সুখেন দাসের ছবিতে সুচিত্রা সেন !

সুচিত্রা সেন একবার তাঁর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন অভিনেতা,পরিচালক,প্রযোজক সুখেন দাসকে। তাড়িয়ে দেবার কারন?

সেই নিয়েই আজকের গল্প।

সুখেন দাস র ছবি মানেই আজকাল সবার কাছে হাসির পাত্র। কিন্তু ঐসময়কার সমাজ ব্যবস্থা, একান্নবর্তী পরিবার, ভাইয়ে ভাইয়ে মিল,জায়ে জায়ে ঝগড়া,বাড়ির বড়দা অথবা দাদামণির সব দায়িত্ব ইত্যাদি মিলিয়ে ঐরকমই ছিল। সুখেন দাস র ছবি হিট হবার আরেকটা বড় প্লাস পয়েন্ট ছিল ওঁর দাদা অজয় দাসের সুরারোপিত গান। কি দারুন দারুন সব গান বানিয়েছেন অজয় দাস সুখেন দাসের ছবিতে। অনুরাগের ছোঁয়া, প্রতিশোধ, জীবন মরণ, অমরষকন্টক কত কত।যা আজও হিট। উত্তম কুমার সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় করেছেন সুখেন দাসের ছবিতে কাজ।

এই সুখেন দাস র জীবন শুরু কিন্তু খুব কষ্ট করেই। ছোটো থেকেই জীবনের সহজপাঠ পড়ে ফেলেন বলে বড় পরিচালক হয়ে নিজের ইউনিটের প্রতিটি সদস্যর খাবার পর সুখেন খেতেন। টালিগঞ্জ পাড়ার স্পটবয়েরও কাজ করেছেন সুখেন দাস। আর সেখান থেকেই আলাপ সুচিত্রা সেনের সঙ্গে। যদিও এরআগে শিশুশিল্পী হিসেবে অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন মাস্টার সুখেন। এরপর দশ এগারো বছর বয়সের কথা। ১৯৫৪-৫৫ সালের কথা। শ্যুটিং চলছে প্রবাদপ্রতিম দেবকী কুমার বসুর ‘ভালোবাসা‘ ছবির। সুচিত্রা সেন বিকাশ রায় অভিনীত। তার আগে অগ্নিপরীক্ষা মুক্তি পেয়ে গেছে। অগ্নিপরীক্ষার পর অনেকগুলো ছবি যেগুলো উত্তম বিনা সুচিত্রা ছায়াছবি , অন্য নায়কের সঙ্গে সেগুলোতে সুচিত্রা সেন নাম বড় করে থাকত। সুচিত্রা উত্তম এক হরফে থাকত। কিন্তু অন্য নায়ক হলেই সুচিত্রা সেন নামটা বড় হরফে থাকত। আসলে অগ্নিপরীক্ষা উত্তম সুচিত্রা জুটিকে অন্য উচ্চতায় তুলে দেয়। তাই বিকাশ রায়ের মতো বিগ নাম ও সুচিত্রার পরে থাকত। ভালোবাসা, মেজো বউ ইত্যাদি ছবিতে। যে গল্প বলছিলাম, মাস্টার সুখেন ছিল ‘ভালোবাসা’ ছবির স্পটবয়। সেখান থেকেই সুচিত্রা সেনকে দিদিভাই বলার অধিকার পায় সুখেন দাস। যেখানে তিনি সবার মিসেস সেন। সুখেনকে ভাই করেন। সুখেনের মুখে একটা ভোলেভালা মায়া ছিল। মিসেস সেনকে তাই চিরকালই সুখেন দিদিভাই বলে ডেকেছেন। সেই সম্পর্ক বজায় ছিল সুখেন অভিনেতা থেকে পরিচালক হয়ে গেছে তখনও। সেরকমই বহু বছর পর এক ঘটনা।

দিদিভাইয়ের স্নেহের অধিকার থেকেই সুখেন একটা আবদার নিয়ে সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে যান। আবদারটা ছিল সুখেন দাস পরিচালিত ‘মান অভিমান’ ছবিতে সুচিত্রা সেন কে অভিনয় করার অনুরোধ করেন সুখেন।সেটা ১৯৭৭-৭৮ সালের কথা। সুচিত্রা প্রায় অভিনয় ছেড়ে দিতে চাইছেন। নিজের পারিশ্রমিক দ্বিগুনের বেশী করে দিয়েছেন যাতে তাঁকে না নিয়েই ছবি করতে বাধ্য হয় পরিচালক প্রযোজকরা। যেমন ‘দত্তা’ ডবলের ডবল পারিশ্রমিক দিয়ে বিজয়া নায়িকা করেন অজয় কর সুচিত্রাকে। কিন্তু তারপর থেকে সুচিত্রা আর সেই স্ক্রীপ্টে চোখ বলানো,রোজ ডেট সিডিউল,মেক আপ এসবের চেয়ে আধ্যাত্মিক জগতের পথে এগোচ্ছেন। নিঃসীম একাকীত্বের পথে আলোর অভিসারিকা।সেখানে তাঁর বাড়ি উপস্থিত সুখেন ছবিতে অভিনয়ের আবদার নিয়ে। সুখেনের ছবিতে অভিনয়ের কথা শুনে প্রচন্ড রেগে গেলেন সুচিত্রা সেন। ড্রয়িং রুমে বসে কথা হচ্ছিল।সুচিত্রা চিৎকার করে বললেন সুখেনকে “এক্ষুনি তুমি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।”একথা বলে গটগট করে সুচিত্রা ভেতরের ঘরে চলে গেলেন।সেদিন থমকে গেছিলেন সুখেন দাস অত্যন্ত খারাপ লাগায়। তাঁর দিদিভাই ভাইকে এভাবে বলতে পারল!বেরিয়ে এলেন সুখেন ছলছল চোখে সুচিত্রার প্রাসাদ বাড়ি থেকে।এতদিনের সম্পর্কে ছেদ পড়ল। তাও এই নিয়ে।সুখেন ভাবল এটা তাঁরই অন্যায়। যখন ম্যাডাম অভিনয় করা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন তখন তাঁকে অভিনয় করার অনুরোধ না করলেই হত। সম্পর্কটা থাকত।

এরপর শুরু হল মান অভিমান ছবির শ্যুটিং।সুচিত্রা সেনের রোলটা করলেন সুমিত্রা মুখার্জ্জী। সঙ্গে অনিল চ্যাটার্জ্জী। ছোটোদের গল্প নিয়ে ছবি। মা সন্তানের গল্প। নিউ থিয়েটার্সের এক নম্বর স্টুডিওতে চলছে শ্যুটিং। হঠাৎ মিসেস সেনকে ফ্লোরে দেখে চমকে উঠলেন সুখেন দাস ও বাকিরা। এ স্বপ্ন না সত্যি!শ্যুটিং বন্ধ করে দৌড়ে এলেন সুখেন দাস।চোখের গগলসটা খুলে দিদিভাই সুখেনকে বললেন ” তোমার ছবির শ্যুটিং দেখতে এলাম।”শ্যুটিং তো মাথায় উঠল সবার।তবু শুরু হল ‘মান অভিমান’ ছবির শ্যুটিং।সুচিত্রা সেন বেশ কিছুক্ষন দেখলেন শ্যুটিং।সুখেন দাসকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারপর চলে গেলেন।সেদিন অভিভূত হয়েগেছিলেন সুখেন দাস।যে একদিন তাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে বেরিয়ে যেতে বলেছিল সেই আজ সশরীরে কোন খবর না দিয়েই তাঁর ছবির শ্যুটিং দেখতে হাজির।এ ম্যাডামের পক্ষেই সম্ভব।দিদিভাই ভাইকে বকেছিলেন আবার স্নেহ দিয়ে ভরিয়ে দিলেন।