উপেক্ষা -‘সোয়েটার’ – উত্তরণ !

সোয়েটার

ছবি- সোয়েটার
পরিচালনা – শিলাদিত্য মৌলিক
অভিনয়ে- ঈশা সাহা, জুন মালিয়া, শ্রীলেখা মিত্র, খরাজ মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ (সিধু), ফরহান ইমরোজ, সৌরভ দাস, অনুরাধা মুখোপাধ্যায়।

উল বোনা। আজকাল এই শিল্প লুপ্ত। কুড়ি বছর যদি আমরা পিছিয়ে যাই কি তারও বেশী তখন কিন্তু সবার ঘরেঘরে উল, উল কাঁটা থাকত। বাড়ির মহিলাদের ঘরে বাইরে হাতে থাকত উল কাঁটা। ঘরে অবসর সময় থেকে ট্রেনে বাসে যেতেযেতে কোনো চাকুরিতা বুনে ফেলত একটা সোয়েটার। আজকাল কেউ ভাবতেও পারেনা। বাড়ির সব মহিলা উল কাঁটা নম্বর মিলিয়ে আদান প্রদান করত। সেলাইজানা পাত্রী মানে পাত্রপক্ষের পছন্দতে অনেক ধাপ এগিয়ে থাকা। তখন সবারই প্রায় একান্নবর্তী পরিবার। সেখানে গৃহবধূরা কর্তাকে আর কতটুকু পেতেন! তাঁদের ভালোবাসার মাধ্যম ছিল ঐ উল উলকাঁটা। কি ভাবে? যৌথ পরিবারে আধ বোনা সোয়েটার মাপ দেখবার জন্য স্বামীর গায়ে একবার ফেলে মেপে নেবার অছিলায় স্বামীর স্পর্শ সবার সামনেই পাওয়া যেত। স্বামীও পেতেন স্ত্রীর ওম। কি সরল ছিল তখনকার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তারপর এল ক্যাশমিলন থেকে রেডিমেড সোয়েটারের যুগ। উল কাঁটা বাতিল হয়ে গেল। একটা ইতিহাস একটা শিল্প বাঙালীর কালচার থেকে হারিয়ে গেল।

সোয়েটার ফিল্ম রিভিউ

উল বোনা সোয়েটার এতদিন পর আবার ফিরিয়ে এনেছেন পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিক। এই ছবি সোয়েটার নাম থেকেই ভীষন নস্ট্যালজিক করে দেয়। বাঙালী কালচার ফিরিয়ে আনল এ ছবি। খুব বাঙালী আটপৌরে অথচ স্মার্ট ছবি। সোয়েটার শিলাদিত্য মৌলিকের প্রথম বাংলা ছবি। আর প্রথম ছবিতেই মুম্বাই নিবাসী শিলাদিত্য খাঁটী বাঙালীয়ানা তুলে এনেছেন বাংলা ছবিতে। এই রুচি আজকাল বিরল। প্রমোদ ফিল্মস, পিএসএস এন্টারটেনমেন্টস এবং পি অ্যান্ড পি এন্টারটেনমেন্ট ছবির প্রযোজক সংস্থাদেরও ধন্যবাদ অন্যরকম স্টারহীন সিনেমা বানানো যায় সেটা করে দেখানোর জন্য। ‘সোয়েটার’ ছবি জয়িতা সেনগুপ্তর ‘উল কাঁটা’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত। মূল ভাবনা জয়িতার। জয়িতার এই গল্পটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।সেখান থেকেই পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিক এই গল্পে ছবি করবেন ঠিক করেন। ছবির চিত্রনাট্য শিলাদিত্যর। লেখিকা জয়িতার ‘উল কাঁটা’ গল্পে নায়িকার নাম শ্যামা। কারন সে শ্যামবর্না। পাত্রী হবার প্রতিযোগিতায় গায়ের রঙেই যে প্রথমেই ডাহা ফেল। শিলাদিত্যর ছবিতে নায়িকার নাম টুকু। সেও শ্যামবর্না। পরিচালক নিজের টাচ আরো কিছু নতুন প্লট দিয়ে উল কাঁটা দিয়ে একটা পরিপূর্ন সোয়েটার বুনেছেন।

টুকু। যাকে আর পাঁচটা সাধারন পরিবারে আমাদের আশেপাশে খুঁজে পাবেন। যে একে শ্যামবর্না তারওপর বিয়ের বাজারে চলবার মতো কোনো গুণ নেই সমাজের চোখে।টুকুর বোন অনুরাধা আবার গান জানে অনেক বেশী সুন্দরী স্মার্ট। এই বিপরীত দুই বোনের কাহিনী পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘ছায়াসূর্য’ ছবির সঙ্গে মেলে। যদিও শিলাদিত্যর ছবি কালো মেয়েদের কালো গল্প নয়। এক নতুন দিশা দেখায়। টুকুকে পাত্রস্থ করতে বোনের কাছেই গান শিখে অন্তত পাত্রপক্ষের কাছে মুখরক্ষা করতে মরিয়া টুকুর বাবা মা। এরমধ্যে অনেক পাত্রপক্ষ ঘুরে গেছে টুকুকে না পসন্দ। পাত্রপক্ষের সামনে নামী দোকানের সিঙারা থেকে লুচি তরকারি মিষ্টি কিছুই বাদ যায়না। কিন্তু টুকুকে পার করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এরমধ্যে টুকুর আছে এক বয়ফ্রেন্ড যে টুকু কে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখায়। এ হেন অবস্থায় ঘটক মারফৎ আসে এক চার্টাড একাউন্টেন্ট পাত্রের সন্ধান। চলতে থাকে টুকুর বাড়ি তোড়জোড়। কিন্তু শেষ অবধি পাত্রপক্ষর আসার সময় পেরিয়ে যায়। শেষ আশাও ত্যাগ করে টুকুর বাবা মা। হঠাৎ মধ্যরাত্রে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। কে? খুলে দেখা যায় সি এ পাত্রের আধুনিকা মা এসে হাজির মধ্যরাত্রেই। মশারি তুলে কনে দেখা হয়। কিন্তু এই আধুনিকা জাঁদরেল শাশুড়ির টুকু কে বলে বিয়ে হতে পারে এক শর্তে। সে শর্ত এ যুগে ভাবলে অদ্ভুত। টুকুকে একটা সোয়েটার বুনে দেখাতে হবে? শাশুড়ির পছন্দ হলেই তবেই বিয়ের অনুমতি পাশ হবে। ছেলের তো যোগ্যতা নির্ধারন হাতে কলমে পাত্রীপক্ষ করছেনা। তাহলে মেয়ের কেন? টুকু, মানসিক ভাবে বোবা মেয়েটা শাশুড়িকে কি ভাবে জবাব দেয়? যা ছবিটাকে গতানুগতিকতা থেকে এগিয়ে দেয়। এখানেই ছবির গল্পের চমক। থমকে দেবে টুকুর উত্তর শাশুড়ি সহ দর্শককে। কি ভাবে এই সোয়েটার সাধারন টুকুকে অসাধারন করে তোলে? সামাজিক যত ট্যাবু এই ছবি তার বিরুদ্ধে মুক্ত অস্কিজেন যোগান দেবে সাধারন মেয়েদের। তবে ছবির কিছু কারন ধোঁওয়াশা সি এ পাত্রের জন্য এতো সাধারন পাত্রী নির্বাচনের কি তড়িঘড়ি। হয়তো শাশুড়ির প্যাশন এই সোয়েটার। যে ভালো পারবে সোয়েটার বুনতে সেই হবে বৌমা। কিন্তু এই অগ্নিপরীক্ষায় সব বিষয়ে না পারা টুকু কি পাশ করল? কি কি ভাবে সোয়েটার নিয়েই টুকুর জীবনে বাঁক বদল হল এই ছবি সেই গল্প বলে। সোয়েটার এ ছবির নায়ক।

এবার আসি অভিনয়ে, টুকুর ভূমিকায় ঈশা। একটা নন গ্ল্যাম চরিত্রকে কি অসাধারন করেছেন ঈশা। ছবির মূল কান্ডারি তিনি। ‘ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল’ এর মেয়েটা প্রজাপতি বিস্কুট হয়ে সোয়েটারে অনবদ্য। টুকুর আত্মবিশ্বাস যত বাড়তে থাকে সেই অনুযায়ী ঈশার পোশাক মেক আপ বেশ যথাযথ। টুকুর প্রেমিককে প্রত্যাখান করা কিংবা হবু শাশুড়ি সহ সমাজ কে যোগ্য জবাব দেবার অভিনয়ে ঈশা একশোয় একশো। সমাজের যাঁতাকলে মানসিক বোবা মেয়েরা আরো জোর পাবে টুকুকে দেখে।

জুন মাল্য এবং টুকুর পিসির চরিত্রে শ্রীলেখা মিত্র।ছবির প্রধান দুটি চরিত্রে টুকুর শাশুড়ির ভূমিকায় জুন মাল্য এবং টুকুর পিসির চরিত্রে শ্রীলেখা মিত্র। শাশুড়িমা পিসিমা টাইপ এ দুজন কেউই নন। বরং আধুনিকা। বড় দেখতে ভালো লাগে দুটি চরিত্র। জুন কি সত্যি জাঁদরেল শাশুড়ি? সেটার জন্য দেখতে হবে ছবি। ‘রেনবো জেলি’ র পরী পিসির পর শ্রীলেখা টুকুর পিসির রোলে অভিনব। যে বলে “আজ উল বুনতে জানে কিনা, কাল বাচ্চা হলে তার পটি পরিস্কার করতে জানে কিনা এতো চলতেই থাকবে।” টুকুর জীবনকে নতুন আঙ্গিকে চিনতে শিখিয়েছেন শ্রীলেখা। যে কনফিডেন্সে টুকু তাঁর বয়ফ্রেন্ডকেও রিজেক্ট করতে পারে সঠিক দিশা পেয়ে। শ্রীলেখা মিত্র কে এত অসাধারন ভাবে ব্যবহার করেছেন প্রথম ছবিতেই শিলাদিত্য যা অনবদ্য। সিধু নজরকাড়া গানের পাশাপাশি অভিনয়তেও পাকা। ছোট্ট রোলে ঋজু বেশ। সৌরভ দাস যথাযথ। ফারহান ইমরাজ আরেকটি চরিত্র যার অভিনয় যে চরিত্রটি উল্লেখযোগ্য দর্শকের মন ছুঁয়ে যাবে। সাম্য টুকুর কেমিস্ট্রি বড় সুন্দর। আইডিয়াল আইকনিক। ছবির বাঁধুনি ধরে রেখেছে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের কমেডি টাইমিং। আবার যে স্ত্রীকে বলেন “টুকু সব আমার বেগুণ গুলো পেয়েছে, আরেক মেয়ে সব তোমার গুণ গুলো।”

সাম্য টুকুর কেমিস্ট্রি বড় সুন্দর। আইডিয়াল আইকনিক।
টুকুর বোনের চরিত্রে বোন অনুরাধা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় আকর্ষণীয়। টুকুর মায়ের চরিত্রে যিনি সুন্দর মায়ের মতোই ভালো। সিনেমাটোগ্রাফিতে উদয় সিং মহিতে মন ভোরায়। পোশাক পরিকল্পনায় এলিনা ভৌমিক চোখের আরাম দেয়। এই ছবিতে গানে অভিষেক ঘটেছে সুরকার গীতিকার গায়ক রণজিৎ ভট্টাচার্যের। রণজিৎ ভট্টাচার্যের সুরে গানগুলোর স্পর্শ অনেকক্ষন থাকবে। লগ্নজিতার ‘প্রেমে পড়া বারণ’ কি বিশাল হিট সে তো আর বলে দিতে হবেনা। পাহাড়ী ঠান্ডা আমেজে ‘প্রেমে পড়া বারণ’ গানটি দারুন রেশ রেখে যায়। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘উল বোনার পাঁচালী’ গানটিও সবার মনে ধরেছে বেশ একটা বাঙালী ফিলিংস আছে গানটায়। এই গানের কথা ও সুর অনিন্দ্যর। মিউজিক আয়োজন প্রবুদ্ধ ব্যানার্জ্জী। রূপঙ্করের গানটি সুন্দর। রনজয় শিলাদিত্য তাঁদের প্রথম ছবিতে এত ভালো গান বানিয়ে ফেলেছেন যে গুলো রয়ে যাবে।

এ ছবি সেইজন্যই সবার দেখা উচিৎ যে মানুষ গুলোর তাঁদের প্রিয়জনদের থেকেই কোনো গুণ নেই শুনতে শুনতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় এবং তাঁরাও পারে ঘুরে দাঁড়াতে। যারা একদিন তাঁদের ছোটো করেছিল তারাই একদিন তাঁকে মাথা উঁচু করে দেখতে বাধ্য হয়। সেই যোগ্য জবাব এ ছবি।

লেখা শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়