লোকচক্ষুর আড়ালে এক মহানায়িকার সন্ন্যাসিনী হয়ে ওঠার গল্প !

পাশা

১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ফ্লপ হওয়ার পর অভিনয় জীবন থেকে সরে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যান সুচিত্রা সেন। ফ্লপটাই যে কারন তা নয়। ইন্ডাস্ট্রির বড় ম্যাডাম কানন দেবী ওঁকে শিখিয়েছিলেন “আমাদের অনেক বাজে ছবি করে নিজেদের ভালো কাজের অবমূল্যায়ণ করতে হয়েছে টাকার জন্য, তুমি সে কাজ করনা সুচিত্রা। নিজের তৈরী করা সম্মান নষ্ট করনা খেলো কাজের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে।”সুচিত্রা সেনের অদ্ভুত পরিবর্তন হয় স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী সংস্পর্শে এসে। যদিও এর অনেক অনেক আগে সুচিত্রার ভিতর ঈশ্বর চিন্তা জাগ্রত হয় যখন দেবকী কুমার বসুর ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ করছেন সুচিত্রা। অন্তরালে যাবার পর একবার বলেছিলেন ঘরোয়া আড্ডায় ‘দেবকী বাবুর ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ ছবি করে আমার জীবন দর্শন পাল্টে যায়।’

যে গল্প বলছিলাম,

স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী কাছে যখনই আসতেন খুব বিনয় ও ভক্তি নিয়ে আসতেন ম্যাডাম। ভরত মহারাজের কাছেও তিনি আসতেন। মহারাজের কাছে ‘সুচিত্রা সেন’ নাম বলতেন না। নাম বলতেন ‘মনোরমা’ – এটা তাঁর আসল নাম অনেক বইতে পাওয়া যায়। স্বামীজি দিয়েছিলেন নাহ শৈশবে মনোরমা থেকে রমা সেটা মিসেস সেন প্রকাশ করেননি সেভাবে। মহারাজের কাছে অনেকক্ষণ বসতেন। আলাদা করেই কথা বলতেন – একদম শিশুর মতো। মহারাজের জন্য ফুল, ফল নিয়ে আসতেন। প্রথমে জানতেন না কিভাবে সাধুদের কাছে আসতে হয় এবং কি করতে হয়। ধীরেধীরে সাধিকা হয়ে ওঠেন মিসেস সেন।

একবার কোন কারণে সারদা মঠ থেকে তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিল কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য বা কোন কিছু করার জন্য। সেটা আশির দশক। সুচিত্রা সেন লোকচক্ষুর আড়ালে, ছবি করেননা। যদিও চিরকালই রমা ছিল ভেরি প্রাইভেট পার্সেন। তখন তিনি বেলুড় মঠে এসে মহারাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি সেখানে যাবেন কিনা। কারণ তিনি তো নিজেকে জগৎ থেকে আলাদা করে নিয়েছিলেন। কেউ তাঁর কাছে সাক্ষাৎকার নিতে পারত না। একমাত্র বেলুড় মঠে এসে তিনি ঠাকুর-মন্দিরে প্রণাম করে ভরত মহারাজ, প্রেসিডেন্ট মহারাজকে প্রণাম করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। তাই সারদা মঠ অনুরোধ করার পর তিনি মহারাজকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। মহারাজ বলেছিলেন “গরীব মানুষের জন্য যদি হয় তাহলে করতে পারো”। সুচিত্রা গেছিলেন তবে প্রচারে আনেনি মঠ কতৃপর্ক্ষ সে খবর।

মিসেস সেন অসম্ভব মুডি একজন মানুষ সবাই আমরা জানি । ওঁনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চিন্তন যদি গভীর ভাবে ভাবা যায় দেখা যাবে মনের দিক থেকে উনি ছিলেন ভীষণই সরল । একটুতেই অভিমান করে বসতেন । উনি যখন মনের মতো মানুষ না পেতেন, মনের কথা শোনার বা শোনানোর জন্য কাউকে সামনে না পেতেন, তখনই দোলাচল হতো ওঁনার মনে । সেই দিক থেকে দেখতে গেলে, উনি মানসিক শান্তি লাভের পথ পেয়েছিলেন ঠাকুর ( শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ) এবং মায়ের ( শ্রী শ্রী সারদা দেবী ) কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে । উনি এটা বুঝেছিলেন, চিত্ত বৈকল্য থেকে বের করে এনে তাঁকে মানসিক শান্তি ও স্থৈর্য দিতে পারে একমাত্র ঠাকুর ও মায়ের শরণ । আসলে আমরা তো সকলেই কমবেশি স্বার্থপর, সেখানে দাঁড়িয়ে উনি উপলব্ধি করেছিলেন মায়ের কথা, ‘ যদি শান্তি চাও, কারও দোষ দেখোনাদোষ দেখবে নিজের । সুচিত্রা বলতেন, ‘ নিজেকে যদি ভাল করে রাখতে চাও , তবে গায়ে হলুদ জল মেখে থাকো । ‘ মানে ঠাকুরের শরণাপন্ন হয়ে থাকা এবং সেই আবহে নিজের মনটাকে আবিষ্ট করে রাখা । যেটা সুচিত্রা সেন খুব ভাল বুঝেছিলেন ।

শেষ

২০১২ সালের কথা। তখন যদিও সুচিত্রা সেন অসুস্থ। জানা নেই এর সত্যতা। তবু বেলুড় মঠের মহারাজরাই বলেছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবীণ সন্ন্যাসী স্বামী বিমলাত্মানন্দ বলেছেন,

২০১২ সালে গরমের দিনে এক বার রাত ১২টার সময় মঠে এসেছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু জিটি রোডের উপর মন্দিরের বন্ধ গেট খুলতে প্রথমে রাজি হননি দারোয়ান। আসলে তিনিও সর্বদা নিজেকে আড়াল করে রাখা মহানায়িকাকে চিনতেই পারেননি। পরে মঠের এক মহারাজকে ফোন করে সুচিত্রা জানান তাঁর আসার কথা। তখন সেই মহারাজ গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসেন।” বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে, প্রায় সারা রাত সারদাদেবীর মন্দিরের সামনে বসে ছিলেন সুচিত্রা। খুব ভোরে কেউ জানার আগেই তিনি নিঃশব্দে চলে গিয়েছিলেন। তবে শ্রীশ্রী সারদামণির চরিত্রে অভিনয়ের একটা সুপ্ত ইচ্ছা সুচিত্রা সেনের মনে ছিল। সুচিত্রা ছিলেন সংসারে এক সন্ন্যাসিনী। নিজের জন্য প্রায় কোনও কিছুরই প্রয়োজন হত না তাঁর। শোবার ঘরে তাঁর মুখ্য আসবাব বলতে ছিল কেবল একটা স্প্রিং-এর খাট। বেশ বড়, ফাঁকা ফাঁকা সে ঘর। জানলা খুলে দিলে সেই ঘর থেকে হাত বাড়িয়ে ছোঁওয়া যেত শিউলি গাছের ডাল। আর সেই ঘরের জানলার নিচে প্রশ্রয় পেয়েছিল বগনভেলিয়া। এই শোবার ঘরের সঙ্গেই ছিল ঠাকুর ঘর। সেখানে বেদিতে রামকৃষ্ণ, সারদা আর বিবেকানন্দের বেশ বড় ছবি। সব সময়ে সেই ঠাকুরঘরে ধুপের ধোঁওয়া হয়ে জেগে থাকত রমার অস্তিত্ব। সুচিত্রা সেনের সেই ঘরে চিহ্নটুকুও ছিল না। নিজের একটা ছবিও রাখতনা রমা। ঐ জীবন থেকে মুক্তি। তবে জীবদ্দশায় প্রায়ই সুচিত্রা বলতেন, ‘মা সারদাকে নিয়ে কেউ যদি কোনো ভালো ছবি তৈরি করেন, তাহলে তাতে কাজ করার ইচ্ছে আছে।’

মা সারদামণির চরিত্রে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার জন্য তাঁর সীমাহীন আগ্রহ ছিল । অনেককে বলেছেন যদি মঞ্চেও সম্ভব হয় সারদা মাকে নিয়ে থিয়েটার নাটক তিনি করতে রাজী। কেউই সাহস পাননি ঐ স্টারকাস্ট নিয়ে এমন ঐতিহাসিক কাজ করতে। জানা গেছে, অসুস্থ হয়ে বেলভিউ ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন থাকাকালে নিজের বিছানার বালিশের নিচে মা সারদার ছবি রাখতেন সুচিত্রা সেন।