উত্তমকুমারের রাজা অনেকাংশে কল্পনাশ্রিত – সৃজিতের রাজা সত্য উদঘাটিত !

ভাওয়াল

ছায়াছবিঃ এক যে ছিল রাজা
পরিচালনাঃ সৃজিত মুখোপাধ্যায়
অভিনয়ঃ যিশু সেনগুপ্ত, জয়া আহসান, অপর্ণা সেন, অঞ্জন দত্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, রুদ্রনীল ঘোষ, রাজনন্দিনী পাল, শ্রীনন্দা শংকর, মিতা চট্টোপাধ্যায়

সৃজিত মুখার্জ্জী উত্তম কুমারের ছবি গুলো নিয়েই ছবি করছেন এই কথা নিয়ে ট্রল থেকে তর্ক এখন টক অফ দ্যা টাউন। আর সেই তর্কে ঘৃতাহুতি দেয় ‘এক যে ছিল রাজা‘। ভাওয়াল রাজা, গাজীপুর, কলকাতা এই প্রেক্ষাপট নিয়ে যে দীর্ঘ মামলার কাহিনী। যা বহু চর্চিত। যা নিয়ে উত্তম কুমার ছবি করে যে কাহিনীকে মিথে পরিনত করে গেছেন সেই জিনিসে হাত দেওয়া কম কথা নয়। প্রথমেই তুলনা আসবে উত্তম কুমারের ধারেকাছেও কি সৃজিত – যীশু সেনগুপ্ত র সন্ন্যাসী রাজা গেছে? প্রথম কথা বলব ট্রেলার, টিজার, গানের দৃশ্য দেখে ‘এক যে ছিল রাজা’ কে বিচার করবেন না। পুরো ছবিটা দেখুন। পুরো ছবিটা দেখলেই বোঝা যাবে এ ছবি মনে রাখার মতো ছবি, তথ্যনির্ভর ছবি।
পার্থ চ্যাটার্জ্জীর ‘এ প্রিন্সলি ইম্পোস্টার’ বইকে কেন্দ্র করে সৃজিত এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন। পাল্টেছেন কিছু বিষয় যেমন দুই পুরুষ উকিলের জায়গায় এক মহিলা উকিল। দুই উকিলের বিজয়া বেলায় এসে নিজেদের প্রেম অপ্রেম ফিরে দেখা। কিন্তু কিছু কিছু পরিবর্তন মূল ঘটনা থেকে ছবিটার ঐতিহাসিক গুরত্ব বিকৃত করেনি। বরং অনেক গুলো সম্পর্কের স্তর উঠে এসছে।

উত্তম কুমার যখন পীযুষ বোসের ‘সন্ন্যাসী রাজা’ র জন্য ভাওয়াল পরিবার কর্তৃপক্ষের থেকে কপিরাইট কেনেন তাঁকে বলে দেওয়া হয়েছিল রাজার কোনো দোষ দেখানো যাবেনা। আর উত্তম ইমেজেও সত্যি সকল ঘটনা যেতনা ভেবেই মহানায়ক নিজের ক্যারিশমায় ছবিকে চালান। পীযুস বসুর পরিচালনা চিত্রনাট্য উত্তম সুপ্রিয়ার কেমিস্ট্রি মান্না দের গানে গানে ছবি সুপারহিট আইকনিক হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবের গল্প থেকে যোজন দূরে উত্তমের রাজা। অনেকেই ভাবেন উত্তমের টাই সঠিক ইতিহাস কারন ছবিটা মিথ। এমনকি কলকাতার ভাওয়াল রাজ বাড়ি যেটি এখন রিপন স্ট্রীটে কলকাতা পুলিশ মিউজিয়াম সেখানেও সন্ন্যাসী বেশে মূল ভাওয়াল রাজার সঙ্গে উত্তম কুমারের ছবি দেওয়া। কারন বাঙালীর ভাওয়াল রাজা উত্তম কুমার।
যীশুর জীবনের সেরা অভিনয় ভাওয়াল রাজা।কিন্তু আসল ঘটনা অন্য। অন্তত সৃজিত সত্য অন্বেষণের পথে হেঁটেছেন। ছবির শুরুতেই ভাওয়াল রাজার বাঘ শিকার ছবির মতো যীশুকে বাঘের উপর দাঁড় করিয়ে বাঘ মারার দৃশ্য সেই ইতিহাসটাকে মনে করিয়ে দেয়। যেন ইতিহাস উঠে এসছে। উত্তম কুমার এক ক্যারিশমার নাম, কিন্তু যীশুকে অনেক বেশী রক্ত মাংসের রাজা লেগেছে। যীশুর জীবনের সেরা অভিনয় ভাওয়াল রাজা। যে ভাবে প্রায় নগ্ন হয়ে নাগা সন্ন্যাসী সম সেজেছেন যীশু তাতে বোঝা যায় যীশু জানতেন এই সুবর্ণ সুযোগ আর কোনদিন পাবেন কিনা সন্দেহ এবং সেটার যথার্থ ব্যবহার করেছেন যীশু।
উত্তমের সন্ন্যাসী রাজায় আমরা এতদিন দেখে এসছি ডাক্তার শুধুই ভিলেন। কিন্তু সৃজিতের ছবিতে রাণী বিভাবতী দেবী সিনেমায় নাম চন্দ্রাবতী দেবীর দাদা সত্য হলেন ভিলেন। সত্য রূপী অনির্বান পুরো দাবার ছক সাজান। তাঁকে সাহায্য করেন ডাক্তার রূপী রূদ্রনীল ঘোষ।সত্য রূপী অনির্বান পুরো দাবার ছক সাজান।
পীযূষ বসুর চিত্রনাট্য থেকে যোজন দূরে সৃজিতের চিত্রনাট্য। অনেক বেশী সত্যাদর্শী। নায়ক রাজা মানেই তাঁকে ভালো চরিত্রের দেখাতে হবে তা করেননি সৃজিত। সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক। যখন দেখানো হয় নায়কের সিফিলিস র মতো অসুখ রয়েছে। বহুগামী রাজার চরিত্র ঢাকার চেষ্টা করা হয়নি এখানে। রাজা ও রাণীর যে মামলা চলেছিল সেটাই দেখানো হয় এই ছবিতে। যা সন্ন্যাসী রাজায় দেখানো হয়নি। ওখানে সুপ্রিয়া উত্তম কেমিস্ট্রিকে কাজে লাগিয়ে রাণী রাজার বিরুদ্ধে যাননি হয়তো বক্সঅফিস ভেবে। সৃজিতের এ ছবি একটা দলিল, বক্সঅফিস নিয়ে ভাবেননি সেভাবে ছবি করতে গিয়ে। তাই কোর্ট রুম ড্রামা দৃশ্য গুলো সাদা কালোতে। যার ফ্ল্যাশব্যাকে কালারে আসছে রাজার কাহিনী।
কিন্তু সেটা বোর করেনা বরং এরপর কি হয়েছিল জানতে আগ্রহ বাড়ায়। তবে কিছু কিছু ব্যাপার এখানেও স্পষ্ট নয়। যেমন কথিত আছে মেজো রাজা সন্ন্যাসী হয়ে ফেরার পর তাঁর ঘটা করে বিয়ে দেন বোনেরা। দ্বিতীয় স্ত্রীর সহিত মেজো কুমার রাজা রমেন্দ্র নারায়নের ছবিও পাওয়া যায়। বিভাবতীর পরও আরেক স্ত্রীর অস্তিত্ব। যা এই ছবিতে নেই। রাজার মা যে রোলটি রেশমী সেন করেছেন, তখনকার বাংলাদেশের মহিলারা কি টেবিলে বসে ছুরি দিয়ে ফল কাটতেন?

ছবির কিছু দৃশ্য মন ছুঁয়ে যাবে,

যীশু ডাক্তার আর শ্যালক কে বলছেন আমি জানি তোমরা আমায় বিষ ইঞ্জেকশান দিচ্ছ। আমায় বিষ দিয়ে দাও আমি খেয়ে নিচ্ছি। আমি রাজার মতো মরতে চাই। কিন্তু আমায় বিষ ইঞ্জেকশান দিওনা। যীশুর সেরার সেরা অভিনয়। জয়া আহসান ‘এক যে ছিল রাজা’ র ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। রাজার বোন মিনু। জয়া যেখানে সন্ন্যাসী রাজা কে তাঁর ভাইদের পরিচয় দিচ্ছেন তাঁদের দেহ রাখার খবর দিচ্ছেন কি দুরন্ত দৃশ্য।জয়া আহসান 'এক যে ছিল রাজা' র ম্যান অফ দ্য ম্যাচ।
কিংবা সন্ন্যাসী রাজা কে মিনু জয়া বলছেন তুমি যদি আমার মেজদা না হও তাহলে যে ঘরে আমরা ছোটোবেলায় বেড়ালের বিয়ে দিতাম সেই ঘরেই মরব। জয়া আর যীশু এ ছবিকে চুড়ান্ত সফলতায় নিয়ে গেছেন। সঙ্গে ভিলেন চালে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন অনির্বান। জয়া আহসানের অভিনয়ের কাছে ফিকে হয়ে গেছে অপর্ণা সেনের নাটুকে চড়া নারীবাদী অভিনয়। তবু মহিলা উকিলের সফিস্টিকেশান অপর্ণা সেন ছাড়া কে পারবেন!শ্রীনন্দা শংকর উমরাওজান এর মেজাজ তুলে ধরলেন নৃত্যশৈলীতে। কৌশিকী চক্রবর্তী দেশিকানের ‘রূঠে নেয়না’ গানে শ্রীনন্দার কান্না মুছে অভিনয় দুরন্ত। শ্রীনন্দার থেকে চোখ ফেরানো যাইনি। রাজার বাঈজির একটা একটা করে অলঙ্কার থেকে পোশাক বাজী রাখার দৃশ্য অনবদ্য। রাজনন্দিনী পালের করার কিছু নেই। কিন্তু শান্ত অথচ বহুগামীর রাজার স্ত্রী হবার যন্ত্রনা ফুটিয়েছে ভালো।

কিন্তু যেখানে আমরা সুপ্রিয়া দেবীকে দেখেছি। যদিও গল্পের আকাশ পাতাল তফাৎ। তবু রাণীর বেদনা কেন রাজার বিরুদ্ধে কেস ঠুকলেন দাদার কথায় আরো বিশদে দেখানো যেত ঐ রানীর হাহাকার। মিতা চ্যাটার্জ্জী রাজপরিবারের ঠাকুমা র রোলে যথাযথ। সাহানা বাজপেয়ীর রবীন্দ্র সঙ্গীত ও শেষে অরিজিৎ সিং র গান নতুন মাত্রা যোগ করে ছবিতে। ‘সমারোহে এসো হে পরমতর সুন্দর এসো হে’ শ্রেয়া ঘোষাল ও ঈষান মিত্র র রেষ রয়ে যাবে। ঈষান মিত্র লম্বা দৌড়ের ঘোড়া প্রমাণ করলেন। সংগীত পরিচালনা ও ছোট্ট ক্যামিও রোলে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত বেশ। ছবিটাকে যেভাবে অনেকেই ট্রল করছেন ছবিটি কিন্তু দেখার মতো ছবি। ইতিহাস কে অনেকটা জানতে পারা যায় এ ছবিতে। বিশেষত বাঙাল ভাষা, যীশুর রোগাক্লিষ্ট মেক আপ, জয়ার আইবুড়ি সধবা বিধবা লুক, সারা ছবি জুড়ে অনবদ্য মিউজিক, ঠিক ভাওয়াল রাজার বাড়ির মতো দৃশ্যায়ন, পশুদের ব্যবহার, সাজসজ্জা সব কিছু নিঁখুত ছবিতে।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের এখনও অবধি অন্যতম  সেরা ছবি ‘এক যে ছিল রাজা’।

লিখছেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।