‘মহালয়া’, সিনেমা নয় একটি আবেগ !

আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলকমঞ্জি,
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত
জ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমনবার্তা…

বিগত ৮৭ বছর ধরে ভেতো বাঙালী তার আলস্যপ্রিয় ভাবটিকেও এক লহমায় ত্যাগ করতে উদ্যত হয়েছে আলোচ্য স্তোত্রটি একটিবার শোনবার জন্য। কখনও বা ঘুমকাতুরে হয়েও সারারাত জেগে কাটিয়েছে ভুবনভোলানো উদার্ত কণ্ঠটি শোনার জন্য। সালটা ১৯৩১, ভারতবর্ষ তখন পরাধীন, মহালয়ার পুন্যলগ্নে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথমবার সম্প্রচারিত হল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বারো মাসে তেরো পার্বণে ভরা বাঙালীর প্রানের উৎসব দুর্গা পূজা। পিতৃতর্পণের মাধ্যমে দেবীপক্ষের আগমনের ঘটনা বাঙালী দেখেছে বহুযুগ ধরে। তাকে আবার ভক্তিভরে পালনও করেছে। এই আচার-সংস্কার ও বিশ্বাসকে আরও বহুকাল বাঁচিয়ে রাখার অবলম্বন পেয়ে গেল বাঙালী। ৯০ মিনিটের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ একদিকে যেমন চণ্ডীপাঠকে গুরুত্ব দিল অন্যদিকে গানের ব্যাবহারকেও বিশেষ গুরুত্ব দিল। হালকা শীতের আমেজ নিয়ে শরৎ মেঘের ভেলায় চড়ে বাঙালী শুনল-

“বাজলো তোমার আলোর বেণু,
মাতলো যে ভুবন…”

 

পরবর্তী ৪৫-টি বছর মহালয়ার সকালে বাঙালীকে একজোট করলো এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সুত্রধরের ভুমিকায় থাকলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। চিত্রনাট্য লিখলেন বানী কুমার। অনুষ্ঠানের গানগুলিতে সুর দিলেন প্রবাদপ্রতিম পঙ্কজ মল্লিক। সঙ্গীত পরিবেশনার দায়িত্বে ছিলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, শিপ্রা বসুর মত স্বর্ণযুগের শিল্পীরা। প্রথম ৩৫ বছর রেডিওতে লাইভ পাঠ হলেও ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ডিং করা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচার করা শুরু করে অল ইন্ডিয়া রেডিও। তালটা কাটল ১৯৭৬ সালের মহালয়ার দিন সকালে। সেই বছর অল ইন্ডিয়া রেডিও সিদ্ধান্ত নিল মহালয়ার সকালের অনুষ্ঠানটি নতুনভাবে সাজাবে তারা। সেইমত স্তোত্রপাঠের দায়িত্ব পেলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। তা সত্বেও শ্রোতারা তা গ্রহন করল না। সেদিন অল ইন্ডিয়া রেডিও উপলব্ধি করল, যে বাঙালী মহানায়ককে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সে অন্য কাউকে কখনও গ্রহন করবে না। অতএব অল ইন্ডিয়া রেডিও তার পুরনো অনুষ্ঠান নিয়ে ফিরে এল। কাশফুলের গন্ধ মেখে, আধো ঘুমচোখে বাঙালী আবার শুনল মহামায়ার আগমনীর গান –“জাগো দুর্গা। জাগো দশপ্রহরণধারিণী।
অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো”

বাঙালীর চিরাচরিত এই অনুষ্ঠান ও ইতিহাসকে সম্বল করে সিনেমা নির্মান করেছে এন আইডিয়াস ক্রিয়েশনস এন্ড প্রোডাকশনস। ছবির নাম মহালয়া। সিনেমার কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় সৌমিক সেন। ছবিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল এর কাহিনি বয়ন। বাঙালীর জানা গল্প তাঁরই কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন সৌমিক সেন। সেক্ষেত্রে তথ্যসঙ্কুল করে জ্ঞানের যোগান দিতে গিয়ে ছবিটিকে ডকুমেন্টরি ফিল্মের দিশা দেখানো থেকে বিরত থেকেছে ছবির নির্মাতারা। আবার ‘মাস অডিয়েন্সের’ কাছে পৌছ দিতে ড্রামাটিক এলিমেন্ট এর ব্যবহার করে চিত্ত বিনোদনেরও প্রয়াস রয়েছে। মহালয়া সম্পর্কিত ঘটনার সাথে ১৯৭৫ সাল নাগাদ ভারতবর্ষে চলা এমারজেন্সি পিরিয়ডেরও উল্লেখ রয়েছে কয়েকটি দৃশ্যে।

এবার আসা যাক চিত্রনাট্য ও পরিচালনার কথায়। চিত্রনাট্য তৈরির ক্ষেত্রে অডিয়েন্স সাইকোলজি নজরে রেখেছেন ছবির নির্মাতারা। তাই ছবির প্রয়োজন অনুযায়ী কাহিনীর বর্তমান ও অতীতের কন্ট্রাস্টটি তুলে ধরাতে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। সেক্ষেত্রে কালার গ্রেডেশন ডিপার্টমেন্টকে বাহবা দিতে হয়। কালারিস্ট মানস ভট্টাচার্য হালকা মেরুন কালার ব্যাবহার করে পিরিয়ডিক ফিল্ম অনুযায়ী মানানসই একটা ভিন্টেজ লুকস দিয়েছেন ছবির দৃশ্যগুলিকে। ছবির পরিচালনায় বেশ নতুনত্ব রয়েছে। সংলাপ প্রান প্রতিষ্ঠা করেছে এই ছবিতে। সো কলড ইন্টেলেক্টদের শব্দও নিয়ে খেলা ও তার ব্যাবহারে বাক্যবাগীশের ন্যায় একে অপরকে খোঁচা দেওয়া আবার একই সঙ্গে প্রশংসা করার দিকগুলি চোখে পড়ছে। ছবিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে যে প্রচুর পরিমান গবেষণা রয়েছে তার জন্য একবার হলেও অন্তত চাক্ষুষ করা দরকার ‘মহালয়া’ সিনেমাটিকে।ছবিতে সমান্তরাল ভাবে স্ক্রিনস্পেস শেয়ার করেছেন শুভাশীষ মুখার্জী ও যীশু সেনগুপ্ত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদার্ত কণ্ঠ ও ব্যাক্তিজীবনের দৃশ্যায়নে শুভাশীষ মুখার্জীর সাবলীল ভঙ্গিমা প্রশংসনীয়। অন্যদিকে লার্জার দ্যান লাইফ মহানায়কের চরিত্র চিত্রায়নে যীশুর চেষ্টাটি বেশ ভালই। উত্তম কুমারের ভাব-ভঙ্গিমা, কথা বলার ধরনগুলি বেশ ভালো অনুকরন করেছেন যীশু সেনগুপ্ত।ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফি ও আলোর ব্যবহার বেশ হতাশ করবে সিনে ক্রিটিকদের। ছবির সঙ্গীত দেবজ্যোতি মিশ্রের। প্রয়োজন অনুযায়ী সঙ্গীতের আশানুরূপ ব্যাবহার হয়েছে। সংখ্যার বিচারে দিনের শেষে ৪ টি ষ্টার পেতেই পারে সৌমিক সেন এন্ড টিম এর ‘মহালয়া’।