‘বাইশে শ্রাবণ’ ও ‘চতুষ্কোণ’-এর কথা মাথায় না রেখে ‘ভিঞ্চিদা’ দেখতে যাওয়াই ভালো !

ভিঞ্চি

ময়টা মোটেই ভালো যাচ্ছিল না পরিচালক সৃজিত মুখার্জির। ইয়েতি অভিযান, শাহজাহান রিজেন্সির মত মাল্টিস্টারার মুভি সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তাই এবার আর রিস্ক নয়, একেবারে নিজের পরিচিত ছকেই কাজ করলেন তিনি। বানালেন ক্রাইম থ্রিলার ‘ভিঞ্চি দা‘। স্যার আলফ্রেড হিচককের ক্লাসিকাল থিয়োরি অব সাসপেন্স ও নিজস্ব ঢঙে বাংলা ছবির দর্শকদের এক ভিন্ন স্বাদ যোগানের চেষ্টা করলেন। পরিচালনার দিক থেকে থ্রিলার তৈরিতে তাই এবারও সফল পরিচালক সৃজিত।

সিনেমার মূল আকর্ষণ এর চরিত্রেরা। দুটি প্রধান ও দুটি পার্শ্বচরিত্রের সহযোগিতায় ‘ভিঞ্চি দা’র প্লট দাঁড়িয়ে আছে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ভক্ত ভিঞ্চি দা এই ছবির গল্পকথক। আর্টিস্ট ভিঞ্চিদা সর্বত্র অবহেলিত। লোকে বলে সে নাকি তার বাবার টলিপাড়ার পরিচিতি ভাঙিয়ে খাচ্ছে। একদিকে শিল্পীসত্বার প্রতি বিশ্বাস অন্যদিকে প্রেমিকা জয়াকে সঙ্গী করে সুখের ঠিকানা খুঁজে ফেরা, এই নিয়েই ভিঞ্চিদা’র জীবন। আপাত সাদাসিধে এই ভিঞ্চিদা’র জীবনে হঠাৎই আবির্ভাব ঘটে আদি বোসের। নিজেকে ক্রিমিনাল লয়ার বলে দাবি করে সে। এছাড়া রয়েছে এক অনুসন্ধানী চরিত্র ইন্সপেক্টর পোদ্দার। চরিত্রগুলির আসাযাওয়া কিভাবে প্রভাবিত করে ভিঞ্চিদা’র জীবন, সিনেমা জুড়ে সেই গল্পই বলছে নামচরিত্রটি। এসবের ব্যাকগ্রাউন্ডে সমান্তরাল ভাবে চলছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চোরপুলিশ খেলা, আরও কত কি!

চরিত্রগুলির অভিনয় এককথায় দৃষ্টিনন্দন। ‘চলো লেটস্ গো’র পর আবার একসাথে রুদ্র-ঋত্বিক। ভিঞ্চিদার ভূমিকায় রুদ্রনীল নিজের জাত চিনিয়েছে। মধ্যবিত্ত জীবনে বেকারত্ব ও নিজের শিল্পীসত্বা বাঁচিয়ে রাখার যে চিরাচরিত দ্বন্দ্ব, তা প্রতিটা ভাবভঙ্গিমায় চোখে চোখ রেখে বুঝিয়েছে চরিত্রটি। অন্যদিকে আপাত সাইকোপ্যাথ সিরিয়াল কিলার আদি বোস প্রতিটা দৃশ্যে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভিঞ্চিদা’র প্রেমিকা জয়া চরিত্রটির প্রতি সোহিনী সরকারের কমিটমেন্ট দেখবার মতো ছিল। জীবনের চরম ক্রাইসিসের মুহূর্তেও সমাজের ভাষায় তোতলা জয়ার বাচনভঙ্গি ভীষণ সপ্রতিভ আর সহজাত লেগেছে। এছাড়া অভিনয় প্রসঙ্গে যার কথা না বললেই নয় সে হল ঋদ্ধি সেন। সারা সিনেমায় বড়জোর ১ মিনিট দেখা মেলে ঋদ্ধির চরিত্রটির, সেটুকুর মধ্যেই ঋদ্ধি তার অভিনয় দক্ষতার জানান দিয়ে গিয়েছে। এককথায় যাকে বলে – “এলেন দেখলেন জয় করলেন!”।

ঋদ্ধি সেন ভিঞ্চি দা সিনেমা রিভিউ

এবার আসা যাক সিনেমার অন্যান্য দিকগুলোর কথায়। ছবির স্ক্রিপ্ট অনেক উপাদানে ভরপুর থাকলেও কোথাও গিয়ে যেন সেই জমাট ভাবটাই নেই। কিছু দৃশ্য একদিকে যেমন প্রেডিক্টেবল অন্যদিকে ক্লিশেও বটে। সৃজিতের অনুগামীরা এর আগেও এই ধরনের দৃশ্য দেখে এসেছে তার সিনেমায়। ছবির প্রথমার্ধেই দর্শক জানতে পারে আদি বোসের ছেলেবেলা থেকে তার বড় হয়ে ওঠার ব্যাপারে। তবে সেখানেও বলা চলে চরিত্রটির ব্যাকস্টোরি আরেকটু ভাল হতে পারতো। তবে ছবির সংলাপ বেশ ব্যালান্সড। আ পারফেক্ট মিক্সচার অফ স্যাটায়ার অ্যান্ড হিউমার। সৃজিত মুখার্জির এর আগে বানানো থ্রিলার দুটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছবির গান। ভিঞ্চিদা’র ক্ষেত্রে সেই ব্যাপারটাই মিসিং, ছবির গান বেশ সাদামাটা। ছবিতে ড্রিম সিকোয়েন্সগুলি তৈরিতে নীলাভ একটা আবেশের মধ্যে দিয়ে ক্রিয়েটিভ আবহ তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কালার গ্রেডিং ও লাইটিং ডিপার্টমেন্টকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

সবশেষে একটাই কথা বলার, তা হল সৃজিতের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ও ‘চতুষ্কোণ’-এর কথা মাথায় না রেখে ‘ভিঞ্চিদা’ দেখতে যাওয়াই ভালো। কারণ, চেষ্টার ত্রুটি না থাকলেও নিজের তৈরি বেঞ্চমার্ক ছুঁতে আবারও ব্যার্থ সৃজিত মুখার্জি। তাই ৫-এ ৩.৫ দিলাম “ভিঞ্চিদা’কে।