বাংলা ছবির দু:সময়ের অন্নদাতা ! ব্রাত্য বাংলা সিনেমার একশো বছরের ইতিহাসে !

অঞ্জন চৌধুরী

যাঁকে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব গুরুদক্ষিণা টুকুও দিলনা। তিনি বাংলা ছবিকে বউ সিরিজ উপহার দিয়ে ডুবিয়ে দিয়ে গিছেন আজকালকার জ্ঞানপাপী দুটো শর্ট ফিল্ম বানানো পরিচালকরা দাবী করেন। সেসব ছবিতে না আছে কোনো প্রাণের টান না ভরে মন। আজকালকার মূলধারার ছবিগুলো তো তামিল টোকা কিংবা এত বাজেট সেখানে মনের টান বাঙালীয়ানাটাও নেই। কিংবা সব থেকেও কি যেন একটা নেই ছবিগুলোতে। আবার ছবিতে দেবদেবী গুলো শ্বেতপাথরের বলিউড টোকা। কোনো বাঙালী পরিবারে ওমন ঠাকুরঘর হয় যেখানে লক্ষীর পাঁচালী পিঠেপুলি ব্রতকথা নেই শুধু গুজরাটি টোকাশিল্প। কিন্তু যার কথা বলছি তাঁর ছবিগুলো নিখাদ বাঙালীয়ানায় ভরা। যখন বাংলা ছবিতে সবাই বাংলায় কথা বলত। বাঙালী পরিবারের লোকরা ঘরে ইংরেজীতে কথা বলা প্র্যাক্টিস করত না। মদ,ব্যান্ড, পার্টির তুফান উড়ত নাহ। টলিউড ছিলনা টালিগঞ্জ ছিল। যখন মিনার বিজলী ছবিঘর হাউসফুল হত।

অঞ্জন চৌধুরী … আলোড়নসৃষ্টিকারী নাম।

অঞ্জন চৌধুরীঅঞ্জন চৌধুরীর একটা ছবি যা বানিজ্য দিত আজকালকার পাঁচটা ছবি মিলিয়েও সেই বানিজ্য হয়না। আজকাল ছবি দর্শক হলে দেখার চেয়ে আমাজন,নেটফ্লিক্স এ দেখে বেশী। মাল্টিপ্লেক্স গুলোয় শুধু ছবি চলে। সিঙ্গল স্ক্রীনে সে অর্থে আজকাল কোনো ছবি চলেই না।
মফস্বল জেলাগুলোতে বহু ভালো বিগ স্ক্রীন সিনেমা হল ছিল। যেমন মনে আসছে চুঁচুড়া র অরো সিনেমা হল। সেই সিঙ্গেল স্ক্রীন হল ভেঙে দেওয়া হয়েছে এতটাই মার খাচ্ছে। কলকাতার মালঞ্চ প্রিয়ার মতো সিঙ্গল স্ক্রীন বন্ধ। একটা ছবি দেখতে যাওয়া সিঙ্গেল স্ক্রীনে সবসময়ই আলাদা ব্যাপার। ছবির আমেজ সেখানেই সবচেয়ে বেশী পাওয়া যায়। অঞ্জন চৌধুরীর পারিবারিক ছবি গুলো ঠিক এই সিঙ্গেল স্ক্রীনে লাল হাউসফুল বোর্ড ঝোলাতে সক্ষম হত।

অঞ্জন চৌধুরী বলতেন ” বিদেশ থেকে আমার সোনার ভাল্লুক লাগবে না, সিনেমা হলের বাইরে হাউসফুল লেখা বোর্ডটাই আমার বড় পাওনা।”

যার ছবিতে মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনয় করবেন পাকা ছিল কিন্তু মহানায়কের মহাপ্রয়ান ঘটায় সেটা অধরা রয়ে গেল। তখন সেই ছবির নাম ছিল “হব ইতিহাস”। নায়ক নয়, ভিলেনের চরিত্র করতেই উত্তম কুমার চেয়েছিলেন। তখন ছবিটির পরিচালক শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। মহানায়ের অকাল প্রয়াণের পর ছবিটি করেন অঞ্জন চৌধুরী। “হব ইতিহাস”র নাম হল “শত্রু”। “শত্রু” বাংলা ছবির ইতিহাস থেকে কোনদিনো মুছে যাবেনা। উত্তমকুমারের জায়গায় করলেন মনোজ মিত্র। রঞ্জিত মল্লিক র সারা জীবনে সেরা অভিনয় “শত্রু”। মাস্টার তাপুর “ও পুলিশ” ডাক কেউ ভুলবেনা। অঞ্জন চৌধুরীর মতো পরপর সিন প্রশ্নোত্তর দিয়ে ডায়লগ দিয়ে জুড়ে দেওয়া চিত্রনাট্য লিখতে কেউ কোনোদিন পারেননি। একজন সেরা চিত্রনাট্যকার তিনি।

ছোট বউঅঞ্জন চৌধুরী বাদে আর পরিচালক নেই যার ছবির ডায়লগ শুনতে পরের পর ক্যাসেট হট কেকের মতো বিক্রি হয়েছে। ছোটো বউ, গুরুদক্ষিণা এসব ছবির ক্যাসেট শুধু ডায়লগ শুনতে লোকে কিনেছে। যেগুলো বহুপরেও হটকেক।এতোই জোর ছিল তাঁর চিত্রনাট্য লেখার। হেন বড় স্টার নেই বাংলা ছবির যিনি অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে কাজ করেননি। যে ফিল্মবোদ্ধারা বলেন অঞ্জন চৌধুরী বাংলা ছবিকে আরও কাদায় নামায় তারা কিন্তু এটা বলেননা, মহানায়কের মহাপ্রয়াণ, সুচিত্রা সেনের অন্তরালের পর টলিপাড়ার স্টুডিওপাড়ায় তালা ঝুলে যায়। সব ছবি বন্ধ হয়ে যায়। কোনো টেকনিশিয়ান খেতে পেতেননা। অন্ধকার যুগ চলে আসে। সত্যজিৎ, তপন, মৃনাল, তরুন থাকলেও তাঁরা হয়তো বছরে দু একটা ছবি বানাতেন কিংবা তাও না। মূলধারার ছবি একটাও তৈরী হতনা।

লাল হাউসফুল বোর্ড তখন অঞ্জন চৌধুরী, বীরেশ চট্টোপাধ্যায় তার কিছু পরে প্রভাত রায় সুজিত গুহ র মতো পরিচালকরা মূলধারার ছবিকে বানিজ্য সফল করান। হলের বাইরে লাল হাউসফুল বোর্ড ঝোলাতে সক্ষম হন। টলিউড আবার নিজ ছন্দে ফেরে।আজ সেই পরিচালক চিত্রনাট্যকার অঞ্জন চৌধুরীর অবদান কি করে লোকে ভুলে যায়? অঞ্জন চৌধুরী বলতেন “আমার ছবি প্যাকেটে করে বিদেশে আওয়ার্ড আনতে যায়না যে ছবি বাংলার লোক দেখতে পায়না,আমার ছবির হলের বাইরে লাল হাউসফুল বোর্ড ঝোলে।”

তিনি ছিলেন সমাজ সচেতন কাহিনীকার। তাঁর চিত্রনাট্যে তীব্র কষাঘাত এনেছেন সমাজের সব কুপ্রথার বিরুদ্ধে। কিন্তু শত্রু তো পুরস্কার পাবার মতোই ছবি। তাঁর ছবিতে থাকত নিখাদ বাঙালীয়ানা যেটা দর্শক পাশের বাড়ির ঘটনা দেখছে ভাবে। তার ছবিতে বিশাল বিশাল সেট, বিদেশে কোটি টাকার লোকেশানে গান থাকতনা কিন্তু উল বোনা, কুরুশের কাজ করা কত শিল্প, বাঙালীর পুজো পাব্বন, একান্নবর্তী পরিবারের রান্নাবান্না থাকত। সব পরিচালকেরই ভালো মন্দ কাজ থাকে,ঋতুপর্ণ-র ব্যোমকেশও ট্রাশ মুভি। তাই সবারই শেষের দিকে অনেক ট্রাশ ওয়ার্ক থাকে তাতে তাদের অবদান মুছে যায়না।
অঞ্জন চৌধুরীসৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রুমা গুহঠাকুরতা, উৎপল দত্ত, গীতা দে, রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, সন্ধ্যা রায়, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, মাধবী, মহুয়া, দেবশ্রী, শতাব্দী, মীনাক্ষী গোস্বামী, কালী বন্দ্যোপাধ্যায় কে কাজ করেননি অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে! চুমকি চৌধুরীর মেজ বউ, ইন্দ্রজিৎ, নাচ নাগিনী নাচ রে এত সুপারহিট হয় চুমকি জায়গা করে নেন দেবশ্রী মুনমুন শতাব্দী দের গ্ল্যামারের পাশে। নায়িকা হতে স্লিম এন্ড ট্রিম হতে হয়না দশর্কের হৃদয়ে পৌছতে হয়। সেটা চুমকি করে দেখিয়েছেন। রীনা চৌধুরীর “পূজা” “আব্বাজান” পশ্চিম বাংলাসহ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ মনে রেখেছে আজও। অঞ্জন চৌধুরী বাইরেও চুমকি ভালো অভিনেত্রী আজকাল অনেক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে চুমকি চৌধুরীর অভিনয়ের দাপট দেখি। রিনা চৌধুরী এখন পরিচালিকা। অঞ্জন পুত্র সন্দীপ চৌধুরীও পরিচালক।অঞ্জন চৌধুরীর ধারা তারা বজায় রেখে চলেছেন।

Soham Horlicks Scenseআর বউ সিরিজ র ডায়লগ সন্ধ্যা রায় ভালো বউ সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জ্জী কুচুটে বউ সোহমের হরলিক্স খাওয়া এত দশক মানুষ মনে রেখেছে সেটা কোথাও তার পরিচালনার গুন। অসম্ভব সুপারহিট ছবি করতেন উনি। ভবাণীপুরের যে ভারতী সিনেমা হল আজ বন্ধ সেই হল “গুরুদক্ষিণা” স্টপেজ নাম হয়ে যায় এত দর্শক নামতো ঐখানে সিনেমা দেখতে।
শিবপ্রসাদ নন্দিতা

সিঙ্গেল স্ক্রীন কে বাঁচিয়ে রাখতে অঞ্জন বীরেশ প্রভাত দের মতো পরিচালকদের দরকার আজও যে জায়গাটা শিবপ্রসাদ নন্দিতা কিছুটা পূরন করেছেন। কিন্তু আরও দরকার। সাদা কালো আর্ট ফিল্ম যেকোন আর্ট ফিল্ম আর এইসব তামিল টোকা বানিজ্যিক ছবি করে গেলে সিঙ্গেল স্ক্রীন হল গুলোকে আরও বন্ধ করে দেবে।এত সিনেমা হল উঠে গেল,আজকাল সিনেমা দেখা বিলাসিতা একটা ছবি দুশো তিনশো টাকা মাল্টিপ্লেক্সে দেখা।কিন্তু মাল্টিপ্লেক্স কোনদিনও সিঙ্গল স্ক্রীনের পরিবেশ আবহ তৈরী করতে পারেনা।বহু মানুষ ছবি দেখেনা সিঙ্গল স্ক্রীনের অভাবে।কত ছবি হল পায়না সিঙ্গল স্ক্রীন গুলোর কেউ যত্ন নেয়নি বলে।অনেক আগেই উঠে যেত যদিনা অঞ্জন চৌধুরীর মতো পরিচালকরা হাল ধরতেন।

শুধু হলিউড ছবি আর আর্ট ফিল্ম দেখলেই ফিল্মবোদ্ধা হওয়া যায়না। আর্ট ফিল্ম কোনদিনও কমার্শিয়াল ছবির মতো পেটে ভাত জোগাতে পারেনা টেকনিশিয়ানদের। সব ছবি দরকার ভালো ছবি মন্দ ছবি আর্ট মূলধারার। আর একটা কথা না বললেই নয়, আজ যখন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলা ছবির একশো বছরে অতীতের সবাইকে স্মরণ করা হল সেখানে জায়গা হলনা বাংলা ছবির একসময়ের অন্নদাতা অঞ্জন চৌধুরীর।
কেউ করলনা তাঁর স্মৃতিতর্পণ। অথচ তাঁরাই কাজ করেছেন অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে। অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে কাজ করেই এককালে জনপ্রিয়তা অর্থ পান তাঁরা। বাংলা চলচ্চিত্রের একশো বছরের ইতিহাসে কি অঞ্জন চৌধুরীর এই বিশাল অবদান, টেকনিশিয়ান থেকে হলের মালিক কর্মচারীর অন্নদাতা ছিলেন যিনি , আসবেনা?

অঞ্জন চৌধুরীচলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পত্র পাঠাবার সময় ব্রাত্য রাখা হয় অঞ্জন চৌধুরীর পরিবারকে। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের অন্ধকার যুগে আলো দেখান তিনি।

আজও এযুগের ইউটিউবে তে সবচেয়ে বেশী ভিউ অঞ্জন চৌধুরীর ছবি গুলো। সেসময়কার বাংলাছবি আর এখনকার বাংলাছবির মেকিং মার্কেটিং সব আমুল বদলে গেছে কিন্তু দর্শকদের মনে আজো ভালো লাগার জায়গা অঞ্জন চৌধুরীর পারিবারিক ছবিগুলো। ইউটিউব ভিউ তার প্রমাণ। রাজদরবার তাঁকে কোনো পুরস্কার আমন্ত্রণপত্র না দিলেও ইতিহাস জানে অঞ্জন চৌধুরীর কর্মকান্ড। বাংলার দর্শক ভালোবেসে যাবে অঞ্জন চৌধুরীকে। প্রণাম লেজেন্ড।

লেখক – শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়  –    ছবি সৌজন্যে রিনা চৌধুরী