এক মা ও মেয়ের লড়াইয়ের গল্প !

হেলেন এর জ ন্মদিন

ভ্যাম্প সেই নারী, যে পুরুষের চোখে যৌন পুতুল। যে যৌবনসরসী যৌনতা দিয়ে পুরুষকে বশ করে কার্যোদ্ধার করে। বিশ্বামিত্রের ধ্যানভঙ্গকারিনী মেনকা। বাংলা হিন্দি সিনেমায় ভ্যাম্প বলতেই ‘নষ্ট মেয়ে’। সোজা বাংলায় বাজারে মেয়েছেলে। হয় হাতে মদের গেলাস, নয় ঠোঁটে সিগারেট। লিপস্টিকে পুরু ঠোঁট,নগ্ন পা। হয় শরীর বেচে খায়, নয় নাচ-গান। সতী-লক্ষ্মী নায়িকার প্রোটোটাইপের বিপরীত, হয় এরা অলক্ষ্মী, নয়তো মোহিনী। কিন্তু একটা সময় এমন ছিল ষাট সত্তর আশির দশকে এই ভ্যাম্পরাই রাজত্ব করত রূপোলী পর্দায়।

হেলেনতাঁদের পারিশ্রমিক নায়ক নায়িকার সমতুল্যও হত। সেসময় বিগাজেট কর্মাশিয়াল ছবির গল্পরেখা ছিল , স্মাগলিং — সোনা হিরে গাঁজা চরস, যা হোক, পাঁচটা গানের সিচুয়েশন চাই, তার মধ্যে একটি ভক্তিমূলক, দুটো নাচ চাই; খান দু-তিন ফাইটিং সিন চাই, অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য চাই, নায়কের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে নায়িকা এবং ভিলেনের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে ভ্যাম্প বা খলনায়িকা চাই। একটা গান নাচ অবশ্যই ক্যাবারে। ক্যাবারে গান নাচের শিখরে যদি কেউ দেবী হয়ে থাকেন তিনি হেলেন

হেলেনসমস্ত নষ্ট মেয়ের অপবাদ থেকে নৃত্যশৈলীকে ডিভা ফরম্যাটে নিয়ে গেছিলেন তিনি। যার নাচ দেখতে ছবি হিট হত। হল হাউসফুল হত। যার ফিগার ড্যান্স ছিল নায়িকাদের ঈর্ষনীয়। আজ হেলেন জেইরাগ রিচার্ডসনের আশিতম জন্মদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে টালমাটাল তখন গোটা বিশ্ব। রেঙ্গুনের বাতাসে তখন কেবলই বারুদের গন্ধ। সোনালী প্যাগোডাগুলোতে নেই পুণ্যার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ইরাবতী নদীর মতোই কখনো রুদ্ররাগে উত্তাল, আবার কখনো সন্ত্রস্ত বার্মা। এমন পরিস্থিতিতে এক অন্তঃসত্ত্বা মা তার ছোট্ট সন্তানদের নিয়ে ছুটে চলেছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। প্রায় একমাসের প্রাণান্ত ছুটে চলা শেষে তারা ভারতের আসামে পৌঁছালো। আসাম থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে বোম্বে।

এক মা ও মেয়ের লড়াইয়ের গল্প। বোম্বের মাটিতে সেদিন পা রেখেছিল ছোট্ট মেয়েটি।

হেলেনচলচ্চিত্রে মেয়েটির আবির্ভাব ১৯৫১ সালে “আওয়ারা” ছবিতে কোরাস ড্যান্সার হিসেবে। কোরাস ডান্সার থেকে সে প্রথম দর্শকের চোখে পড়ল যে গানে সে গান ও হেলেনের নাচ আজও আইকনিক। জহুরির চোখ চিনে নিল কোরাস থেকে, কাঁচ বেছে হীরে। এই জহুরি প্রখ্যাত পরিচালক শক্তি সামন্ত। তাঁর পরিচালনায় ১৯৫৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “হাওড়া ব্রিজ” ছবিতে গীতা দত্তের গাওয়া “মেরা নাম চিন চিন চু” অমরত্ব পায় সেই মেয়েটির অভূতপূর্ব নৃত্যের ঝংকারে।

হেলেনসে মেয়েটিই বলিউডের স্বপ্নীল দুনিয়ায় হয়ে উঠলেন বলিউডের সেরা ক্যাবারে ডান্সার হেলেন। এখন যাকে বলে আইটেম গার্ল। হেলেন যদিও অভ্যস্ত নন এই আইটেম গার্ল শব্দচয়নে। তিনি বলেছেন তখনকার ক্যাবারে ডান্সাররা আজকালকার মতো এত খোলামেলা পোশাক পরতনা। স্কিন বেসড কালারে কাপড়ে ঢাকা থাকত শরীর যেগুলো দর্শকরা ভাবত নগ্ন বাহু নাভি উরু পেট। ঢাকার মধ্যে না ঢাকার খেলা জানতেন তারা। আর আজকাল সবই খোলা।

হেলেনআজকাল শিল্প শিক্ষা নেই বড় অশ্লীল। ক্যাবারে ডান্সার হেলেনকে বলা হলেও তিনি শিখেছেন মণিপুরী এবং গুরু পি.এল.রাজের কাছে তালিম নিয়েছেন ভরতনাট্যমের। প্রাচ্য পাশ্চাত্য দুই নাচেই নৃত্যপটীয়সী হেলেন। শুধু নাচ নয়, হেলেনের পোশাকে কোরিওগ্রাফি ও সেটেও থাকত অভিনব বৈচিত্র্য। মার্চেন্ট আইভরির ‘বম্বে টকিজ’ এ তাঁকে দেখা যায় বিশাল টাইপরাইটারের উপর নাচতে। এছাড়াও পাখির পালক,গোল্ড আইল্যাস,রঙীন উইগ সবেতে অভিনবত্ব রাখত হেলেনের নাচ। হেলেন পথ দেখালেন বিন্দু, অরুনা ইরানী, জয়শ্রী টি, মিস শেফালি, মিস জে দের এই পথে। হেলেন কে ক্যাবারে ডান্সার হিসেবেই বলা যায় চলচ্চিত্র জগতের প্রতিনায়িকা নয়, চলচ্চিত্রের নৃত্যশলীর মহানায়িকা। শুধু ক্যাবারে নয় অভিনয়ও ছিল দারুন। হেলেনের অভিনয়ের ছাপ রাখেন ‘ইমন ধরম’ ছবিতে। বাংলা ছবিতেও হেলেন কে ব্যবহার করা হয় চড়া জনপ্রিয়তায়। সত্তরের সাদা-কালো ‘রাজকুমারী’ই হোক বা আশির রঙীন ‘ত্রয়ী’— হেলেন একই রকম বর্ণময় ও লাস্যময়ী। কেবল ‘ছেড়ে দাও, ওগো পথ ছাড়ো’ এক দশকে বদলে হয়ে যাচ্ছে ‘একটু বোসো, চলে যেও না’। উত্তম কুমার থেকে মিঠুন দুই যুগেই হেলেন মাস্ট। ‘রাজকুমারী’ ছবিতে উত্তম কুমার তনুজা র চেয়েও হেলেন র ছবি পোষ্টারে বিশাল বড় করে দেওয়া হয় প্রচারে। এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল বলিউড থেকে টলিউড হেলেনের।

হেলেন ও আশা ভোঁসলে

আর হেলেন ও আশা ভোঁসলে। এই জুটি যেমন স্বামী স্ত্রী …দম্পতি। ওঁরা মজা করে দুজন দুজনকে তাই বলেন। যেন ভারতের ক্যাবারে ইতিহাসে দুই লেজেন্ড সংসার করেছেন। আজ আশিতে আশিটি গোলাপে অকুন্ঠ শুভেচ্ছা কুহকিনী হেলেন কে। ভালো থাকুন জীবন্ত ক্যাবারে ইতিহাস।

হেলেন