এভাবেই চিরদিন লতারা সীতা হয়ে ফিরে আসুক !

ভাইফোঁটা

“হারালো (ও) মোর প্রিয় যারা,
তোমার কাছে আছে তারা;
আমার কাছে নাই তাহারা – হারায়নিক’ তবু।।”

ভাইফোঁটা মানে শুধু ভাইবোনের আনন্দের নয়, খুশী সুখী ছবি নয়।হারানো ভাইবোনকে খুঁজে পাওয়া আবার ভাইবোনকে হারিয়ে ফেলাও। কিন্তু সে হারানো তো হারিয়ে যাওয়া নয়। হারিয়ে যাওয়া কিংবা দূরে থাকা দাদা ভাইদের মনে রেখে বোনরা দেওয়ালে ফোঁটা দেয়। ভাইরা কি করে? মনে মনে দিনটায় বোনকে মনে পড়ে নিশ্চয়। এখন অবশ্য বোনফোঁটা চালু হয়েছে।আজ বলব ভাইফোঁটা নিয়ে এমন এক বাংলা ছবির কথা,

‘নীলকন্ঠ’ (1985) এক ঝলমলে শিক্ষিত ভাইবোনের জমজমাট পরিবার থেকে এক সুন্দরী যৌবন সরসী বোনের সোনাগাছির বাতায়ন বর্তিনী হয়ে যাওয়ার গল্প। যে বোন ভাইদের মেয়েবেলায় দেয় ভাইফোঁটা। যৌবনে যে বোন হয়ে ওঠে ভাই ভাইবৌ দের শুধুই খোঁটা। যে বোনের জীবিকা চলে বাবু নামক খদ্দেরদের দানে। যার আগুন যৌবন টুকু বিক্রি হয়ে যায় প্রতি রাতে। একদিন সোনাগাছির সেই বেশ্যার ঘরেই জায়গা হয় তার বড়দা র। কোন বিপদে পড়েই জায়গা নিতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই ঘন্টা গুলো সেই দাদা বোনের খদ্দের বাবু। পরে সত্য উদঘাটন হয়, সেই যৌনকর্মীই তার হারিয়ে যাওয়া ছোটো বোন সীতা। যে এখন সোনাগাছির বেশ্যা লতু ওরফে লতা।

“বাড়ি আমার ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে,
জল সেখানে সোহাগ-ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।
সামনে ধূসর বেলা,জলচরের মেলা,
সুদূর গ্রামের ঘর দেখা যায় তরুলতার ফাঁকে।
ঠিক দুপুর্ বাতাস লেগে নাচে জলের ঢেউ
আমি দেখি আপন মনে আর দেখে না কেউ।

বাবা মা চার ভাই এক বোনের সংসার ছিল যাদের। যে বোন সীতা… নায়িকা সুলভ ভাবে ছোটোবেলায় চুল পাকাতো ওটাই তার মুদ্রাদোষ। তখন সে বকা খেত কেন বাজে মেয়েদের মতো চুল পাকাচ্ছে। ভাগ্যের পরিহাসে একদিন পবিত্র সীতা হয়ে গেল বাজারে মেয়েছেলে লতা । কিশোরী সীতা বাবার সঙ্গে ট্রেনে করে ঘুরতে যাচ্ছিল সেখানেই যৌন চোরা কারবারি দালালদের হাতে নিগৃহিত ও কিডন্যাপ হয় সে। হারিয়ে ফেলে সোনালী জীবন। হয়ে যায় সোনাগাছির লতা। খদ্দেরের কাছে লতা,পুলিশের খাতা,ভোটার লিস্ট,ট্রেড লাইসেন্স … সব জায়গায় লতা। কিন্তু এই লতাও সীতা হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। তাঁর বড়দা লতা কে ফিরিয়ে দিতে চায় সীতার আগের জীবন। ভালো মেয়ের জীবন। কিন্তু আর বাকি দুই দাদা ও এক ভাই ও তাদের বৌ রা কি এই সোনাগাছির লতাকে তাদের ঘরের চার ভাইয়ের সংসারের বোন শান্তা করে নেয়? সেই নিয়েই দিলীপ রায়ের অসাধারন ছবি ‘নীলকন্ঠ’। লতা ওরফে সীতার নামভূমিকায় অপর্ণা সেন। বড়দার ভূমিকায় দিলীপ রায়,যিনি অকৃতদার। ভাইদের রোলে শুভেন্দু চ্যাটার্জ্জী,শমিত ভঞ্জ, প্রসেনজিৎ প্রমুখ। বৌদিদের চরিত্রে লিলি চক্রবর্তী,মমতা শংকর,মহুয়া রায়চৌধুরীঅনুপ কুমার ও স্পেশাল এপিয়ারেন্সে ছিলেন জর্জ বেকার। ছবির সঙ্গীত শ্রুতিমধুর। সঙ্গীত পরিচালনা করেন জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। ছবির কাহিনীকার ছিলেন দুলেন্দ্র ভৌমিক। যার কাহিনীটি সে বছরের সেরা ছবির গল্পের জন্য ‘বাবুলাল চৌখানি মেমোরিয়াল ট্রফি’ পায়। এছাড়াও ‘নীলকন্ঠ’ ছবিটি সেরা ছবির বি এফ জে এ পুরস্কার পায় সে বছর।

‘নীলকন্ঠ’ আশির দশকের এই ছবি ভাইবোনের সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা দেয়। এসময় প্রসেনজিতের ক্যারিয়ার শুরুর দিকে এই ছবিতে প্রসেনজিৎকে কাজের সুযোগ করে দেন মহুয়া রায়চৌধুরী। যিনি আবার প্রসেনজিতের প্রেমিকার চরিত্রে এ ছবিতে। কলকাতা শহর সহ মফস্বলে তখন ‘নীলকন্ঠ’ ছায়াছবির পোষ্টারে লতা রূপী উপুর হয়ে শোওয়া অপর্ণা সেনের সাহসী ছবি বিতর্কিত ও জনপ্রিয় করে তোলে ছবিটি কে। ছবিটা সাহসী শুধু নাহ সংসারে সম্পর্কের কত রকম রং কত তার ব্যঞ্জনা এক হেরে যেতে যেতে ফিরে পাওয়ার গল্প ‘নীলকন্ঠ’। শেষ পৃষ্ঠা দেখতে তো ছবিটা দেখতে হবে। এভাবেই চিরদিন লতারা সীতা হয়ে ফিরে আসুক।

আমরা অবোধ, অন্ধ মায়ায় তাই তো কাঁদি প্রভু।।
তোমার মতই তোমার ভুবন
চির পূর্ণ, হে নারায়ণ!
দেখতে না পায় অন্ধ নয়ন তাই এ দুঃখ প্রভু।।
ঝরে যে ফল ধূলায় জানি, হয় না তাহা (কভু) হারা,
ঐ ঝরা ফলে নেয় যে জনম তরুণ তরুর চারা –
তারা হয় না কভু হারা। ‘