“থিয়েটারের দলে টাকার প্রয়োজন পড়ায় হাতের সোনার ব্রেসলেট বেচে দিয়েছিলাম”- প্রিয়ম চক্রবর্তী!

জানলার বাইরে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। হাতে এক কাপ কফি আর হেডফোনে হালকা মেলোডি। পারফেক্ট মনসুন। আর ২০১৮-র মনসুনকে আরো স্পেশাল করে তুলতে আড্ডাটাইমস নিয়ে এসেছে তাদের নতুন ওয়েব সিরিজ ‘মনসুন মেলোডিস’। এরকমই এক বৃষ্টির দুপুরে আমাদের সঙ্গে আড্ডায় হাজির ‘মনসুন মেলোডিস’-এর নায়িকা প্রিয়ম চক্রবর্তী। গল্প হল কেরিয়ার থেকে নিয়ে বিয়ে পর্যন্ত। পড়ে নিন আপনাদের প্রিয় প্রিয়মের অন্তরঙ্গ এক আড্ডার মুহুর্ত।

প্রথমেই জানতে চাই, প্রিয়মের কেমন কাটছে মনসুন ২০১৮?

প্রিয়ম: মনসুন আমার খুবই প্রিয়। ২০১৮-র মনসুনটা আমার কাছে খুব স্পেশাল। কারণটা অবশ্যই ‘মনসুন মেলোডিস’। এছাড়াও আমি নতুন একটা ফ্ল্যাটে শিফ্ট করেছি। সেই ফ্ল্যাটটার দুদিকে বিশাল বড় বড় দুটো ঝিল যা বৃষ্টির জন্য এক্কেবারে পারফেক্ট। আমি ফেসবুকেও বেশ কিছু ছবি শেয়ার করেছি। বাড়িতে থাকলে ভীষণ মজা হয়। আর বাড়িতে সবসময়ই একটা খাওয়াদাওয়ার পরিবেশ। মাঝে মাঝে একটু কনট্রোল করতে হয় ঠিকই কিন্তু সব মিলিয়ে বেশ এনজয় করেই কাটে।

‘মনসুন মেলোডিস’-র ঈশিকা কেমন?

প্রিয়ম: ঈশিকা আজকালকার দিনের আর পাঁচটা মেয়ের মতই। যে পড়াশুনা করে বাইরে গেছে কাজের জন্য। বাবা-মাকে ছেড়ে থাকে। সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে তার মধ্যে। স্বাধীনভাবে চলতে ভীষণ পছন্দ করে সে। ঈশিকাকে এক কথায় ‘ফ্রি সোল’ বলা চলে। কোনো কিছুর মধ্যে আটকে থাকতে বা জড়িয়ে থাকতে পছন্দ করে না। নিজেকে প্রাধান্য দেয়। খুব ইমোশনাল কিন্তু সেটাকে কোনো কিছুর উপর ভারী হতে দেয়না। এটা ওর বৈশিষ্ট্য। তবে ঈশিকা খুব সুইট। ঈশিকা কুনালের থেকে বয়সে বড়। ফলে প্রেমে পড়ার পর ওর মধ্যে সবসময় চলতে থাকে যে এবার কি করবে। হুট করে একটা মানুষকে ছেড়ে দেওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়। এতটা নিষ্ঠুর নয়। কাজকে ঈশিকা প্রাধান্য দেয় ঠিকই। কিন্তু এই ইমোশনটাও ওর মধ্যে কাজ করতে থাকে। যে বাড়িতে ঈশিকা থাকে সেখানেই আরো একটি কাপেল থাকেন, কৌশিক সেন ও দোলা চক্রবর্তী, তাদের সঙ্গে অ্যাটাচমেন্টটা ঈশিকাকে একটা হোমলি ফিলিং দেয়। একটা অভিভাবকের সাহচর্যের অনুভূতি কাজ করতে থাকে তার মধ্যে।

আড্ডাটাইমসের সঙ্গে আগে কাজ করেছো?

প্রিয়ম: হ্যাঁ, আড্ডাটাইমসের ‘ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড’-এ আমি কাজ করেছি।

অংশুর সঙ্গে কাজ করে কেমন লাগল?

প্রিয়ম: কুনালের চরিত্রে অংশু কাজ করেছে। ওর সঙ্গে প্রথম কাজ করলাম। খুব ভালো লেগেছে। খুব সুইট অংশু। ও আমার থেকে বয়সে একটু ছোট। দিদিগিরি ফলাতাম ওর উপর। তবে সেটা কারো সামনে স্বীকার করতাম না। ওর সঙ্গে খুবই ভালো সম্পর্ক। এখনো যোগাযোগ আছে। কাজের ক্ষেত্রে বলতে গেলে আমি যতই খুঁতখুঁতে হইনা কেন আমার মনে হয় সহকর্মীদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কাজটাকে আরো ভালো হতে সাহায্য করে। আর এক্ষেত্রে অংশু বলে নয় পুরো টিমের মধ্যেই একটা ভালো বন্ডিং ছিল। সকলেই কাছাকাছি বয়সী হওয়ায় ওয়েভলেন্থটা খুব ভালো ম্যাচ করেছে। আমি এই কাজটাতে খুব বেশি ওয়ার্কশপের সুযোগ পাইনি। তবে ডিরেক্টর-এডি-অংশু প্রত্যেকের সঙ্গে এই বন্ডিংটা পর্দায় এতো ভালো একটা কেমিস্ট্রি তুলে এনেছে। এখনো আমাদের সকলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কথা হয়।

‘মনসুন মেলোডি’-র মিউজিক দর্শক বেশ পছন্দ করছে। তুমি কি বলবে এ বিষয়ে?

প্রিয়ম: হ্যাঁ, সবাই খুব পছন্দ করেছে। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অনেকে বলেছে গানটা পাঠাতে। কিন্তু পাঠানোর ব্যবস্থাতো এখনো হয়নি। তবে হ্যাঁ গানটা সবাই দেখছে এবং সবার ভালোও লাগছে।

অভিনয় নাকি মডেলিং?

প্রিয়ম: মডেলিং-এর সঙ্গে তো আমি কোনোদিনই জড়িয়ে ছিলামনা। অভিনয়ের আগে আমি ডান্স করতাম। তবে এখন মডেলিং করতে হচ্ছে অভিনয়ের সূত্রেই। অ্যাডফিল্মগুলো যেমন। তবে এগুলো করতে ভালো লাগে বেশ। একটানা মেগায় কাজের মাঝে এগুলো বেশ অক্সিজেন দেয়। এছাড়া স্টিল ফটোশ্যুটগুলো থেকে অনেককিছু শিখতেও পারছি। একটা ভিডিওতে এক্সপ্রেশন দেওয়া আর একটা ফ্রেমের মধ্যে ওই একই এক্সপ্রেশন দেওয়া। অনেক শেখার আছে। ভালো লাগছে।

মেগা নাকি ওয়েব?
প্রিয়ম: মেগা সিরিয়ালের কাজ এখন অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছি কারণ ওয়েব সিরিজগুলোতে একটু বেশি সময় দিচ্ছি। তবে কমফোর্টেবেল আমি দুটোতেই। অভিনেত্রী হিসেবে যা শিখেছি মেগা থেকেই। ওখানে শেখার স্কোপ প্রচুর। এজন্যই তো নতুন ছেলেমেয়েরা ভর্তি। একটা ডেইলি প্র্যাকটিস চলছে। ওয়েবটা এখন নতুন একটা মাধ্যম। ছবি করার একটা ফিল পাওয়া যায় ওয়েব সিরিজে। এখানে অনেক ফ্রিডম রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের চরিত্র, দৃশ্য যা মেগার দর্শক নেবে না সেগুলোও করা যায়। ওয়েবে সব ধরনের ক্রিয়েটিভ কাজ করা যায়। একটা বিশাল অভিনয়ের সুযোগ আছে। ভালো লাগে বেশ।

ইন্ডাস্ট্রিতে প্রিয়ম চক্রবর্তী হয়ে ওঠার জার্নিটা কেমন?

প্রিয়ম: শুরু থেকে বিশাল স্ট্রাগেল করতে হয়নি আমাকে। ছোটবেলায় বাড়ির সামনের থিয়েটারের গ্রুপ থেকে কজন বাবার কাছে আসেন। বাবা তাদের ভাগিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মায়ের বোধহয় কোথাও একটা ইচ্ছে ছিল। বোধহয় বুঝেছিলেন আমার ন্যাক আছে। মা বলেন শুধু নাচের জন্য নিতে কিন্তু কনটিনিউ করা যাবে না। পড়াশুনোর পাশাপাশি নাচটা তো করাই যায়। এভাবেই শুরু। মাধ্যমিকের পর বুঝলাম যে ব্যাপারটার সঙ্গে জড়িয়ে গেছি। এরপর বাবা-মা ঘুমোলে ওদের লক করে থিয়েটার করতে চলে যাওয়া, বকাঝকা চলতে থেকেছে। অ্যাকাডেমি চত্বরে পোষ্টারও লাগিয়েছি। তবে এগুলো এনজয় করতাম। একবার তো থিয়েটারের দলে টাকার প্রয়োজন পড়ায় হাতের সোনার ব্রেসলেট বেচে দিয়েছিলাম। দোকানে বলেছিলাম কুড়িয়ে পেয়েছি। চক্রবর্তী চক্রালয় বাড়ির মেয়ে বলে পাড়ও পেয়ে গেছিলাম। তবে পড়ে মা ও দলের সবাই জানতে পারলে ভীষণ ঝাড় খাই। এরপর ই-টিভির ‘লুকোচুরি’ সিরিয়ালে লিডে চান্স পেলাম। এনিয়েও বাড়িতে অশান্তি হয়। তবে আমি জানতাম কাজটা করে নেব। আসলে সাতকূলে কেউ ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে বোঝানো যেত না। এমন হয়েছে রাত সাড়ে তিনটেয় বাড়ি ফিরেছি আবার সকাল আটটায় কলটাইম। একবার তো বাবা বলেই বসলেন, গিয়ে বলে দিবি আগামী সাতদিন আমরা পুরী যাব তোরটা অন্য কাউকে দিয়ে করিয়ে নিতে। কি করে বোঝাই এতো অফিস না যে আমার রোলটা অন্য কেউ করবে। প্রথম ৫-৬ বছর মা সঙ্গে থাকতেন তারপর বোর হয়ে গিয়ে বললেন, বাড়িতে চারটে চোখ আমায় পাহারা দেয়, সেখানে সেটে কোটি কোটি চোখ আছে আমার নজরদারির জন্য। আজও মাঝে মাঝে বাবা বলে এ সব করে কাজ নেই ভালো একটা চাকরি বা ব্যবসা করতে। এখনো সেই ইনোসেন্ট ব্যাপারটা থেকে গেছে। তবে এখন স্ট্রাগেলটা বেশি। ভালো কাজ করার জন্য।

সামনে প্রজেক্ট কি আছে?

প্রিয়ম: বেশ কিছু অ্যাড আর ওয়েব সিরিজের কাজ চলছে। ছবি করার কথাও হচ্ছে। এছাড়া টালিগঞ্জের কাছে আমি একটা ছোট প্রোডাকশন হাউস ও স্টিল ফটোগ্রাফির স্টুডিও খুলছি। ১৪ই জুলাই রথের দিন ওপেনিং। ওখানে অ্যাড, ওয়েব সিরিজ এধরনের কাজই শুরু করবো।

বৃষ্টি নিয়ে কথা হবে আর প্রেম থাকবে না? তা হয় নাকি! তা প্রিয়মের কাকে পছন্দ অনস্ক্রিন কুনাল নাকি অফস্ক্রিন শুভজিৎ?

প্রিয়ম: অবশ্যই শুভজিৎ। পর্দায় যা করে বেড়াচ্ছে। আমি সারাদিন ক্ষেপাই। সবসময় বলি আসলে সবাই যতই ভাবুক তুমি খুব ভালো অভিনয় করছো, আমি তো জানি আসলে তুমি ওইরকমই। কিন্তু আসলে ও খুবই সুইট, ভালো একটা ছেলে। কিন্তু ও অদ্ভুতভাবে নেগেটিভ চরিত্রটাকে কমেডি ট্র্যাকে নিয়ে গেছে। সবারই সেটা ভালো লাগছে। নেগেটিভ চরিত্র করতে আমরা সাধারণত ভয় পাই। টাইপকাস্ট হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবণা থাকে। আমার পার্সোনালি এটাকে খুব ভয় লাগে। কিন্তু শুভ সেটাকে খুব সুন্দরভাবে ট্যাকেল করেছে। আর যে লিখছে সেও খুব ভালো কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবজীবনে ও খুব ভালো। আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে ওব খুব ভালো সম্পর্ক। মাও খুব মজা করে ওর সঙ্গে।

তো পরিবার থেকে তো সব ঠিকঠাক। তাহলে ছাদনাতলাটা কবে?

প্রিয়ম: ছাদনাতলাটা অনেক দেরি আছে। অনেক কাজ করছি। বিয়ে করতে প্রচুর সময় লাগে। এখন অত সময় নেই। ঐজন্যই এনগেজমেন্টটা করে রেখেছি। এই ছোট্ট ললিপপটা দিয়ে আপাতত বাবা-মায়ে’দের শান্ত করে রেখেছি। তবে জানিনা কতদিন এটাতে খুশি থাকবে।