ডুবন্ত কণিকা মজুমদারকে চুলের মুঠি ধরে প্রাণে বাঁচালেন অনিল !

অনিল

মেঘে ঢাকা তারা‘র শংকর যখন বোন নীতার প্রেম পত্র আবিষ্কার করে বালখিল্য দুষ্টুমি হাসিতে ‘দেখি, দেখি, দেখি তুই কার প্রেম পত্র পড়ছিস?’ বলে চিঠি কেড়ে নেয় এবং নীতা যখন ‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই’ বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে তখন দাদাই তার শুধু ভরসা বা ‘মহানগরে’ সুব্রত যখন বোনের বিনুনী টেনে ধরে, এবং বউমার চাকরিতে নামার জন্যে মায়ের কান্নাকে কৌতুক করে বলে ‘শুধু রাগ কেন? রাগিনীও আছেন। কিংবা ‘আহ্বান’ ছবিতে হেমাঙ্গিনী দেবী, গ্রামের এক দরিদ্র বৃদ্ধার জন্যে তাঁর মায়া, মমতা। আমার সব সময়ে মনে হয়েছে, মানুষটা এই রকমই ছিলেন, সরল, ঋজু, দরদী এবং হাই প্রিন্সিপালড। ‘সব্যসাচী’,আর্শীবাদ কিছু ছবিতে ভিলেন হিসেবে তুখোড় অভিনয় করলেও তাকে খুব সম্ভবত দর্শক মেনে নেয়নি ভিলেনে। ঐ সরলসুন্দর, আদ্যপান্ত শিক্ষিত, ভদ্রলোকের চরিত্রেই তাকে মানাত। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব লেজেন্ড অনিল চট্টোপাধ্যায়

অনিল চট্টোপাধ্যায় ,একজন প্রানবন্ত দিলখোলা আড্ডাবাজ রগুড়ে মানুষ। তাঁর সমসাময়িক নায়কদের চেয়ে অনেক লো প্রোফাইল মেনটেন করতেন।নিজে পরিবার নিয়ে থাকতেন গল্ফক্লাব রোডের ভাড়া বাড়িতে। কোনদিনই স্টার সুলভ আচরন ছিলনা পাড়ার বড় দাদা ছিলেন নীতার দাদার মতোই পাড়ায় কেউ অসুস্থ হলে তিনি আগে ছুটে যেতেন। পাড়ায় আড্ডা,বাড়িতে শিল্পীদের সঙ্গে আড্ডার আসর,রোব্বারে রেষ্টুরেন্টে কি বাড়িতে মাংস ভাত খাওয়া এই ছিল তাঁর সরল সাধাসিধে নিখাদ বাঙালী জীবন।কিন্তু কি বড়মাপের অভিনেতা। উত্তমকুমারে জমানায় তিনি সহঅভিনেতা বেশী করলেও তিনি ছিলেন প্রায় নায়ক। কারন উত্তমের প্রথম দিকে সহঅভিনেতা ছিলেন অসিত বরণ আর পরে শুভেন্দু কি রঞ্জিত মল্লিক। যাদের তুলনায় অনিল ছিলেন অনেক সুক্ষ অভিনয়জাত অভিনেতা। উঁচুদরের অভিনেতা। ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন‘ ছবিতে চিত্তরঞ্জন দাশের নামভূমিকায় অভিনয় করে খুব নাম করেন।তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে চিত্তরঞ্জন ঘরণী বাসন্তী দেবী প্রশংসা করে বলেন ‘নিজের স্বামীকে প্রয়াণের পর আবার ফিরে পেলাম। তোমার অভিনয়ে মুগ্ধ।’

এ হেন অনিল চট্টোপাধ্যায় র আরেকটি পরোপকারের গল্প। যে ঋণ শেষ জীবনেও ভোলেননি সদ্য প্রয়াতা অভিনেত্রী কণিকা মজুমদার। ‘কুমারী মন’ ছায়াছবির শ্যুটিং চলছে। এই ছবির চিত্রনাট্য লেখেন স্বয়ং ঋত্বিক ঘটক। অভিনয়ে অনিল চ্যাটার্জ্জী ও কণিকা মজুমদার। এছাড়াও ছিলেন সন্ধ্যা রায়,দিলীপ মুখোপাধ্যায়,জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। কুমারী মন’ ছবির কাজ করতে গিয়ে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন কণিকা মজুমদার ৷

মাতলা নদীতে শ্যুটিং চলছিল বেশ ক’দিন ধরে ‘কুমারী মন’ ছবির ৷ রোজ ইউনিটের সবাই মিলে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া হচ্ছে মুড়ি আর জেলেদের ধরে আনা মাছ দিয়ে৷ একদিন শ্যুটিং-এ, ডিঙি নৌকোয় বসে আছেন কণিকা, অনিল এবং জ্ঞানেশ ৷ কণিকা ছাড়া বাকি দু’জনেই সাঁতার জানেন ৷ যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। হঠাত্‍‌ পাশে একটা বড় লঞ্চ চলে এল৷ তার ঢেউয়ের ঝাপ্টায় কণিকা অনিলদের ডিঙি গেল উল্টে৷ পড়ে গেলেন কণিকা। ডুবে যাচ্ছেন জলে৷ তলিয়ে যাচ্ছেন। কণিকার শুধু মনে হচ্ছিল একমাত্র মেয়েটার কথা। আর দেখা হলনা৷ এখানেই শেষ। হঠাত্‍‌ শুনলেন কণিকা, তাঁর নাম ধরে কেউ ডাকছে৷ অনিলদার গলা ৷ তার পরেই চুলের মুঠিতে প্রবল টান৷ সেই ভাবেই কুণকে কে পাড়ে এনে ফেললেন অনিলদা ৷ কণিকার পুনর্জন্ম হল ৷

যে জীবন-ঋন শোধ করার নয়। আজীবন মনে রাখেন কণিকা মজুমদার। এতোটাই পরোপকারী ছিলেন অনিল চট্টোপাধ্যায়। একজন সত্যিকারের কমরেড।

লেখক শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘কুমারী মন’ ছায়াছবির ছবি সৌজন্যে – সুদীপ্ত কুমার ভাদুড়ী।
অনিল চ্যাটার্জ্জীর পারিবারিক ছবি সৌজন্যে- অনিল নাতনী দেবারতি চ্যাটার্জ্জী।