১৯৩১ সালের ৩০ মে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে জন্ম নেন ক্লিন্ট ইস্টউড। জন্মের সময় তার ওজন কত ছিল জানেন? ১১ পাউন্ড ৬ আউন্স! সেজন্যই শক্তিদেবতার নামানুসারে হাসপাতালে তার ডাকনাম দেয়া হয়েছিল ‘স্যামসন’। ক্যালিফোর্নিয়ার পাইডমন্টের মধ্যবিত্ত দম্পতি ক্লিন্টন ইস্টউড এবং রুথ উড নিজেদের আদরের ছেলেকে ভর্তি করতে চেয়েছিলেন সেখানকার হাই স্কুলে। কিন্তু ছন্দবদ্ধ জীবনে মনে হয় ছোটবেলা থেকেই অরুচি ছিল তার, তাই একবার নিজের সাইকেল চালিয়ে তছনছ করে দেন সেই স্কুলের খেলার মাঠ। পরে ওকল্যান্ড হাই স্কুলে পড়লেও গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন কি না, তার ব্যাপারেও সন্দেহ আছে অনেকের। ছোটবেলায় নাকি শখের বশে ১৩টা সাপ পুষেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে অরিগন এবং টেক্সাসের বনগুলোতে অগ্নি নির্বাপণের কাজ করেন। সেসময় নাকি সিয়াটল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোরিয়ান যুদ্ধ শুরু হবার কারণে যুক্তরাষ্ট্র আর্মিতে যোগ দেন। অবশ্য সম্মুখসমরে যাওয়া হয়নি তার, সময় কেটেছে ফোর্ট অর্ডে সাঁতার প্রশিক্ষক এবং লাইফগার্ড হিসেবে।সেখান থেকে ফিরে আসার সময়ে, পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে একবার প্লেন ক্র্যাশে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন ইস্টউড। গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় ক্যালিফোর্নিয়ার পয়েন্ট রেয়েসের কাছাকাছি সাগরে আছড়ে পড়ে বিমানটি। এ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে পরে ইস্টউড বলেছিলেন, “সময়টা ছিল অক্টোবর-নভেম্বর, সাগরের জল ছিল খুবই ঠাণ্ডা। অনেক বছর পরে জানতে পেরেছিলাম যে, সেই সাগর ছিল হাঙরদের প্রজনন ভূমি। ভাগ্য ভালো যে, সেসময় একথা জানতাম না। জানলে ভয়ে সেখানেই মরে যেতাম!” ইস্টউড আর সেই বিমানচালক প্রায় তিন মাইল সাঁতরে তীরে উঠেছিলেন।
পঞ্চাশের দশকে কিছু সাধারণ মুভি আর টিভি সিরিজ বাদে বলার মতো তেমন কোনো সাফল্য ছিল না তার। সেসময় নিজের খরচ চালানোর জন্য হলিউডের আলিশান বাড়িগুলোয় সুইমিং পুল খননের কাজ করতেন তিনি।আরভিং গ্লাসবার্গ নামে ইউনিভার্সাল স্টুডিওর এক সিনেমাটোগ্রাফার ছিলেন তার বন্ধু। তার সাথে দেখা করতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে ক্যামেরার সামনে স্ক্রিন টেস্ট দেন ইস্টউড।তার পরিচালিত মুভিতে অভিনয় করে মোট এগারোজন অভিনেতা অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তারা হলেন জেন হ্যাকম্যান, মেরিল স্ট্রিপ, শন পেন, টিম রবিন্স, মার্সিয়া গে হারডেন, হিলারি সোয়্যাংক, মরগান ফ্রিম্যান, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, ম্যাট ডেমন, ব্র্যাডলি কুপার এবং তিনি নিজে। এদের মাঝে অস্কার জিতে নেন পাঁচজন- ‘আনফরগিভেন’ এর জন্য জেন হ্যাকম্যান, ‘মিস্টিক রিভার’ এর জন্য শন পেন এবং টিম রবিন্স, ‘মিলিয়ন ডলার বেবি’র জন্য মরগান ফ্রিম্যান এবং হিলারি সোয়্যাঙ্ক।
হাই স্কুল পাশ করা নিয়ে সন্দেহ থাকলে কী হবে, একটা সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি কিন্তু ঠিকই আছে তার। ২০০০ সালে ওয়েসলেইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এটি পান ক্লিন্ট। ২০০১ সালে গরিলাজ নামের একটি ব্যান্ড তাকে নিয়ে একটি গান লিখে ফেলে। অবধারিতভাবেই গানটির নাম ছিল ‘ক্লিন্ট ইস্টউড’। ফ্রান্সের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও ২০০৭ সালে সেখানকার সর্বোচ্চ সম্মাননা লিজিয়ন অফ অনার পান ক্লিন্ট ইস্টউড। তার কাজ সবসময়েই সেখানে বেশ ভালো সাড়া ফেলত, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লপ হওয়া মুভিগুলোও।জীবনের শুরুর দিকে নিজের কাজের তেমন কোনো থই পাচ্ছিলেন না তিনি। নিজের স্বকীয়তাকে বজায় রেখেই কিন্তু সেরা বহুমুখী প্রতিভাদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। যে কাঠখোট্টা অভিনয়ের জন্য সমালোচিত হয়েছিলেন, তাকেই এখন অনেকে অনুকরণ করছে। বিনোদন দিয়ে যেমন দর্শকের মন জয় করেছেন, তেমনি শিল্পের সমঝদার হয়ে সমালোচকদের প্রশংসাও অর্জন করেছেন। এভাবেই আমাদের এই ‘ম্যান উইথ নো নেম’ দশকের পর দশকজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন হলিউডে (www.clinteastwood.net)।
লেখা শোভন নস্কর


