আশির দশকে শহর ছেয়ে যায় এক বিতর্কিত পোষ্টারে ! গল্প টা জানা আছে ?

অনামিকা সাহা অশ্লীলতার দায়ে

কত টাকা চাই পাঁচ হাজার দশ হাজার বিশ হাজার…
সাপের লেজে তুমি পা দিয়েছো ঘুরে আমি ছোবল মারবই।”

“আমি ছানা গুন্ডার মেয়ে,আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিতে আসিস না।”

অনামিকা সাহাযে ভয়ঙ্করী এলোকেশী দাঁ কাটারি তরোয়াল হস্তে রনচন্ডীর লিপে এসব ডায়লগ মারকাটারি বাম্পার হিট তিনি আবার মায়ের চরিত্রেও “মায়ের আঁচল” র আদর স্নেহশীলা হয়ে বুলিয়ে দেন দর্শকের মনে। আসল নাম উষা। স্কটিশ চার্জ কলেজে পড়াকালীন বিখ্যাত অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীর (ঐ কলেজের ইংরাজীর প্রফেসর ছিলেন) পরিচালনায় কলেজে শ্যামা নৃত্যনাট্যতে সিলেক্ট হন অনামিকা। সেই স্টেজ শোতেই কলামন্দিরে এক সিনেমার ভদ্রলোক সহারী পরিচালক তাকে ছবিতে নেবেন বলে সিলেক্ট করেন তাঁর নাচ অভিনয় দেখে। উষার গায়ের রং চাপা ছোটো থেকেই আত্মীয় স্বজনের মুখে শুনে আসত। তাঁর কোনদিন বিয়ে হবেনা ঐ গায়ের রং এ লোকে বলত। তাই উষার ধারনাই ছিল ফিল্মে চান্স পাবার অগ্রাধিকার ফর্সাদের শ্যামাদের নয়।

অনামিকা সাহাপ্রথম ব্রেক পান “আশার আলো” ছবিতে। প্রথম যখন টলিপাড়ার স্টুডিওতে আসেন ঐ সহকারী পরিচালক বলেছিলেন এই অচেনা জায়গায় তোমার নাম ঠিকানা লোককে বলে বসনা। শ্যুট ব্রেকে একটু স্টুডিওতে এদিক ওদিক ঘুরছিলেন উষা, তাকে দেখে এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করল”তোমার নাম কি?”। নাম বলা বারণ কি বলেন চুপ করে রয়েছে উষা,তখন সেই ভদ্রলোক বললেন” একি চুপ করে আছো কেন? এত বড় মেয়ে নাম বলতে পারছো না? তোমার নাম নেই? তুমি কি অনামিকা?” উষা বলে “হ্যাঁ অনামিকা সাহা”। ব্যস ইতিহাস সৃষ্টি হয়ে গেল। উষা সাহা হয়ে গেল অনামিকা সাহা। উত্তম কুমারের সঙ্গে করেছেন “বাঘ বন্দী খেলা”,”দুই পুরুষ”।

অনামিকা সাহা বিষে বিষে বিষক্ষয়“প্রতিশোধ” ছবিতে “বিষে বিষে বিষক্ষয়” গানে সৌমিত্র-র সঙ্গে নেচে কি বিপুল সমাদৃত হন। সৌমিত্র আজও তার গলার স্বরের ফ্যান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার নির্দেশিত নাটকে অনামিকার কন্ঠ ব্যবহার করেছেন। তরুন মজুমদারের “সংসার সীমান্তে” ছবি দিয়ে কিছুটা লোক পরিচিতি হয় অনামিকার। তারপর তরুণ মজুমদার তাঁর পরের ছবি ‘খেলার পুতুল’-এও সেই খলনায়িকার চরিত্র দিলেন। বাংলা ছবির ভ্যাম্প হয়ে গেল অনামিকা।

অনামিকা সাহা অশ্লীলতার দায়েআশির দশকে কলকাতা শহর ছেয়ে যায় একটা বিতর্কিত পোষ্টারে। পোষ্টারে এক নারীর দুটো নগ্ন পা দেওয়া ছবি দেওয়া হয়েছিল। সে ছিল অনামিকা সাহা। ছবির নাম “অশ্লীলতার দায়ে”। খুব নামকরা বিতর্কিত ছবি।

অনামিকা সাহাএইসব বিতর্কিত সাহসী রোল করে অনামিকা খুব নাম করেন। কিন্তু তখন তাঁর বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। শ্বশুর মশাই বলেন “বউমা ওসব রোল আর করনা”। বিয়ে হয় অভিনেতা বোধিসত্ব মজুমদারের সঙ্গে। কিন্তু অভিনয়ের খিদে তো ছিলই। তাই শ্বশুরকে বলেন “আমি কি রেডিও নাটক করতে পারি সেখানে তো মুখ দেখাতে হচ্ছেনা পর্দায়”। শ্বশুর মশাই মত দেন। আকাশবানীতে কাজ করে অনামিকা বিপুল সাফল্য পান। সংসার অনেকদিন করার পর পরিস্থিতি বদলালে শ্বশুরমশাই বলেন ‘দেখো এমন কোনো চরিত্রে অভিনয় করো না, যেটা আমাদের সবাই মিলে একসাথে বসে দেখতে খারাপ লাগে।”

অনামিকা সাহাসেই সময় আরও একটা কাজ করতেন অনামিকা। বোম্বে থেকে তখন যত নায়িকা এখানে আসতেন কাজ করতে, তাঁদের ভয়েস ডাবিং করতেন অনামিকা। জুহি চাওলা, ফারহা, নীলম সবার ডাবিং অনামিকার গলা। এছাড়াও মহুয়া রায়চৌধুরীর অকাল প্রয়াণে তাঁর অসম্পূর্ন ছবিগুলোর ডাবিং করেন অনামিকা সাহা। “অনুরাগের ছোঁয়া”,”আর্শীবাদ” প্রভৃতি। এই সময়ই সুযোগ আসে ছবিতে আবার অভিনয়ের। অনামিকা বহুবছর পর আবার ছবিতে ফেরেন। ভারত-বাংলাদেশ ব্যাপী সুপারহিট ছবি “বেদের মেয়ে জ্যোসনা”র অডিশন হচ্ছিল। অনামিকা সংসার সামলে স্নাত এলোচুলে একটা সিঁদূরের বড় টিপ পরে চলে গেছিলেন অডিশন দিতে। হবনা জেনেই। কিন্তু অনামিকায় সিলেক্ট হন। তবে মায়ের রোলে বেশ রোগা ছিলেন তখন তাই নিজের বুদ্ধিতেই ফ্যানা ভাত খেয়ে খেয়ে মোটা হন। মায়ের রোল করতে। যাতে অনেকদিন অভিনয় জীবন চালাতে পারেন তাই আরও মায়ের রোল বেছে নেন তিনি। কখনও জাঁদরেল কখনও স্নেহময়ী। কলকাতা দূরদর্শনে এক বৌমার রোল করেন একটি কুকুরছানা নিয়ে গল্প। রমেন রায়চৌধুরীও ছিলেন।

অনামিকা সাহাপর্দায় দজ্জাল ভিলেন হলেও বাস্তবে মানুষটা স্নেহময়ী । প্রসেনজিৎ ঋতুপর্ণা সবাইকে বিয়ের আগে নিজে হাতে রান্না করে আইবুড়ো ভাত খাইয়েছিলেন। ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ র দজ্জাল শাশুড়ি যেটা বলিউডে “জামাই রাজা” তে হেমা মালিণীও ফোটাতে পারেননি। সেই লোহার শিক গরম করে অনুরাধা রায়ের গায়ে চোর লিখে দেন অনামিকা।
অনামিকা সাহা ঘাতক“ঘাতক” র বিন্দু মাসী আজও যেখানেই যান বিন্দু মাসী বলে ডাকে সবাই ওনাকে। অনামিকা পর্দায় যতটা দাপুটে বাস্তবে ততটাই কোমল।

অনামিকা সাহা বেঁচে থাকার গানঅনামিকার সেই কোমলতা নিয়ে সুদেষ্ণা রায় অভিজিৎ গুহ বানালেন “বেঁচে থাকার গান”। যারা দেখেননি বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে দেখুন অসাধারন ছবিটি।রাজেশ খান্নার নায়িকা হবার স্বপ্ন দেখা অনামিকা সেখানে কি কোমল কি আদুরে।ছোটপর্দায় সুযোগ কম পেলেও যেটুকু অভিনয় করেন দাপট দেখিয়ে যান। “গুঁটি মল্লার” এ দজ্জাল জ্যাঠু বিপ্লব চ্যাটার্জ্জীর স্ত্রী-র রোল দজ্জাল জ্যাঠিমার চরিত্র করে এখনও সবার প্রিয় অনামিকা।
অনামিকা সাহা গুঁটি মল্লারআকাশবানী ছায়াছবি যাত্রা নাটক সিরিয়াল এই বিশাল রেঞ্জে অভিনয় করা দাপুটে অভিনেত্রী অনামিকা। আরো নতুন চরিত্রে যেন আপনার অভিনয়ে সমৃদ্ধ হতে পারি আমরা।