” আমার মৃত্যুর খবর যেন মিডিয়াকে না জানানো হয়।” – কণিকা মজুমদার !

কণিকা

তিনি ‘রক্তকরবী’ র নন্দিনী। কখনও তিনি মণিমালিকা, কখনও তিনি দময়ন্তী, কখনও তিনি প্রতিমা৷ ‘মণিহারা’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘হার মানা হার’ ছবিতে এরা তাঁরই অভিনীত চরিত্র৷ কণিকা মজুমদার৷ সহ অভিনেত্রী রূপেও প্রচুর বিখ্যাত ছবি ‘বসন্ত বিলাপ’-র বৌদি, ‘সোনার খাঁচা’-য় এক ব্যর্থ প্রেমিকা, মায়ের ভূমিকায় ‘রাগ অনুরাগ’,’প্রিয়তমা’,’অবশেষে’ কিংবা একদম তুখোড় ভিলেন রূপে ‘জীবন সৈকতে’ -র লেডি ডাক্তার। যিনি উত্তম নায়িকা, সত্যজিৎ নায়িকা আবার সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, অপর্ণা দের সহ নায়িকা। দীনেন গুপ্ত,সলিল সেন,অসিত সেন, অগ্রদূত, অগ্রগামীর ছবির অভিনেত্রী তিনি। আকাশবানীতে তাঁর কন্ঠস্বরে নাটক যা ছিল ঘরেঘরে জনপ্রিয়। মঞ্চে ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘বেগম মেরি বিশ্বাস।

কিন্তু এই বিখ্যাত নায়িকা থাকতেন জীবনের শেষ দু দশক বৃদ্ধাশ্রমে। নিজ ইচ্ছাতেই বেছে নেন বৃদ্ধাশ্রম। কণিকার স্বামী ছিলেন তরুন মজুমদার। না চিত্র পরিচালক নন। স্বামী ওঁকে অভিনয়ে সবসময় প্রেরণা দিয়েছেন সে গল্প পরে বলছি। নব্বই দশকের সময় কণিকা রূপোলি পর্দা মিডিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। শেষের ছবি গুলো উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর ‘ছন্দনীড়’,প্রসেনজিৎ-রূপা গাঙ্গুলী অভিনীত ‘পৃথিবীর শেষ স্টেশন’। একমাত্র কন্যা বিয়ের পর লন্ডনে অধ্যাপনা করেন৷ মেয়ে, জামাই,নাতনি বিদেশেই। কলকাতায় কণিকা আর তাঁর স্বামী থাকতেন। ১৯৯৪ সালে স্বামী তরুন মজুমদারের মৃত্যুর পর পার্ক সার্কাসের ফ্ল্যাটে বড় একা বোধ করতে থাকেন কণিকা৷ মাঝে মাঝে ভয়ও করত৷ তাঁর নিজেরই আগ্রহে সেই পার্ক সার্কাসের ফ্ল্যাট বিক্রি করে বৃদ্ধাবাসে এসে থাকলেন। বৃদ্ধাবাসে কন্যারা আসতেন দেখতে। করে দেন মায়ের ঘোরাঘুরির জন্য গাড়ির ব্যবস্থা। কিন্তু কণিকা সেভাবে বেরোতেন নাহ। আবাসিক দের সঙ্গে সময় কাটাতেন কিংবা নিজের ছন্দে। তবে কখনই নায়িকা সুলভ স্টারডম নিয়ে থাকতেন নাহ। বহুজনই বলেছেন তাঁদের আত্মীয়রাও ঐ বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিক আবাসিকা। সব আবাসিকদের আত্মীয়দের সঙ্গেও জমিয়ে গল্প করতেন কণিকা। একবার তো এক আবাসিকের বোনঝি কে কণিকা বলেছিলেন “এই দেখো তোমার মাসীর চুল কেটে কেমন মেম সাজিয়ে দিলাম।” হাসি ঠাট্টা করতেন সকলের সঙ্গে। মুখে লেগে থাকত হাসি। কণিকা মজুমদারমাঝেরহাটের ‘অস্তরাগ’ বৃদ্ধাশ্রম। এখানে ছিল বিধি নিষেধ। মিডিয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ। কণিকা এরজন্য কোনদিন মেয়েকে দোষ দেননি। মেয়ে জামাইয়ের ইচ্ছেতে তিন বার বিদেশেও ঘুরে এসছেন কিন্তু জন্মভূমি ছাড়েননি। কলকাতাতেই নিভৃতে ছিলেন নায়িকা। প্রথম ছবির অফার পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যোগাযোগ’। সেই ছবিতে রোলের কথা জানতে স্বামী তরুন মজুমদারের সঙ্গে কণিকা গেছিলেন ফ্লুরিজে পরিচালক নীতিন বসুর সঙ্গে দেখা করতে। পেলেন নায়িকা কুমুদিনীর রোল। কিন্তু রেগে আগুন হয়ে গেলেন শ্বশুর মশাই। তিনি ছিলেন অনুশীলন সমিতির জ্ঞান মজুমদার। তিনি ঐ পরিচালকের নামে অভিযোগ দায়ের করলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের কাছে। তাঁর পুত্রবধূকে সিনেমায় নামানো যেন না হয়। ব্যস কণিকার আর কুমুদ এর রোল করা হলনা। ছবির জগতে ইতি। শুরু করলেন মন্টেসরি টির্চাস ট্রেনিং নেওয়া। পড়াতেন দক্ষিন কলকাতার স্কুলে। সত্যজিৎ রায় ‘মণিহারা’ র মণিমালিকার জন্য বাছলেন কণিকাকে।

এবার শ্বশুরের বাঁধা টিকলনা। একে সত্যজিৎ সুকুমার উপেন্দ্র কিশোরের রায় পরিবার থেকে ছবির অফার আর অন্যদিকে সত্যজিৎ র মা সুপ্রভা রায় ছিলেন কণিকার মায়ের স্কুলের সহপাঠিনী। কণিকা দেখা করতে এলেন সত্যজিতের কাছে। সত্যজিৎ তখন বলেছিলেন “‘আমার শ্যুটিং শুরু হতে একটু দেরি আছে৷ ততক্ষণ তুমি বরং আমার বন্ধু মৃণাল সেনের ছবি ‘পুনশ্চ’টা করে দাও৷”

প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন কণিকা মৃণাল সেনের ‘পুনশ্চ’ তে। এরপর সত্যজিৎ র সঙ্গে শ্যুটিং। বিজয়া রায় শেখাতেন গান যাতে লিপ দিতে সুবিধে হয় সেই ‘বাজে করুন সুরে’। প্লেব্যাক রুমা গুহঠাকুরতা করলেও, কণিকাকেও গানটা শিখতে হয়েছিল৷ ‘ তিনকন্যা’ সুপারহিট হল। ‘তিন কন্যা’ সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র যা ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি পায়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কণিকাকে। অন্য ছবি করতে ডেট দিয়ে ফেলায় করতে পারেননি তপন সিনহার ‘ঝিন্দের বন্দী’ কিংবা সত্যজিতের ‘ কাঞ্চনজঙ্ঘা’।

মাঝেরহাটের অস্তরাগ বৃদ্ধাশ্রমে থেকেও পড়তেন খবরের কাগজ। আবাসিকদের সঙ্গে দেখতেন একসঙ্গে টিভি। জানতেন সহকর্মী বন্ধুদের খবর। একবার তো বলেছিলেন “মাধু সাবু ওদের বিশ্রামের প্রয়োজন নেই”। শেষ কিছু বছর বেশ অসুস্থ ছিলেন। প্রায় শয্যাশায়ী ছিলেন। এই বৃদ্ধা বয়সে কারোর বোঝা বাড়াবেন না, নিজের শর্তে বাঁচবেন, বৃদ্ধা বয়সে অচেনা মানুষদেরই নিজের করে নেন স্টারডম ঝেঁড়ে ফেলে। পার্ক সার্কাসের ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে আসেন ‘অস্তরাগ’।

এই কণিকার জীবনী নিয়ে একটা ছবিতে চরিত্র বানান সুদেষ্ণা রায় ও অভিজিৎ গুহ। জানা নেই তাঁরা সচেতন ভাবে কণিকাকে ভেবেই বানিয়েছিলেন কিনা। এরকম এক প্রখ্যাত নায়িকা বৃদ্ধাশ্রমে সকলের অগচোরে থাকেন। ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য রোলটা করেন। ছবির নাম ‘বেঁচে থাকার গান’।

কণিকার আরো কিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্র তালিকা।

আগুন (১৯৬২), অগ্নিশিখা (১৯৬২), প্রথম প্রেম (১৯৬৫), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), পঞ্চশর (১৯৬৮), বিলম্বিত লয় (১৯৭০), নবরাগ (১৯৭১), হার মানা হার (১৯৭২), বসন্ত বিলাপ (১৯৭৩), সোনার খাঁচা (১৯৭৩), রাণুর প্রথম ভাগ (১৯৭৪), রাগ অনুরাগ (১৯৭৫), বন্দী বিধাতা (১৯৭৫), চাঁদের কাছাকাছি (১৯৭৬), তিলোত্তমা (১৯৭৮), প্রিয়তমা (১৯৮০), দুষ্টু মিষ্টি (১৯৮১), ছন্দনীড় (১৯৮৯) এবং পৃথিবীর শেষ স্টেশন (১৯৯৩)। কলকাতা দূরদর্শনে কিছু ধারাবাহিক করেছেন তখন মেগার যুগ ছিলনা। তারপর নিজেকে সরিয়ে নেন।

কণিকা দীর্ঘদিন যখন অসুস্থা ছিলেন তখন বৃদ্ধাশ্রমের লোকদের বলে গেছিলেন তাঁর মৃত্যুর খবর যেন মিডিয়াকে সেসময় জানানো না হয়। কোনো স্টুডিও পাড়া কি রবীন্দ্র সদনে তাঁর মরদেহ রাখা না হয়। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মারা যান কণিকা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

শেষ প্রচার টুকুও এখনকার মতো গান স্যালুট কিচ্ছু চাননি মণিমালিকা। প্রতিমা বিসর্জনের ঢাক যেন না বাজে এই ছিল কণিকার শেষ ইচ্ছে।

লেখক : শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়