শ্যেনদৃষ্টি, চৌকশ অভিনয়, যে কোন চরিত্রকে নিজের মত করে প্রাণ দিয়ে সাজিয়ে বহু বাঙালীর কাছে ভীষণ প্রিয় একজন অভিনেতা হলেন অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি। সাধারণত আমরা সিনেমাতে, ছোটপর্দায় এনাকে নানান শেডের চরিত্রে দেখে অভস্ত্য কিন্তু এবার সময় এসেছে আপনাদের এই অভিনেতার আরও এক রূপ দেখার, পরিচালনাতে হাত দিয়েছেন অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি, অবশ্য এটা পুরনো খবর কারণ ওনার পরিচালনা করা ফিচার ফিল্ম “স্মাগ” ইতিমধ্যেই কলকাতা ইন্টারন্যাশেনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সিলেক্ট হয়ে গেছে অফিসিয়াল স্ক্রিনিং’র জন্য আগামী ১৬ই নভেম্বর, বিকেল ৫.১৫তে রবীন্দ্র সদন।

এবার বক্তব্য হচ্ছে পরিচালক হিসেবে উনি নতুন কি কিছু করছেন? নাকি সেই নিয়ম মাফিক চেনা ছকে ফেলে দিচ্ছেন নিজের গল্পকে? এই প্রসঙ্গে ওনাকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, দর্শকদের স্পুনফিড করে গল্প বলাতে বিশ্বাসী নন তিনি কারণ তাঁর পরের সিনেমা “ওয়াচমেকার”র কনসেপ্ট আবারও অ্যান্টিলজিক, সম্পূর্ণ অ্যাবস্ট্রাক্ট বিষয়বস্তু এবং ভীষণভাবে সেটা সাইকোলজিক্যাল মানে আপনার মাথা লাগিয়ে উপভোগ করতে হবে সিনেমার সারতত্ত্ব। সত্যি! চেনা ছকের বাইরে গিয়ে বাংলা সিনেমার এই মুহূর্তে দামাল ছেলে অনিন্দ্যই এবং ওঁর কাজ যে আগামীদিনে বেশ কিছু পরিচালককে চ্যালেঞ্জ দেবে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

“ওয়াচমেকার”র গল্পটা আসলে সময়ের তিনটে তত্ত্ব নিয়ে খেলা করেছেন পরিচালক। তিনটি তত্ত্ব এরকম, সময় এগিয়ে যাচ্ছে, সময় থমকে আছে আর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে, কি গুলিয়ে যাচ্ছে তো? আবার সিনেমাতে কোন লেয়ার নেই। গোটা সিনেমার ট্রিটমেন্ট করেছেন জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট মুভমেন্টের আদলে আর তাই সেট ডিজাইনে নিজের চিন্তাভাবনার সাথে নিয়ে আসছেন আর্ট ডিজাইনার হিরন মিত্রের কাজ। গল্পটা পুরোটাই মাঝরাতের সেখানে একজন স্ট্রেঞ্জার মেয়ে (ঋতাভরী চক্রবর্তী) দিল্লী থেকে ফ্লাইটে আসে কলকাতায় যার জীবনে সময় ফিক্সড মানে দিল্লীতে রাত ১২.৩০এ ফ্লাইটে চেপে কলকাতায় এসে দেখে তখনও সময় ১২.৩০টা!

আর দুটো কনসেপ্টের চরিত্র হিসেবে আছেন ওয়াচমেকার (অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি) এবং অন্যজন স্কাল্পচার (জয়ি দেবরায়) যার জীবনে সময়ের কোন অস্তিত্ব নেই। এই তিনজনের মধ্যে একটা লড়াই আছে যে সময়ের কোন তত্ত্বটা ঠিক? এই তাত্ত্বিক লড়াই কিন্তু সিনেমার প্রধান আকর্ষণ হতে চলেছে কারণ এই লড়াইতে মারা যাবেন দুজন, বেঁচে থাকবেন শুধু একজন। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন ঋতব্রত ভট্টাচার্য, ঐশিকা ব্যানার্জি ও রাজদীপ সরকার। সিনেমাটির প্রযোজনা করছে নবাগত সংস্থা “সরকার-ই-মোশন”, যাঁদের প্রথম সিনেমা “অন্তরসত্ত্বা”র শুটিং শেষ, চলছে পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ।

আসলে সময়ের সাথে আমাদের সিভিলাইজেশন যে পেছনের দিকেই এগোচ্ছে সেই দর্শনকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক অনিন্দ্য! সেই অদ্ভুত চিন্তাভাবনা এবং সাথে বাংলা সিনেমাতে আবার “মেটাফোর” বা “রুপক” ব্যবহার করে প্রতিটি সিনের বক্তব্যকে তুলে ধরার যে প্রথা সেটাকে আবার কবর থেকে একরকম তুলে নিয়ে আসছেন অনিন্দ্য। ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের পর পরিচালক বুদ্ধদেব দাসগুপ্তের কাজে এই “রুপক”র যথার্থ ব্যবহার দেখা গেলেও হালফিলে আর কেউ নেই! বুঝতেই পারছেন বাংলা সিনেমাকে একটু অন্যভাবে দেখতে এবং দেখাতে কোমর বেঁধে নেমেছেন পরিচালক অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি, বাংলা সিনেমার ‘দামাল’ ছেলে বোধহয় একেই বলে..!