ছক্কা বলে টিটকিরি দেন যাদের, তাদের জীবন আসলে পুঁটে ভরা !

পুঁটি

নগর কীর্তন
পরিচালনাকৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়
অভিনয়ে – ঋত্বিক চক্রবর্তী, ঋদ্ধি সেন, মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়,বিদীপ্তা চক্রবর্তী,সূজননীল, হার্ষিল প্রমুখ।

‘ কহে চণ্ডিদাস , ‘ শুন বিনোদিনী ,
সুখ দুখ দুটি ভাই ?
সুখের লাগিয়া … যে করে পিরীতি ,
দুখ যায় তার ঠাঁই । ‘

রাধা কৃষ্ণের পূর্বরাগ প্রেম বিরহ তো মানব জীবনের আদর্শ। কিন্তু এই প্রেম সমাজের বাঁধা গতে হলেই সমাজে স্বীকৃত হয় সব প্রেম বিবাহে যায় না নারী পুরুষের যদিও, কিন্তু সমপ্রেম কোনদিনই সমাজে সহজে স্বীকৃত পায়না। কিন্তু সেই সমপ্রেমে মান-অভিমান রাগ-দুঃখ থেকে আত্মহনন অবধি ঠিক নারী পুরুষের প্রেমের মতোই হয়। ছবির থেকে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহসী ডায়লগ মনে পড়ে গেল, “শ্রীচৈতন্যের বিয়ে দেওয়া হল, তাতে লাভের লাভ কি হল! বিষ্ণুপ্রিয়া সারাজীবন কেঁদে মরল। শ্রীচৈতন্য তাঁর দেহ মন সব শ্রীকৃষ্ণকেই উৎসর্গ করে বসে আছেন।” শ্রীচৈতন্য সেই আধ্যাত্মিক প্রেম কোথাও গিয়ে তো সমপ্রেমই। কিন্তু সমাজের চোখে মহাপুরুষ দের কোনো যৌন জীবন থাকতে নেই, আলোচিত হতে নেই। ধর্মের মোড়কে সমপ্রেম যৌনসত্তা আবৃত করে সুন্দর করা থাকে। নগর কীর্তন এর ছবিএই ছবিতে কি দারুন বৈপরীত্য দেখিয়েছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। যারা বংশানুক্রমে চৈতন্য সেবা করে,বৈষ্ণব ধার্মিক, নামগান সংসার ও জীবিকা যাদের তারা চৈতন্যকে বোঝেননি। দেবতা হিসেবে বুঝেছেন, মানুষ নিমাইয়ের কষ্ট বোঝেননি ত্যাগ বোঝেননি। তারাই মধু-পরীর ভালোবাসায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ছেলে বউমাকে ঘরে তোলেনা শ্বশুরবাড়ি। বহু সন্ন্যাসীর বড় অংশ তারা সমপ্রেমী, সমকামী কথাটা ব্যবহার করছিনা, তাই তাঁরা সমাজের চাপ থেকে মুক্তি পেতে নিজেদের ঈশ্বরের পায়ে আজও উৎসর্গ করে চলেছেন। কিন্তু তাদেরও মন আছে প্রেম আছে কষ্ট হয়। সবটাই ঢাকা ঐশ্বরিক মোড়কে।

‘ এ সখি হামার দুখের নাহি ওর / এ ভরা বাদর / মাহ ভাদর /
শূন্য মন্দির মোর। / কান্ত পাহুন / কাম দারুণ/
সঘনে খর শর খন্তিয়া/……. মত্ত দাদুরী। ডাকে ডাহুকী
ফাটি যাওত ছাতিয়া।। ‘

নগর কীর্তণ‘ ছবিতে রাধা, কৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্য একটি বড় ভূমিকা নেয়। পরিমল একটি ছেলে অথচ মনে মেয়ে। যাকে ঠাকুর নারী মনটা দিল কিন্তু শরীরটা দিলনা। সে শিশু বয়সে ‘যেমন খুশী সাজো প্রতিযোগিতা’ তে মা সারদা সেজে প্রথম পুরস্কারের কাপ জিতলে তার বাবা বলে মা কে “ছেলের মুখ থেকে ওসব রুজ পাউডার তুলে দাও। “ছেলের কাপ জেতাটাও লজ্জার। ছেলে জন্ম হয়েছে যখন দৌড়ে, লং জ্যাম্প, হাই জ্যাম্প নিদেন পক্ষে কোনো মহাপুরুষ কিংবা পুরুষ ভিখিরি সেজে প্রাইজ আনলে পরিবারের মান বাড়বে। নারী সাজা পুত্র প্রাইজ কাপ পেলে সেটা লজ্জার। পরিমল ছোটো বয়সেই বুঝে যায় সে যে জায়গাটাকে বাড়ি ভাবে আদতে সেটা তার যথার্থ বাড়ি নয়। অথচ সে জন্মাতে চাইনি, সে এসেছে তার বাবা মা র ইচ্ছেতে। কৈশোর থেকে সদ্য যৌবন … ভালোবাসার রং লাগে পড়াতে আসা সেক্সি হাঙ্ক মাষ্টারমশাই সুভাষদার সাথে। প্রেমের মন্দিরে পৌঁছতে প্রথম দরজাটি হল রূপানুরাগের। কথায় বলে ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি’
পরিমলের ক্ষেত্রেও তাই হয়।নগর কীর্তন সিনেমা রিভিঊ - পুঁটি

‘রূপ লাগি আঁখি করে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে।।’

যে সুভাষদা পরিমলকে পরী বলে ডাকে। পরীর সদ্য যৌবনের সবটুকু নিয়ে পরিমলের দিদিকে বিয়ে করে নেয় প্রতারক সুভাষদা। পরি সহ্য করতে না পেরে ঘর ছাড়া হয়। এভাবেই এক নারীমনা ছেলে হিজরে পট্টিতে এসে হয়ে ওঠে প্রফেশানাল টাকা তোলা হিজরা। পরীকে পুঁটি নাম দিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে নেয় হিজরা গুরু মা। কিন্তু সেখানেও প্রেমে পড়ে আবার পুঁটি। আগের প্রেমিক সুভাষদা তো ছিল সমকামী কামুক যে নিজের বিকৃত চাহিদা পূরণ করেছিল মাত্র কোনো ভালোবাসা দায়িত্ব ছিলনা কিন্তু কৃষ্ণ ঠাকুর তো রাধার জন্য তৈরী থাকে। যে ভালোবাসবে বলেই আসবে।

‘অসময়ে বাজাও বাঁশী পরাণ মানে না।।
যখন আমি বৈসা থাকি গুরুজনের মাঝে।
তুমি নাম ধইরা বাজাও বাঁশী আমি মইরি লাজে।।
বঁধুর পিরীতি আরতি দেখিয়া / মোর মনে হেন করে।
কলঙ্কের ডালি মাথায় করিয়া / আনল ভেজাই ঘরে।।’

মধু বাঁশীওয়ালা ও পরী রাধিকা দুজনের প্রেম থেকে সঙ্গমে কোনো খাদ ছিলনা। তবু সমাজ কি করতে দিল তাদের সংসার? এই ছবিও কিন্তু একটা মেনস্ট্রিম প্রেমের গল্প। শুধু দুজন পুরুষের ভালোবাসার গল্প। কিছু ছেলেকে পেটের তাগিদে নিতে হয় হিজরে ব্যবসা কেউ আবার হিজরে পট্টিতে চালান হয়ে যায়। কিন্তু হিজরেদের মধ্যেও ভালো মন্দ আছে। পরিচালক সেই হিজরেদের অন্দরমহল থেকে অন্তরমহল অবধি তুলে ধরেছেন ছবিতে। ট্রাফিক সিগনালে আপনাদের গাড়িতে কাঁচের জানলায় যারা ধাক্কা মারে টাকার জন্য তাদের গল্প। তারা না অসুস্থ না দ্রারিদ্র্যসীমার নীচে। কি তাদের অবস্থা? বৃহন্নলাদের? এটা তো শুধু হিজরাদের ছবি নয় যে কোনো সমপ্রেমের প্রেমিক প্রেমিক – প্রেমিকা প্রেমিকা রিলেট করতে পারবে। নগর কীর্তন সিনেমা রিভিঊযখন ঋতুপর্ণ ঘোষ কে নিয়ে সমপ্রেমের ছবি ‘আরেক একটি প্রেমের গল্প’ করেন কৌশিক গাঙ্গুলী তখন দর্শকের একাংশ টোন টিটকিরি কাটত। কিন্তু আজ দশ বছর পর দর্শক মহল বদলে গেছে ছবির শেষে তাদের চোখেও জল আসে। সেটাই জয়। এই মানুষ গুলোর ভালোবাসার জয়। অভিনয়ে ঋদ্ধি সেন সেরা। এত ছোটো বয়সে জাতীয় পুরস্কার সেরা অভিনেতার ঋদ্ধি সেন প্রথম। ঋদ্ধি কে প্রথম দেখি তারা মিউজিকে ‘ সঙ্গে ইন্দ্রাণী’ অনুষ্ঠানে ইন্দ্রাণী হালদার সূত্রধর ছিলেন সেলেব ইন্টারভিউতে, কৌশিক সেন চিত্রা সেনের সঙ্গে এসেছিল ছোট্ট ঋদ্ধি। তখনই তার হলিউড সব ছবি দেখা, নাটক করত শিশুর ভূমিকায় স্বপ্নসন্ধানীতে। সেই ছোট্ট ঋদ্ধি আজ জাতীয় পুরস্কার বিজেতা। যা বাঙালী দের গর্ব করার মতো। শুধু তাই নয় এই পুঁটি চরিত্র করে জাতীয় পুরস্কার যা শুধু ঋদ্ধির স্বীকৃতি নয় সব প্রান্তিক মানুষের স্বীকৃতি সব সমপ্রেমের জয়।

মহিলা সুলভ পুরুষের মতো হাত রাখা, বসা, দৌড়োনো, হাঁটা কি দুর্দান্ত আয়ত্ত করেছে ঋদ্ধি। হিজরা রূপেও অনন্য হয়ে উঠেছে পরিমল থেকে পুঁটি। এমন অভিনেতা আমাদের কলকাতার ছেলে বাংলার ছেলে যা খুব গর্বের। কিন্তু একটা কথা, ঋদ্ধি জাতীয় পুরস্কার পাওয়ায় শুধু ওঁকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। এটা বলছিনা ঋদ্ধির অভিনয়কে ছোটো করতে। যা করেছে সেটা বিরল প্রতিভা কিন্তু ঋদ্ধির অভিনয় এত সহজ হতনা যদি না যোগ্য সঙ্গত মধু চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী করতেন। ‘নগর কীর্তন’ ছবিতে দুই ঋ র বাজিমাৎ। সমাজের টিটিকিরির ভাষা বলতে গেলে ছক্কাদের গল্পে কিন্তু শেষ দৃশ্যে ছক্কা টা হাঁকিয়েছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। তাই ঋত্বিক যে জাতীয় পুরস্কার পাবার অযোগ্য ছিলেন তা একেবারেই নয়। শিউরে উঠতে হয় শেষ দৃশ্যে যা থমকে দেবেই। ইন্দ্রাশিষ রায় সুভাষদার রোলে যেটুকু অভিনয় করেছেন দুরন্ত ফাটিয়ে দিয়েছেন। এ ছবিতে সাহসী অভিনয় করেছেন আরেকজন বিদীপ্তা চক্রবর্তী। অনেকেই বলেছেন ‘গ্রামের বউরা কি ঘরে ব্রা পরে যা দেখালেন পরিচালক?’ গ্রামের ঋতুমতী মহিলারা আজকাল ন্যাপকিন ব্যবহার করেন স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে তো ব্রা পরা দেখানো কি অস্বাভাবিক ব্যাপার। আর বিদীপ্তার রোলটা মুক্তমনা যে সব রহস্য জানার পরও মধু-পুঁটির পাশে থাকার চেষ্টা টুকু করেছিল। কীর্তনের মাঝে বিদীপ্তার হাতে পুঁটির উইগ খুলে যাবার দৃশ্য গাঁয়ে কাটা দেয়।

সত্যজিৎ রায় মিস শেফালি কে বলেছিলেন “ক্যামেরার সামনে ব্লাউজ খুলতে পারবে তো? “শেফালি বলেছিলেন “পারব মাণিকদা।” ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সেই সিগারেট মুখে শেফালির সিন আইকনিক। ক্যাবারে নতর্কী থেকে ‘নগর কীর্তন’ এ ব্রা পরে সিন করলেন এক গৃহবধূর চরিত্রে বিদীপ্তা। যা বাংলা ছবিতে সত্যি সাহসী পদক্ষেপ। আর দৃশ্যটা বাড়তি তাও না ছবির উপযোগী কারন বৌদি বিদীপ্তার সুডোল শরীর দেখে নিজের শরীরও যেমন ওমন হয় আকাঙ্খা করে পুঁটি ওরফে পরিমল। মানবী র কথায় “সেক্স চেঞ্জ অপারেশন করালেই মেয়ে হয়ে হেমা মালিনী হয়ে যাবে অত সোজা।”নগর কীর্তন সিনেমা রিভিঊ
কৃষ্ণনগর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষা সোমনাথ ব্যানার্জ্জী থেকে মানবীও একজন ট্রান্সজেন্ডার সেটাও ছবিতে দেখানো হয়েছে এও তো এক উত্তরণ। হিজরা গুরু মার চরিত্রে যে ট্রান্সজেন্ডার ভদ্রমহিলা করেছেন দুর্দান্ত। ‘নীলকন্ঠ’ র অপর্ণা সেন কে মনে পড়ে যায়। সূজননীল, মঞ্জুলা পোল্লে বেশ। বিদীপ্তার ছোট্ট ছেলের ভূমিকায় হার্ষিল মিষ্টি অভিনয় করেছে। এখানে ওর নাম গজা। ঋত্বিকের ভাইপো। ‘আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল’ আজকাল তো শোনাই যায়না দোলের আগে , হার্ষিল-র মুখে ‘বিসর্জন’ ‘বিজয়া’ র মতো এখানেও এই ছড়াটা দারুন রেখেছেন পরিচালক। হার্ষিল সপ্রতিভ। আর একটা শেষ কথা, অনেকেই বলছেন ছবিটার শেষটা সেই গতানুগতিক। হ্যাঁ পরিচালক হয়তো সেফ খেলেছেন। কারন আজকাল প্রচুর সমপ্রেমী দম্পতি প্রচুর পরিবারে মাথা উঁচু করে আছে সব গঞ্জনা গলার মালা করে। সেখানে এই পরিনতি মানা যায় না। অনেকের মতে শেষ দৃশ্যে একজন গে / বাইসেক্সুয়াল পুরুষের রূপান্তর পরিণতি অবাস্তব। কিন্তু ঐ যে রাধা কৃষ্ণ প্রেম যা নিয়ে নগর কীতর্ন, যে প্রেম যে ভালোবাসা সমাজ মেনে নেয়না, যা পাপ সমাজের চোখে, যা মুখে চুন কালি দেওয়া ভালোবাসা, সেই ভালোবাসা পরাবাস্তব অতিবাস্তবেও সম্ভব।

‘তোমারই গরবে গরবিনী হাম, রূপসী তোমার রূপে …’

শ্রীকৃষ্ণ চরণে যেমন রাধাভাবে চৈতণ্যদেব নিজেকে সঁপে দেন। ঠিক তেমনি মধুও পুঁটি র জীবনে অবগাহন করে তাঁর ভালোবাসা ভালো থাকার পুঁটি কে নিয়েই বেঁচে রইল। এই ছবি তো এখানেই মিলনাত্মক। ছবির শেষ দৃশ্য কিন্তু থমকে দেবে।

এবার বাকি টুকু অনুভব ….

লেখা – শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।