নব্বই-এর তরুণ স্টিমবোট উইলির গল্প !

মিকি মাউস

ফুরফুরে মনে হাওয়ার বিপরীতে জাহাজের মাস্তুল ধরেছে মিকি মাউস। তার বড় বড় গোল কান গুলো হাওয়ার বেগে অল্প অল্প দুলছে, গোটা শরীরে খেলা করে যাচ্ছে ছন্দ, মাঝে মাঝে শিস দিয়ে উঠছে সে….স্টিমবোট উইলির এই দৃশ্য শৈশবের সবুজ দিয়ে ঘেরা। এই ছবি আজো মনে পড়লে একছুটে কার্টুন দেখার দিন গুলোতে ফিরে যাবেন না, এমন মানুষ খুব কমই আছেন। তবে অনেকেই বোধহয় জানেন না, এই স্টিমবোট উইলি-ই ছিল পৃথিবীর প্রথম সঙ্গীত অনুষঙ্গ নেওয়া অ্যানিমেশন ছবি। মিকি মাউসউনিশশো আঠাশ সালের আঠেরোই নভেম্বর মহান স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনি স্টিমবোট উইলি দর্শকদের উপহার দেন। শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, প্রযুক্তির হাত এখন এতই শক্ত যে ছবির পর্দাতে সবকিছুই প্রায় সম্ভব, কিন্তু মহান স্রষ্টাদের সৃষ্টি থেকে যায় অমলিন। এই দু হাজার আঠেরোর আঠেরোই নভেম্বর পাড় করে এসেও স্টিমবোট উইলি আজো চীর নতুন! তার বয়স বাড়ে নি এক ফোঁটা। মিকির দেশ অনেক দূর। তবু পৃথিবীর উলটো পিঠে থেকেও মিকি মাউসকে ছাড়া একটা ছোটবেলা বোধহয় আজো ভাবা কঠিন। আর সাটিমবোট উইলি তো মিকির খোশমেজাজ অবতার গুলোর মধ্যে অন্যতম পছন্দের। ভাগ্যিস ডিজনি সাহেব দ্য জ্যাজ সিংগার ছবিটি দেখে ছিলেন!

মিকি মাউস স্টিমবোট উইলিনয়তো অ্যানিমেশনেও যে গান যোগ করা যায় সেই ভাবনা তার মাথায় আসত কী করে! খোদ তার ভাই রয় ডিজনিই যে জানিয়েছেন, ঐ ছবিটিই স্টিমবোট উইলির পিছনের সবথেকে বড় অনুপ্রেরণা! এখনকার পৃথিবীতে বসে ভাবলে যেন মনে হয় অন্য কোনো গ্রহের কথা বলা হচ্ছে, আজকাল যে গান ছাড়া বা নিদেনপক্ষে কথা ছাড়া অ্যানিমেশন ভাবাই যায় না! কিন্তু মাত্র নব্বই বছর আগেও যে ওয়াল্ট ডিজনিকে তার স্টিমবোট উইলিতে সঙ্গীত যোগ করতে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল, ভাবলে অবাক হতে হয়! সময়টা তখন ডিজনির জন্য খুব টালমাটাল। চার্লস মিন্টজ্-এর কাছে অলরেডি হারিয়ে ফেলেছেন অসওয়ার্ল্ড আর লাকি বানির মতো লাকি চার্ম ক্যারেক্টারদের। তুরুপের তাস হয়ে কেবল রয়ে গেছে মিকি মাউস। আর তখনি দ্য জ্যাজ সিংগার ডিজনির খ্যাতির পিপাসা আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিল।

মিকি মাউসডিজনি জানতেন অ্যানিমেশনে সঙ্গীত যদি যোগ করতে পারেন তবে আর কোনো শক্তিই তাকে বাধা দিতে পারবে না। যদিও তখন কাজটা এতটা সহজ ছিল না একেবারেই। ডেভ এবং ম্যাক্স ফ্লেইসচার চার বছর আগেই সাত বার চেষ্টা করেও অ্যানিমেশনের সাথে সঙ্গীতকে খাপ খাওয়াতে পারেন নি একেবারে। প্রযুক্তির যথেষ্ট অভাব, আর সামনে জ্বলন্ত বিফলতার উদাহরণ, কিন্তু তাও হেরে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেননি ডিজনি সাহেব! নিজের পুঁজিতে তখন মাত্র চারহাজার নশো ছিয়াশি মার্কিন ডলার, আর তার পুরোটাই তিনি ঢেলে দিলেন স্টিমবোট উইলির জন্মের জন্য।

মিকি মাউসউনিশশো আঠাশের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মেকিং শেষ হয়েছিল উইলির, যদিও একেবারে বিগ রিলিজের ব্যাপারে বেশ ভয়ে ছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি, তাই প্রথম এক ঘরোয়া স্ক্রিনিং-এ অগ্নি পরীক্ষাতে পাশ করতে হয় স্টিমবোট উইলিকে। উনত্রিশ জুলাই, ডিজনির অফিস লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘরে অসমাপ্ত স্টিমবোট উইলির অবতারে মিকি মাউসকে দেখেন ডিজনিতে কর্মরত মানুষ ও তাদের পরিবার। একটা বিপত্তির আঁচ প্রথম থেকেই ছিল, তাই আলাদা করে তৈরী রাখা হয়েছিল মিউজিসিয়ানদেরকেও! সেদিন কিন্তু মিকি মাউসের অ্যাডভেঞ্চার সফল হয় নি, হেরে গিয়েছিল স্টিমবোট উইলি, সঙ্গীতের বাঁধন অ্যানিমেশনকে বাঁধতে পারে নি। কিন্তু তারপরেও ওয়াল্ট ডিজনি হার মানেন নি!

মিকি মাউসনিউ ইয়র্কের প্যাট পাওয়ারস্ কোম্পানির সাহায্যে আবিষ্কারক লি ডে ফরেস্টের এক উন্নত মানের সিনেফোন সিস্টেম কেনেন তিনি। নিজের সাধের মুন রোডস্টার গাড়িটিকেও বিক্রি করে দেন টাকার অনটনের জন্য! এবার সফল হয় মিকি, তার স্টিমবোট অভিযানকে আর কেউ থামাতে পারেনি কোনো মতে! রেকর্ড করা হয় সঙ্গীত। ডিজনির ইতিহাসে লেখা হয়ে যায় গ্রীন ব্রাদার্স নোভেলটি সঙ্গীত দলের নাম। উনিশশো আঠাশ সালের আঠেরোই নভেম্বর দর্শকের সামনে আত্মপ্রকাশ করে স্টিমবোট উইলি। মিকির এই নতুন ফুরফুরে মেজাজ আর তার সাথে গানের সুর বাচ্চা…বৃদ্ধ সবার মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেয়। তার আবেশ এমন-ই যে আজ নব্বইটা বছর পেরিয়ে এসেও চীর নতুন স্টিমবোট উইলি, আর মিকিরও বয়স বাড়েনা!

মিকি মাউসআমাদের শৈশবের দিন গুলোকে এত ছন্দে, এত গানে আর খুশিতে ভরিয়ে দিতে গিয়ে যে ত্যাগ করেছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি, আর সেটাও যে রকম একাগ্রতা আর বিশ্বাসের সাথে, তার জন্য তাকে অনেক অভিবাদন, শ্রদ্ধা ও কুর্নিশ। আর ছেলে বেলা ঘেরা দিন গুলোকে এত সবুজ করে রাখার জন্য মিকির জন্য অনেক অনেক আদর যে জমা আছেই, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না! স্টিমবোট উইলির চার্ম আজো অমলিন, এমন আরো অনেক গুলো নব্বই বছর পেরোনোর পরেও থাকবে, আর আমরা স্বপ্ন দেখে যাবো মিকির সাথে ঐ স্টিমবোটে চড়ে অজানা কোনো রঙধনুর দেশে পাড়ি দেওয়ার, বা ফুরফুরে কোনো গানের ছন্দে মন ভাসাবার!