চেনার মাঝে অচেনা ” মালা ” ..

চেনার মাঝে অচেনা মালা !

বিচিত্র এই ফিল্ম লাইন। কার রোলে কে বদল হয়ে যায়। ‘বসু পরিবার‘ তখন সুপারহিট ছবি। লোকের চোখে পড়েছেন উত্তম কুমার। প্রথম সুপারহিট ছবি বলতে এটাই উত্তমের। উত্তম সাবিত্রী সুপ্রিয়া ওরফে বেণু। এরা সবাই তখন নতুন মুখ। এদের নিয়েই ছবি হিট। আসলে পরিচালক নির্মল দে গল্পটা ঠিক করে বলেছিলেন। চিত্রনাট্যই তো একটা ছবির সব। কিন্তু ‘বসু পরিবার‘ এর আশাতীত সাফল্যেও উত্তমকুমারের ছবির সংখ্যা বাড়ল না। কিছু কিছু ছবির কথা হয়, তবে কোনো কাজে লাগে না। কিন্তু বসু পরিবারের সাফল্যে মাত্র কিছুদিনের মধ্যে নির্মল দে পেলেন প্রতিষ্ঠা। অনেক অফার আসা সত্ত্বেও নির্মল দে নিজেকে সহজ করতে পারলেন না। একটা অফারও তিনি গ্রহণ করলেন না। ঠিক করেছিলেন আর ছবি করবেন না।

সাড়ে চুয়াত্তরকিন্তু সব চিন্তাই ব্যর্থ হয়ে গেল। কিছুদিন পর এমপি প্রোডাকশন আবার ছবি করবে ঠিক করল। এবারও ছবি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করলেন নির্মলবাবুরই ওপরে। একটা হাসির ছবি তৈরি করার ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল। ছবির নামকরণ হলো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। বসু পরিবারের হিট নায়ক উত্তমই নায়ক নির্বাচন হলেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর‘ এ। উত্তমও মনে মনে সেটা ভেবেছিলেন তাকেই নায়ক নেবেন তাঁর নির্মল দা। এবার খোঁজ পড়ল নায়িকার। নির্মল দেএম পি প্রোডাকশান ঠিক করল মালা সিনহা কে নায়িকা করা হবে। সে সময় থেকেই মালার একটা মার্কেট ভ্যালু ছিল সুন্দর মুখশ্রী গ্ল্যামার গার্ল নায়িকা। একদিন নির্মলবাবু উত্তমকে নিয়ে হাজির হলেন মালা সিনহার বাড়িতে। কলকাতার ভবানীপুরের জগুবাবুর বাজারের কাছে তখন থাকতেন মালা সিনহা। কিন্তু মালা তখন নবাগতা রূপে নাম করেছেন বেশ। বম্বে থেকে ডাক পাচ্ছেন। তিনি রাজি হলেন না। অনেকগুলি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হবার জন্যই তিনি এই ছবিতে কাজ করতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। উত্তম – মালা জুটি ভেঙে গেল শুরুতেই। যেখানে পরিচালক নায়ক দুজন গিয়েও নায়িকার ডেট পেলেন না। এবার নির্মলবাবুর সামনে নায়িকা বিভ্রাট।

উত্তম সুচিত্রা জুটিসকলের তখন একই চিন্তা-কাকে নিয়ে কাজ করা হবে! নায়িকা-চিন্তায় সবাই যেন বিব্রত। হঠাৎ একটা নাম মনে পড়ল নির্মলবাবুর। রমা। সুচিত্রাই রমা। সুচিত্রা সেনসুচিত্রা সেন ইতিপূর্বে কয়েকটা ছবিতে কাজ করেছেন। দর্শকমহলে তখন সুচিত্রা সেন ধরতে গেলে নবাগতা। স্টুডিওতে ডেকে পাঠানো হল রমা সেন কে। স্টুডিও তে এলেন রমা সেন। করলেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর‘ ছবি সাইন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন উত্তম কুমার। শুরু হল উত্তম সুচিত্রা যুগ। সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পেল প্যারাডাইস সিনেমায়। ১৯৫৩। প্যারাডাইস তখন ছিল অন্যতম প্রথম শ্রেণির চিত্রগৃহ। বাংলা ছবি এই হাউসে মুক্তি পাওয়া তখন একটা বিরাট কৃতিত্বের পরিচয় বহন করা। এমপি-র কর্তৃপক্ষ যেন সেই কৃতিত্বই অর্জন করলেন। ফলাও করে বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনে মুখ্য বিষয়বস্তু হলো প্যারাডাইস। কিন্তু ছবির বিজ্ঞাপনে উত্তম কুমারের নাম সেভাবে দিলনা এম পি প্রোডাকশানস।দুঃখ পেয়েছিলেন উত্তম কুমার। কারন বিজ্ঞাপনের মুখ্য বিষয় ছিল প্যারাডাইস সিনেমা হল। সেখানে বাংলা ছবি রিলিজ।

পুত্রবধূকিন্তু এরপরে দুই নায়িকা মালা সুচিত্রা জুটি নিয়ে ছবি হল ‘ঢুলী‘। ১৯৫৪। এরপর দু বছর পর ১৯৫৬ তে মালা উত্তম জুটির প্রথম ছবি হল ‘পুত্রবধূ‘। পরিচালক চিত্ত বসু। এরপরে উত্তম সুচিত্রা জুটি ‘সাড় চুয়াত্তর‘ থেকে ‘অগ্নি পরীক্ষা‘ দিয়ে আলটিমেট জুটি তৈরী হল। কিন্তু সুচিত্রার সঙ্গে টক্কর চলল মালার। মালা তখন বোম্বেরও নায়িকা। সুচিত্রা সেন কে কাস্ট করা হল ‘পৃথিবী আমারে চায়‘ তে। কিন্তু পরিচালক নীরেন লাহিড়ী ও সুচিত্রার ছিল বিবাদ। ‘কাজরি‘ ছবির নানা ঘটনার পর থেকে সুচিত্রা সাইন করতেন না নীরেন লাহিড়ীর ছবি। সুচিত্রা ছেড়ে দিলেন ‘পৃথিবী আমারে চায়‘। ওদিকে ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ‘ সুচিত্রা লিপ দেবেন ভেবেই তৈরী। কিন্তু মিসেস সেন করলেন না এ ছবি। এলেন মালা সিনহা। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এর উল্টো ঘটনা ঘটল। সুচিত্রার ছেড়ে দেওয়া ছবির নায়িকা হলেন মালা। ঠিক এক ঘটনা ‘সাথীহারা’ ছবির ক্ষেত্রেও। গ্রাম্য রোল বলে ছবি ছেড়ে দেন সুচিত্রা সেন। গীতা দত্ত র গানে সদ ব্যবহার করলেন মালা সিনহা ‘সাথীহারা’ তে। মালা মাঝের দশক ছিলেন বোম্বের প্রথমা নায়িকা। এরপর সত্তর দশকে যখন বলিউডে নায়িকা হবার ঢলতি দিক মালার আবার বাংলায় এসে নায়িকা হয়ে করেন ‘দম্পতি’ ও ‘কবিতা’ ছায়াছবি। মালা র শেষ বাংলা ছবি কুলাঙ্গার। নব্বই দশকের শেষ ভাগে রিলিজ করে। ছবির মূখ্যভূমিকায় মালাই। মা ছেলের গল্প। ছেলের ভূমিকায় মালার জুটি নায়ক বিশ্বজিৎ পুত্র প্রসেনজিৎ।

Written By  – শুভদীপ ব্যানার্জী