কমেডি দিয়েই বিপ্লব হানলো ভূতেরা !

অনীক

ছবি – ভবিষ্যতের ভূত , পরিচালক- অনীক দত্ত –  অভিনয়ে- সব্যসাচী চক্রবর্তী, বরুণ চন্দ, পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, চান্দ্রেয়ী ঘোষ,কৌশিক সেন, বাদশা মৈত্র,সৌরভ চক্রবর্তী,সৌম্য মুখার্জ্জী,মুনমুন সেন এবং স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ও প্রমুখ।

কলকাতার পটপরিবর্তন থেকে আর্থ সামাজিক ,রাজনীতি,চলচ্চিত্র,থিয়েটার,হোটেল সব যেভাবে বদল হয়েছে হচ্ছে সেই প্রেক্ষাপটেই অনীক দত্ত র এই ভূতুড়ে ছবি। শাসক দলের রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছে এই ছবি। কিন্তু শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোন শাসকগোষ্ঠী / রাজনৈতিক দলকেই নয় ছবিটা যদি খুঁটিয়ে দেখা যায় সব দলের সবার ভালো মন্দ দেখিয়েছেন পরিচালক। যেখানে একজন ক্যাবারে ড্যান্সার , যার গোপন জীবন দলিল আমাদের চির কৌতুহলের সেই মিস শেফালী এখানে মিস রূপালী নামে।মিস রূপালীর ভূত। যে আবার ভূত হয়ে তাঁর হারানো আগুন রূপ যৌবন ফিরে পেয়েছে।কিন্তু তাঁকেই তাঁর যৌবনে বিষকন্যা নাম দিয়ে তাঁর ক্যাবারে শো নাটক বন্ধ করে দিয়েছিল শাসকগোষ্ঠী। সে সময় আরো অনেকে সাহসী নাটক থিয়েটার করত মঞ্চে, চলচ্চিত্র জগতের শিল্পীরাও … মঞ্চে সিগারেট মদ খাওয়া থেকে ছোটো পোশাক।কিন্তু বিষকন্যা তকমা পেল একা রূপালী। রূপালীর রূপে পাগল হয়ে হাজির হত সুপারস্টার নায়ক থেকে মহানায়ক অথচ কলঙ্কের ভাগী সকল দোষের দাগী হয় একা রূপালী , তাঁকে ব্রা পরে ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে ছবিতে সুযোগ দেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পরিচালক যার ঋণ রূপালী মরেও ভোলেনি। আজ সে ভূতেদের রাণী।ওদিকে সাহেব কোম্পানী তে কাজ করা বাঙালী ভদ্রলোক যিনি সাহেবিকেতা মরেও ছাড়তে পারেননি।বৃদ্ধ কমরেড যার ধুতির কোচা খুলে দেয় পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী, যে পার্টিঘরে মারধোর খায় বৃদ্ধ বয়সে,মরে সে এখন কমরেড ভূত। যে টাইপিস্ট কম্পিউটারের যুগ চলে আসায় বাতিল। সেই অভাবে শোকে সে মরে ভূত হয়।টাইপিস্ট ভূত। এক বাঈজী যে বিধবা থেকে বাঈজী হয়, সে জীবন ছেড়ে মরে গিয়ে সে স্বাধীন। এক সাংবাদিক সত্যি খবর ছাপানোয় বাইক বাহিনীর হাতে খুন হয়। এক নটসূর্য মঞ্চে বাতিল হয়ে যাত্রার তাবুতেই হ্যারিকেনের আগুনে নিজেকে নিজেই পুড়িয়ে মারেন ব্যর্থতায়।

এইসব বাতিল ভূতেরা কলকাতা শহরের একসময়ের রমরম করা প্রেক্ষাগৃহ ‘বাতিঘর’ যা এখন বাতিল সেখানে বাস করতে থাকে। পুরনো মানুষ পুরনো সিনেমা হল পুরনো জিনিসের মতোই বাতিল।

বাতিল মানুষ গুলো ভূত হয়ে গাইতে থাকে মজা করে
“আমরা সবাই বাতিল আমাদের এই বাতিঘরে’ … ।

এহেন ভূতেরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারাও তাদের পরিভাষায় গুগল ফেসবুক ইন্সট্রাগ্রাম ইউস করা শুরু করে। তারাও প্রোফাইল খুলে ফেসবুকে বুদ মনুষ্যির ছা গুলোকে ফোন থেকে বেরিয়ে চোখ পাকিয়ে ভয় দেখাতে থাকে। ভাবুন ফোন থেকে যদি ভূত বেরোয় কি অবস্থা হয়?এই ভূতেরাই আবার কৃষক দের জমি দখল , তোলাবাজ, গুন্ডা, রাজনৈতিক দাদাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাড়ায় নিরীহ মানুষদের পাশে। ছবিটা শুধু বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে ভয় দেখানো নয় কোথাও গিয়ে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ। আর এই প্রতিবাদ স্যাটায়ার মোড়কে দেখিয়েছেন পরিচালক। আরো একটা জোরালো দিক দেখিয়েছেন পরিচালক যেমন যে মানুষ শাসক, সবল, ক্ষমতার বিরূদ্ধে আঙুল তুলেছে সেই মানুষ অবশেষে ভূতে বিলীন হয়ে গেছে।কিন্তু সেই অত্যাচারিত ভূতেরা কি ভাবে প্রতিশোধ নিচ্ছে সেটাই দেখার।শুধু যে রাজনৈতিক দল তাই নয় , যেমন ডাক্তার

“ডাক্তার মানে সে তো মানুষ নয় ,
আমাদের চোখে সে তো ভগবান
কষাই আর ডাক্তার একই তো নয়
কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশান।
কষাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার।ও ডাক্তার। “

একজন বৃদ্ধ অপেরেশান টেবিলেই মরে গেছে তবু তার পরিবারের থেকে টাকা নেবার জন্য তাকে ভ্যান্টিলেশানে ঢুকিয়ে টাকা শুষছে হসপিটাল ও ডাক্তার। সেই পেসেন্ট মরে ভূত হয়ে সেই ডাক্তারকেই ভয় দেখিয়ে ভেন্টিলেশেনে ঢুকিয়ে প্রতিশোধ মেটাচ্ছে। এরকম হাজারো অত্যাচারী অত্যাচারিত-র গল্প এ ছবি।

এবার আসি ছবির বুনোন ও অভিনয়ে।

ছবির শুরু ভূতের রাজার স্টার দেখিয়ে। সব্যসাচী চক্রবর্তী কালো গোগলস পরে শুরুতেই অনবদ্য। পরান বন্দ্যোপাধ্যায় আগের ছবিতে হন জমিদার এখানে নটসূর্য।বরুন চন্দ সাহেব বাঙালী ভূত দারুন। চান্দ্রেয়ী ঘোষ ক্যাবারে ডান্সারের ভূমিকায় ফাটিয়ে দিয়েছেন। কি আবেদন কি তেজ অসাধারন।তবে একটা কথা বলার তথ্যে , দেখে বোঝাই যায় মিস শেফালি এখানে মিস রূপালী। কনসেপ্ট দারুন। কিন্তু শেফালীকে মিস জে নাচের তালিম দেননি কোনকালে। মিস জে আর মিস শেফালী সমসাময়িক ক্যাবারে ডান্সার। জয়শ্রী সরকার হয়ে যান মিস জে।এখানে ছায়াছবিতে মিস জে শেফালির মেক ওভার শিক্ষয়িত্রী মিস জে ওরফে মুনমুন সেন। যাই হোক ছবির খাতিরে অদল বদল হতেই পারে। তবে মুনমুন সেনের নামটাই ব্যবহার করা হচ্ছে ওনার কোনকিছুই নেই করবার মতো। এক লহমার জন্য চন্দ্রমার ছটা। মুনমুনকে ছবিতে ব্যবহারই করলেন না পরিচালক। কিন্তু এমন একটি ছবি মুনমুন করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে।খরাজ, চন্দন সেন,বাদশা, কাঞ্চন দারুন। কাঞ্চন মল্লিক প্লে ব্যাক করেছেন এই ছবিতে একটা বড় গান এই প্রথম। কৌশিক সেন দারুন।বাঈজী ভূতের রোলে দেবলীনা দত্ত মুখার্জ্জী বেশ সুন্দর। রেশমী সেন দাঁত চেপে রাবেন্দ্রিক ভূত কি অনবদ্য। নতুন প্রজন্মদের মধ্যে সৌরভ চক্রবর্তী, সৌম্য মুখার্জ্জী বেশ সপ্রতিভ। নিকিতা গান্ধী ও পরমা বন্দ্যোপাধ্যায় গানে বেশ।

এবার আসি কিছু খামতি তে, ছবির বুনোট ছাড়া ছাড়া । এত চরিত্র যে যাদের বনর্না দিতে দিতে প্রথমার্ধ্ব শেষ। প্রথম ভাগ ছবিটা বুঝতেই সময় লেগে যাবে। দ্বিতীয় ভাগ থেকে ছবি জমল। আরেকটু কমপ্যাক্ট হলে ছবিটা জমত আরো। ‘ভূতের ভবিষ্যত’ এর থেকে এ ছবির গান সেই উচ্চতায় নয়। কিন্তু ‘ভূতের ভবিষ্যত’ ছিল মিষ্টি ছবি সেখানে ‘ভবিষ্যতের ভূত’ অনেকবেশী জোরালো। এখানেও ডায়লগের কমেডিতে সত্যি দেখিয়েছেন পরিচালক। ডায়লগে মজার চমক।
যেমন,

Bhobishyoter Bhootঅভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা অনবদ্য। কমিক কার্টুন দারুন। আর কি কিছু বাদ দিয়ে যাচ্ছি? হ্যাঁ কদলীবালা। এ ছবিতেও এতদিন পর আবার হাজির সে তাঁর কথায় গেস্ট এপিয়ারেন্স। নাচে গানে এখানেও মাত করেছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। দর্শকের মন ভালো করবে কদলী। কদলীর লিপে গানটা বেশ সুন্দর। ‘আবার এসেছি আমি ফিরিয়া’। নাটুকে কদলী আর কাব্যারে রূপালীর মাগী থেকে হারামজাদি মাগী বাগবিতন্ডা দারুন। এ ছবি মোটা দাগের ছবি নয় শিক্ষিত ছবি তাই ধৈর্য্য নিয়ে দেখতে হবে বুঝতে হবে। এ ছবি বড় স্পষ্ট করে নবজাগরণ ঘটাচ্ছে। রাজনৈতিক স্যাটায়ার এই ফিল্ম। দেখেই বুঝেছি এত সহজে এই ফিল্ম আমাদের রাজ্যের অনেকে দেখবে না। তবে এই ছবিতে কিন্তু সব রাজনৈতিক দলকেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে কমিকের স্টাইলে, কোনো বিশেষ একটি দলকে শুধু নয়।

অনেক গুলো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল অনীক দত্তের ‘ভবিষ্যতের ভূত’।

লিখেছেন @শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়