আশির দশকের এক অন্য গল্প !

অপর্ণা সেন

জকের অপর্ণা সেন মানেই ‘থার্টিসিক্স চৌরঙ্গী লেন‘,’পরমা’,’সোনাটা’,’পারমিতার একদিন‘। নায়িকা অপর্ণা কে ভাবলে ফিল্মবোদ্ধারা ভাবেন ‘সমাপ্তি’,’বাক্স বদল’,’মহাপৃথিবী‘ নিদেনপক্ষে উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘জয় জয়ন্তী‘।

কিন্তু আশির দশকে গল্পটা অন্য ছিল। আজ অপর্ণা সেনের শুভ জন্মদিনে যে গল্প বলব তা অনেকেরই অজানা।

আশির দশক। মহানায়কের মহাপ্রয়াণে জর্জরিত টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়া। সে সময় টলিউডের হাল ধরেননি কোনো স্বর্ণযুগের তথাকথিত নামকরা পরিচালক। নতুন কমার্শিয়াল ছবি, দাপুটে চিত্রনাট্য, মাল্টিস্টারার ছবি নিয়ে এলেন তখনকার নতুন পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী,বীরেশ চ্যাটার্জ্জী,সুজিত গুহ,প্রভাত রায়রা

অপর্ণা সেনবীরেশের তুরুপের তাস অপর্ণা সেন। এখানে কিন্তু অপর্ণা নামে ছবি হিট সেটাই কারন নয়। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে যখন সুচিত্রা সুপ্রিয়া সাবিত্রী মাধবী যুগ বিগতযৌবনে তখন উঠতি নায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরী রানি হয়ে উঠছেন টলিপাড়ার। মহুয়ার ছিল প্রতিমা মুখ তেমনি অভিনয় ক্ষমতা যেটা বানিজ্যিক ছবি মাত করতে উপযোগী। মাধবী মুখার্জ্জী বলেছেন “মহুয়ার – সাবুর মতো অভিনয়ের দাপট ছিল”। সেসময় সন্ধ্যা রায়, মহুয়া সব বাঙালী সাবেকি গল্পে নায়িকা, বিশেষত তরুন মজুমদারের ছবি থেকেই যা শুরু। অপর্ণা সেনের হিট মেশিন প্রভাব একটু ঢলে গেছিল। আশির দশকের মধ্যভাগ, নতুনদের ছবি ‘দাদার কীর্তি‘ এলে মহুয়ার আরও সাম্রাজ্য শুরু হয়।

অপর্ণা সেনঠিক এই আশির দশকের মধ্যভাগে অসিত সেন, উত্তম কুমার, হৃষিকেশ মুখার্জ্জীর সহকারী পরিচালক ছাত্র বীরু ওরফে বীরেশ চ্যাটার্জ্জী মুম্বাই থেকে আসেন কলকাতায় বাংলা ছবি করতে। ১৯৮৪ সালে শুরুতেই বাজিমাত। ত্রিকোন প্রেমের গল্প ‘মোহনার দিকে‘। অপর্ণা সেন – দীপঙ্কর দে – সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। সুপার ডুপার হিট গান। সুচেতা এক ব্যর্থ প্রেমিকার গল্প। এই ছবি দিয়ে অপর্ণা সেনের ঢলতি সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার হয়। অপর্ণা তখন মধ্য বয়সে তবু যেন বীরেশের ছবি গুলোতেই অপর্ণা সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ডিভা অপর্ণার ফিল্ম ক্যারিয়ারে। পুজো প্যান্ডেলে অপর্ণা সেনের লিপে গান ‘গৌর নিতাই নদীয়াতে ‘ বিশাল হিট। ‘মোহনার দিকে‘ – আশাজী, কিশোরজীর প্রতিটি গান হিট। অপর্ণা সেন হয়ে ওঠেন আবার হিট মেশিন নায়িকা।

বীরেশ বাবুর কথায়, অপর্ণা সেন তাঁকে বলে দেন “বীরু বাবু যে ছবি নতুন করবেন আমায় আগে দেখাবেন নায়িকার রোল … আমি করতে চাই আপনার ছবিতে নায়িকার চরিত্র”।

অপর্ণা সেনসেইমতোই ১৯৮৭ এ বীরেশ করেন ‘একান্ত আপন‘। যার মুখ্য চরিত্রে সুদীপার রোলে অপর্ণা সেন। যদিও অনেক ইন্টেলেকচুয়াল কথা শোনায়, রিভিউ লেখেন ” ‘থার্টিসিক্স চৌরঙ্গী লেন‘ র পরিচালিকা হোলিতে রঙ মেখে উঠোন জুড়ে ভিজে কাপড়ে নাচছেন’। কিন্তু আজও হোলির আইকনিক গান ‘খেলব হোলি রং দেবনা‘।

এরমধ্যে অবশ্যি ১৯৮৬ এ মহুয়ার শেষ ছবি বীরেশের সঙ্গে ‘আর্শীবাদ‘। অপর্ণা সেনের কথামতো বীরেশ তাঁর পরের ছবি ‘সুরের আকাশে‘ তে নায়িকা করতে চিত্রনাট্য শোনাতে গেলেন অপর্ণা সেনকে। চিত্রনাট্য শুনে পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু অপর্ণা সেনের চেয়ে কম বয়সি নায়িকার রোলে চরিত্রটা ছিল বলে তিনি সেটা করেননি। ‘সুরের আকাশে‘ ১৯৮৮ এ মুক্তি পায় তাপস পাল – দেবশ্রী রায় জুটিকে নিয়ে। হাউসফুল হিট। যদিও এরপর ১৯৮৯ এ বীরেশের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ এ লক্ষ্মীদির চরিত্রে লেজেন্ডারি অভিনয় করেন অপর্ণা সেন

অপর্ণা সেনঅপর্ণা সেন সৃষ্টিশীল মানুষ উনি বলেন হাফিয়ে উঠেছিলেন এসব নায়িকার রোল করতে করতে কিন্তু এই আশির দশকের বাম্পার হিট ছবিগুলোয় শহরে গ্রামে ওনাকে আরও খ্যাতি অর্থ দেয়। মাস লেভেলে অসম্ভব জনপ্রিয় এসব ছবি। এইসব ছবি গুলোতে শাড়ি সহ বিভিন্ন ড্রেস প্রতি দৃশ্যে পরিবর্তন করতেন অপর্ণা সেনবীরেশের ছবিতেই আশির দশকে অপর্ণা সেরা গ্ল্যামারকুইন।

আজ আর এসব ছবি নিয়ে কথা বলেন না নায়িকা কিন্তু এটা অস্বীকার করা যায়না এই ‘মোহনার দিকে‘, ‘একান্ত আপন‘, ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম‘ – এর সাফল্য পরিচালিকা অপর্ণা কে আরো প্রচার দেয়। নিজের বানানো ছবিগুলো আরও মাস লেভেলে দর্শক পায়। পরমা থেকে পারমিতার একদিন সুপারহিট করে।

এই ছবিগুলোকে বাদ দিয়ে অপর্ণা সেন নয়।

Written By – শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়