সুপ্রিয়া দেবী মানে শুধু নীতা নয় !

নীতা

সুপ্রিয়া দেবী কে নিয়ে বলতে গেলে সে সেলেব থেকে আঁতেল সবাই বলে “নীতা, একটা ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র জন্যই সুপ্রিয়া দেবীকে শুধু মনে রাখা যায়। ঐ একটা ছবি করলে আর সিনেমায় অভিনয় না করলেও চলত। আর কি বা এমন চরিত্র করেছেন। “কারুর কাছে সুপ্রিয়া অভিনীত আর বাদ বাকি সব ছবি ফেলনা আসলে এরা হল দুদিনের ফিল্মবোদ্ধা। বেণুদির ভাষায় এদের বলতে হয় বুদ্ধির ঢেঁকি। এরা কমেন্ট করছে সুপ্রিয়া অভিনীত ‘মন নিয়ে’,’বিষকন্যা’,’আম্রপালী’,’সিস্টার’,’বনপলাশী’,’জীবন জিজ্ঞাসা’ না দেখে। কোনদিন দেখেইনি না দেখেই আলটোপকা কথা বলে শিল্পীর দুর্নাম করছে। কটা সত্যজিৎ,ঋত্বিক,মৃণালে র ছবি করলেই কেউ কমপিল্ট অভিনেত্রী যায় কি ?

যে শিল্পী মূলধারার ছবি ও মননশীল ছবি তে একসঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে দাপট দেখাতে পারেন তিনি আসল অভিনেতা অভিনেত্রী। সুপ্রিয়া দেবী তাতে একশোয় দুশো পাবেন। নীতা কিংবা ‘কোমল গান্ধার’ অবশ্যই সেরা কাজ ওঁর কিন্তু সুপ্রিয়া চৌধুরী সুপ্রিয়া দেবী হয়ে উঠতেন না কমার্শিয়াল ছবি না করলে। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ যতজন দেখেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী মানুষ ‘সন্ন্যাসী রাজা’-র রাণী মা বলতেই সুপ্রিয়া দেবীকে জানে। ‘সব্যসাচী’ সিনেমায় ওঁর করা সেই ইহুদি মহিলার চরিত্র যিনি শেষমেশ ভারতীয় স্বাধীনতা যোদ্ধায় পরিণত হলেন, সেই চরিত্রটি কি ঢাকা পড়ে যাবে অতলে? যে হলিউড স্টাইল সুপ্রিয়া টলিউডে ‘সবরমতী’,’চিরদিনের’,’কাল তুমি আলেয়া’ ছবিগুলিতে পরিচয় করিয়েছেন সেগুলো না করলে বাঙালী জানতোই না ইন্ডিয়ান সফিয়া লরেন্স কে? কি তাঁর মহিমা। যে একদিকে নীতা সেই আবার ‘লাল পাথর’-এ রাজার হাতে চাবুক পেটা খেয়ে মুখে রক্তের দাগ নিয়ে হাসছেন আর বলছেন

” ভালোবাসা! রাজা তুমি কাউকে ভালোবাসোনি। ভালোবাসতে জানোনা।”

যে অভিনয় হিন্দি ‘লাল পাথর’ এ হেমা মালিনী সে অর্থে ফোটাতে পারেননি। এই অভিনয় কি করে ভুলে গেল ফিল্মবোদ্ধা পাবলিকরা? আসলে দেখেইনি। জানেওনা। জানবার ইচ্ছেও নেই। তবু মতামত দেওয়া চাই। সেটাই যেন শিরোধার্য। ‘মন নিয়ে’ তে দ্বৈত চরিত্রে কি অসাধারন সাইকোলজিকাল রোল করেছিলেন সুপ্রিয়া। নীতার চেয়ে কোন অংশে কম নয় ঐ দুই কাজলনয়নাহরিনী বোনরা। স্বরলিপি, অয়নান্ত, শুনো বরনারী। যৌবন উপচে পড়া আবেদন ওষ্ঠঅধর কাঁপানো স্তনে নিতম্বে শরীরী যৌনব্যঞ্জনা সুপ্রিয়াই শেখালো বাঙালীকে। যখন যাত্রা করেছেন থিয়েটার করেছেন কাঁপিয়ে দিয়েছেন মঞ্চ। যখন মেগা সিরিয়াল করতে এসছেন ‘জননী’ করে মারমার কাটকাট সুপারহিট দিয়েছেন। প্রান্তবেলায় সুপ্রিয়া সাবিত্রী মাধবী তিন নায়িকা ও আরও অনেক তখনকার অভিনেত্রীরা মিলে বৃদ্ধাশ্রমের গল্প ‘শান্তিনিকেতন’ করে সুপারহিট দিয়েছেন। এসব মেগার পুরোধা বিষ্ণু পাল চৌধুরীকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। আমি যেমন সুপ্রিয়া দেবীর ফ্যান হই খুব ছোটোবেলায় ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ দেখে। কি বুঝতাম দু-তিন বছর বয়সে কিন্তু সুপ্রিয়া দেবীর দাপট বুঝেছিলাম মামণি চরিত্রে। বীরেশ চ্যাটার্জ্জীর সঠিক চরিত্র চয়ন মামণির রোলে সুপ্রিয়া দেবী। ঐ ধরনের একটা চরিত্র করেন বেণুদি ‘সিনেমায় যেমন হয়’ ছবিতে। এই ছবিটি ‘উনিশে এপ্রিল’ র সঙ্গে ন্যাশানাল আওয়ার্ডে গেছিল। দেবশ্রী রায় নায়িকা দুটোতেই। পরে দেখেছি নায়িকা সুপ্রিয়াকে কিংবা ‘মেঘে ঢাকা তারা’,’কোমল গান্ধার’।

সর্বসময় নায়ক নায়িকা দের বিশ্লেষন করবেননা আর্ট ফ্লিমের পরিচালক ধরে।অনেকেই বলে ‘নায়ক’ র জন্য উত্তমকুমার কে মনে রাখি। উত্তম কমার্শিয়াল ছবি করে সুপারস্টার বলেই সত্যজিৎ ওকে নিয়ে নায়ক বানান। কেন নেননি সৌমিত্রকে সৌমিত্র নায়ক করার আবদার করলেও। কেন করেননি দেবী চৌধুরাণী সুচিত্রা সেন বাদে? ওঁদের কমার্শিয়াল ভ্যালু স্টার স্টেটাস এতটাই। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা ভালো সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবিতে ভাবেন সুপ্রিয়া দেবীকে। ‘চিড়িয়াখানা’-তে সুপ্রিয়া-কে নেবার কথা ভেবেছিলেন সত্যজিৎ। অন্তত সত্যজিতের খেরোর খাতা তেমনই সাক্ষী দিচ্ছে। ‘দময়ন্তী’, ‘বনলক্ষ্মী’ দু-দুটো চরিত্রের পাশে তিনি সুপ্রিয়া দেবীর নাম লিখেছিলেন।

কিন্তু কেন যে সুপ্রিয়া দেবী-কে নেন নি সে তথ্য অবশ্য অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। তাহলে উত্তম-সুপ্রিয়া সত্যজিতের একই ছবিতে থাকতেন। জনতার সুপ্রিয়া দেবী কোনদিনই সুপ্রিয়া চৌধুরী হতেননা যদি না তিনি বানিজ্যিক ছবি করতেন। আরও একক নায়িকা নির্ভর বানিজ্যিক ছবি সুপ্রিয়ার করা উচিৎ ছিল। সত্যজিৎ ঋত্বিক র ছবি না করেও অজয় করের রিনা ব্রাউন কি অর্চনা করে কিংবা অসিত সেনের পান্নাবাঈ সুপর্না করে সুচিত্রা সেন অবলীলাক্রমে থাকবেন।

দুটো ঘরানাতেই এসব জাত অভিনেত্রীরা নায়িকারা সেরা। সাবিত্রী অনুপ কুমার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় রা সত্যজিতের ছবি ঋত্বিক ছবি করার সুযোগ না পেয়েও তাদের ব্র্যান্ডভ্যালু এতটুকু কমবেনা। ‘মাসিমা মালপো খামু’ এই ডায়লগ নির্মল দে র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’এ অমর হয়ে থাকবে। উত্তমের প্রয়াণের পরও তিরিশ দশক নিজের একার লড়াই চালিয়ে গেছেন সুপ্রিয়া। বলিরেখা ভঙ্গুর অস্থিতে পায়ের জন্য পিছপা হয়নি তার অদম্যশক্তি। একের পর এক ছবিতে সিরিয়ালে যাত্রায় দাপট দেখিয়েছেন। যারা এগুলো দেখোনি তারা চুপ থাকো। নিজেদের আঁতেল সাজাতে গিয়ে দুধভাত সাজিয়োনা। এমনকি এরা ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’-ও দেখেনি ঠিক করে বিশদে শুধু ঋত্বিক ঘটকের ছবি বলেই মেনশান করছে। ঋত্বিক যেমন নীতা তৈরী করেছেন সুপ্রিয়াকে তেমনি বানিজ্যিক সুপারহিট নায়িকা সুপ্রিয়ার থেকে ঋত্বিক দিনের পর দিন মদ খাবার টাকা নিয়ে গেছেন।সুপ্রিয়া কম চেষ্টা করেননি ঋত্বিককে মদের নেশা ছাড়াতে।

অঞ্জন চৌধুরী প্রভাত রায়রা উত্তম পরবর্তী সময় ওঁদের ছবিতে অনেক ভালো ভালো রোল দিয়েছেন সাবিত্রী সুপ্রিয়া মাধবী দের। কিন্তু গৌতম ঘোষ অপর্না সেন একটি ছবিতেও ওদের মতো প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীদের নেননি। নীতার আড়ালে বাকি চমকপ্রদ চরিত্রগুলো স্টাইল আইকন সুপ্রিয়াকে মুছে দেবেনা। না দেখে থাকলে দেখুন আর নইলে চুপ থাকুন। উত্তম যখন বেঁচেছিলেন তখন উত্তম বলতেন “আমি মরে গেলে আমার হয়ে রমা (সুচিত্রা) কি কি বলবে মিডিয়াকে।” কিন্তু উত্তম প্রয়াণের পর সুচিত্রা একটা কথাও বলেননি সরে গেছিলেন নিজের জগতে অন্তরালে। সুপ্রিয়াই এতবছর চার দশক বাঁচিয়ে রেখেছিলেন উত্তমকে তার প্রপৌত্র প্রজন্মের কাছেও। আর কোনো ভালোবাসায় যৌবন থাকা সত্ত্বেও জড়াননি সুপ্রিয়া। নিরবিচ্ছিন্ন উত্তম সেবিকা প্রেমিকা সুপ্রিয়া। যেন সুপ্রিয়া ওঁর ‘নতুন ফসল’ ছায়াছবির গান থেকেই বলে গেছেন

“আমি হবো না সতী না হবো অসতী
তবু আমি পতি ছাড়বো না।”

Written By – – শুভদীপ ব্যানার্জী