ভানুজায়া নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় @৯০

শ্বশুরবাড়ি

শুধুমাত্র ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী-ই নন, গায়িকা হিসাবেও নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করে তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন৷ পল্লীগীতি, কীর্তন, ছড়ার গান ইত্যাদিতে যথেষ্ট নাম করেছিলেন তিনি৷ স্বামী ভানুর একাধিক কৌতুক নাট্যে শোনা গিয়েছে নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাও৷ ভানু-নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই পুত্র ও এক কন্যা। কন্যা বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায় বিবাহের পর বাসবী ঘটক। বাসবী শিশু বয়সে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘শুভরাত্রি’ ও ভানু র সঙ্গে ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে ভানুকন্যার অভিনয়ই করেন। বাসবী তপন সিনহার অতিথি ছায়াছবিতে চারুর ভূমিকায় অভিনয় করে বিখ্যাত কিশোরীবেলাতেই। এরপর নীলিমা দেবী চাননি মেয়ে আর ফিল্ম লাইনে অভিনয় করুক।তাই মেয়ে শিক্ষিকা হয়। লেখিকাও বাসবী দেবী। বড় ছেলে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় কাঞ্চনমূল্য ছবিতে অভিনয় করেন। পরে প্রযোজক হন। আরেক ছেলে পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশে থাকেন।

নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় এক সুগায়িকা হওয়া সত্ত্বেও মিডিয়া যার দিকে সেভাবে আলোকপাত করেনি। কজন জানি আমরা ওনার সম্বন্ধে? আজ নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নব্বইতম জন্মদিন। ১৯২৯ সালের ২৮এ মার্চ জন্ম নীলিমা মুখোপাধ্যায়ের। হ্যাঁ, তখন মুখোপাধ্যায়। পরেশ মুখোপাধ্যায়, শিশুবালা দেবীর কন্যা। থাকতেন রসা রোডে। তিরিশের দশকের কথা, ছোট্ট নীলিমার দিদিকে গান শেখাতে আসতেন গানের মাস্টারমশাই। বসে বসে আপনমনে গান শুনতে থাকতেন। শুনতে শুনতে গান তুলে ফেলত নীলিমা। একবার কোন এক রাগে কঠিন তান শেখাচ্ছেন মাস্টারমশাই – দিদি কিছুতেই সেই তান পারেন না। ছোট্ট নীলিমা বলেই ফেললেন – আমি করি? অতটুকু মেয়ের গলায় সেই কঠিন তান শুনে মাস্টারমশাই অবাক। সেই শুরু।

সঙ্গীতজ্ঞ সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় র কাছে তালিম নিয়েছেন নীলিমা দেবী। উনি শিক্ষাগুরু তাঁর।সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সহোদর রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের কাছে শিখেছেন প্রথাগত কীর্তন। গীতশ্রী ছবি বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনেই কীর্তন শেখেন রত্নেশ্বর বাবুর কাছে।
১৯৪৮ সালে, সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায়, ‘সর্বহারা’ ছায়াছবিতে প্রথম নেপথ্যসঙ্গীত প্লেব্যাক করেন নীলিমা। তখন তিনি নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী। তখনও কিন্তু ভানু ছবিতে আসেননি। কৌতুকাভিনেতা বলেই বিখ্যাত। রেকর্ড আছে টুকটাক। সেভাবে নামী কেউ হননি। চাকরি করতেন আয়রন অ্যান্ড স্টিল কন্ট্রোল বোর্ডে। সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওঁর যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্রেই প্রিয় ছাত্রী নীলিমার সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ে দেন সিদ্ধেশ্বরবাবু, ১৯৪৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে। সিদ্ধেশ্বরবাবুই করেন ভানু-নীলিমার বিয়ের ঘটকালী। নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স তখন মাত্র সতেরো। এখনকার দিন ভাবলে অনেক কম।

নবদম্পতির দ্বিরাগমনের দিন আরেক কান্ড। শ্বশুরবাড়ি এসেছেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, স্ত্রীকে নিয়ে। সেদিনই বললেন, ‘রাধা ফিল্ম স্টুডিও’ থেকে একটু ঘুরে আসি। এদিকে রাত হয়ে যায়, জামাই আর ফেরে না। চিন্তিত পরেশ মুখোপাধ্যায় স্টুডিওতে চলে গেলেন জামাইকে খুঁজে আনতে। ‘ভানু’ নাম বলতেই এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন – পরনে ছেঁড়া চটের কাপড়। এই লোকটি তাঁর জামাই হতেই পারেন না। বললেন “আমার জামাইকে ডেকে দিন। নাম ভানু। “তখন মেক-আপ ছেড়ে শ্বশুরমশাইকে দেখা দিলেন ছেঁড়া চট পরা লোকটি। হ্যাঁ, ইনি ওঁর জামাই। সেই প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ছবির নাম, ‘জাগরণ’ – মুক্তিপ্রাপ্ত হয় ১৯৪৭ সালে। তার ঠিক পরের বছর, ওঁর অভিনীত ‘সর্বহারা’ ছবিতে প্রথম শোনা গেল নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম চলচ্চিত্রাভিনেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ ও নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ, ঘটল প্রায় একই সময়ে। ১৯৭৬ সালে, শ্যামল মিত্র ও গায়ত্রী বসুর সঙ্গে সুদূর আমেরিকায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন নীলিমা দেবী। সে বিদেশ যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কোনদিন স্ত্রীকে বাঁধা দেননি তাঁর কাজে। সহধর্মিনীকে যোগ্য মর্যাদা উৎসাহ দেন তাঁর গানে। ভানু যখন যাত্রা করতেন সেসময় নীলিমা দেবী খরচ কমাতে নিজেই গানে সুর দেন কথা লেখেন। সেগুলি বাম্পার হিট হয়। ‘সঙ্গীতশ্রী’ নামে একটি গানের স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন নীলিমা দেবী।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হন ১৯৮৩ সালের ৪ঠা মার্চ। নীলিমা দেবী আর বড় পুত্র গৌতম একসঙ্গেই থাকতেন ভানুশ্রী তে। ভানু নীলিমার পুরনো বাড়ি ভানুশ্রী এখন অভিজাত আবাসন। ২০১৭ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী নীলিমা দেবী চলে গেলেন। গৌতম বাসবী ‘ভানুশ্রী’ আবাসনেই তৈরী করেছেন ‘ভানু নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় আর্কাইভ’।
ভানু ভক্তরা ঘুরে আসতেই পারেন অমূল্য আর্কাইভ।

নীলিমা দেবীর নব্বইতম জন্মদিনে প্রণাম শ্রদ্ধা ভালোবাসা।

লেখক শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়