘাটে গঙ্গার ধারেও গেছিলাম। এতদিনের সফর সেটা শেষ হল তাই। কিন্তু রাজচন্দ্র রয়ে যাবে আমার সঙ্গে।

উপসংহার , অনেক ধন্যবাদ নূর এত অকপট সাক্ষাৎকার দেবার জন্য। বাবু রাজচন্দ্র কে এতদিন আমজনতা সেভাবে চিনতইনা। তুমি তাঁদের চিনিয়েছ এই চরিত্রকে এই ইতিহাসকে। চিরদিন মানুষ রাজচন্দ্রর কথা পড়লে জানলে তাদের চোখের সামনে নূরের মুখটাই ভাসবে। রাজচন্দ্র মানেই তো নূর। নতুন ভাবে কামব্যাকের জন্য নিরন্তর শুভেচ্ছা।

নূর – অনেক ধন্যবাদ। আমারো কথা বলে খুব ভালো লাগল। সবাইকে অনেক ভালোবাসা। আমার পাশে আপনারা এভাবেই থাকুন। নতুন ভাবে আসব ততদিন একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। ভালো থাকবেন সবাই।