“ব্রাদার! তুমি আসছো অ্যাক্টিং করতে, শরীর বানাতে নয়!” – রুদ্রনীল ঘোষ।

এই অভিনেতার ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে, হাতে বেশ কয়েকটা সিনেমা, সমান্তরালে চলছে নিজের কমেডি শো ছোটপর্দায় তারপাশেই প্রোমোশনে খামতি রাখছেন না নবাগত পরিচালক অভিরূপ ঘোষের সিনেমা "ডিটেকটিভ K" নিয়ে।

এই অভিনেতার ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে, হাতে বেশ কয়েকটা সিনেমা, সমান্তরালে চলছে নিজের কমেডি শো ছোটপর্দায় তারপাশেই প্রোমোশনে খামতি রাখছেন না নবাগত পরিচালক অভিরূপ ঘোষের সিনেমা “ডিটেকটিভ K” নিয়ে। লালচে বাদামি শার্ট, কালো প্যান্ট একদম ফিটফাট ফর্মাল ড্রেসে নিজের অফিসেই দিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার যদিও তার ফাঁকে ফাঁকে চরকির মত ঘুরে খবর নিয়ে নিচ্ছেন গোটা অফিসের, সব কাজ ঠিকভাবে এগোচ্ছে কিনা! স্পষ্টবাদী, ঠোঁটকাটা ইত্যাদি বিশেষণ নামের আগে থাকলেও যেন হাসি মুখে বলেন, “সেটা বড় কথা নয়!”, ইনি রুদ্রনীল ঘোষ। ভিডিও ইন্টারভিউগুলো সেরে দিনের শেষে হাতের কলার গুটিয়ে সোফাতে টানটান হয়ে বসেই বললেন, “তোমাদের ‘চ্যাম্প’র রিভিউটা পড়লাম, একদম পারফেক্ট!” রুমের হালকা আলোতে ইন্টারভিউ শুরু হতেই  রুদ্র-তেজে জ্বল জ্বল করে উঠলো চোখদুটো…

মনে হচ্ছে বেশ বিরক্ত…

রুদ্রনীল- (হেসে) কিসের ওপরে?

এই নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কিছু ব্যবহারে!

রুদ্রনীল- (সোজা হয়ে বসে) না না আমি অনেক বেশী চিন্তিত এদের নিয়ে! আমাদের যারা নতুন জেন তাদের কাছে আমার একটাই অভিযোগ বা ওয়ার্নিং বলতে পারো যে  ভুলটা আমরা করে এসেছি সেই ভুলের রেজাল্টটা ভালো না খারাপ সেটা তো শেয়ার করা উচিৎ বাকিদের! মডেলিং আসলে ঘরের বাইরে রঙ করার মত, নিজেকে মেনটেন করে রাখো ফিজিক্যালি তাহলে কিন্তু মডেলিং অনেকটা হয়ে যায়, অ্যাক্টিং ইজ নট লাইক দ্যাট! বাইরে সাজানোর জন্য মেক-আপ আর্টিস্ট তো আছেন। তাই যেকোন চরিত্র করতে গেলে মানুষকে অনেক বেশী করে দেখতে হবে। ব্রাদার! তুমি আসছো অ্যাক্টিং করতে, শরীর বানাতে নয়! অভিনয় করতে হলে সেখানে সময় দিতে হবে তো, মানুষকে বেশী করে ফলো করতে হবে তো, এটা তো একটা সাইকোলজিক্যাল জিম! জিম করলে আর দেখতে সুন্দর হলেই যদি হিরো হওয়া যেত, তাহলে শাহরুখ খান থেকে অমিতাভ বচ্চন কেউ হিরো হতে পারতো না! আমার মনে হচ্ছে চর্চাটা কম হচ্ছে, অভিনয় সাধারন মানুষকে নিয়েই হয় তাই সেগুলো যত্ন সহকারে ফলো করা উচিৎ কারন এখন দর্শকরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অভিনয়টা দেখেন তাই আমার বিরক্তের থেকে চিন্তাটা বেশী! সইটা অটোগ্রাফ হওয়া মোটেই সোজা নয়!

বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ‘করন জোহার’ বলা যেতে পারে তোমাকে, কারন অনেক প্রতিভা তোমার হাত ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে আসছে। এটা কিভাবে করছো…

রুদ্রনীল- এটা আমার নেচার, স্বভাব! ইনফ্যাক্ট আজকেই আমি একটা শুটিং করছিলাম রাজীবের “ক্লাসরুম” সেখানে একটা ছেলেকে দু’দিন ফলো করছিলাম, ভীষণ সাধারন দেখতে কিন্তু কি অসাধারন তার এক্সপ্রেশন! ভীষণ লাজুক কিন্তু ওর মধ্যে সম্ভাবনা আছে যে কোন সিনেমাতে একজন ভালো চরিত্রাভিনেতা হওয়ার। আমাদের এই মিডিয়ামকে বাঁচাতে গেলে বা আমাকে বাঁচতে গেলে এই আমরা কয়েকজনে তো হবে না , আমাদের সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হবে তাই এদেরকে তুলে নিয়ে আসা!

এতো চরিত্র ছেড়ে হঠাৎ গোয়েন্দা?

রুদ্রনীল- ইন্টারেস্টিং লেগেছে বলে আসলে এই গোয়েন্দা আর পাঁচজনের মত না। তবে কি বলতো চরিত্রর আগে আমি গল্পটা আগে দেখি কারন গল্প যদি ভালো না হয় সেই চরিত্র যতই ইন্টারেস্টিং হোক না কেন বা আমি যতই ভালো অভিনয় করি না কেন, লোকজন সেটা দেখবে না! এই গোয়েন্দা K চরিত্রটা যেরকম ইন্টারেস্টিং, গল্পটাও।

দেখুন ট্রেলার :

গোয়েন্দা চরিত্র করছো আবার সেটা বেশ নেগেটিভ! এই কন্ট্রাডিক্টটা তো বাংলার কোন গোয়েন্দার মধ্যে পড়ে না তাই এই কনসেপ্ট ভাঙার লড়াইটা কেমন হচ্ছে?

রুদ্রনীল- এটা সত্যিই ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক!! মানে দেবতুল্য চরিত্র মহাকাব্যেই পড়া বেটার বা যেটা আগে লেখা হয়ে গেছে । আমি একটাই কথা বলি ফেলুদা বা ব্যোমকেশ যখন লেখা হত তখন ঠিক এইভাবেই লেখা হত, শুধুই গুন রয়েছে কোন দোষ নেই! আজকের যদি গল্পগুলো দেখো প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কোথাও না কোথাও দোষ-গুন সব কিছুই রয়েছে। এই লোভ, রাগ, বিরক্ত, দোষ-গুন সব মিলিয়ে ‘K’ ভীষণই এই সময়ের একটা চরিত্র তাই আমাকে আলাদা করে ভাবতে হয় নি কিভাবে করবো! গোয়েন্দা মাইন্ড আমাদের সবার মধ্যে রয়েছে । আমাকে এই সোশ্যাইটিতে বেঁচে থাকতে গেলে কিছু মানুষের কাছে খারাপ হতে হবে আবার কিছু মানুষের কাছে ভালো হতে হবে! এভ্রিথিং ইজ গ্রে।

তাহলে বলছ ফেলুদা বা ব্যোমকেশের এবার রিটায়ারমেন্ট নেওয়া উচিৎ?

রুদ্রনীল- না যেহেতু এদের জন্ম অনেক আগে, এরা রিটায়ার করবে কিনা সেটা দর্শক বিচার করবে। দেখো আমরা যারা এই মিডিয়ামে রয়েছি আমরা আদপে কেউই জানি না যে কোনটা মানুষের বেশী পছন্দ হবে, পুরোটাই একটা আন্দাজ! কোন সাইকোলজি যদি দর্শকদের পছন্দ হয় তখন দুই, তিন বছর ধরে তারই আশেপাশে চরিত্রগুলো তৈরি হয় কারন পয়সাটা তো নিয়ে আসতে হবে, এটা একটা সেফ খেলা!

নতুন পরিচালক সেই ‘সেফ জোন’র বাইরে। কেমন ছিল শুটিং’র অভিজ্ঞতা?

রুদ্রনীল- মারাত্মক! মাথা গরম হয়ে রেগে যেতাম কারন প্রথম একটা ছবি করতে গেছে, ভেবেছে বিরাট ভলিউমে, যে টাকাটা পেয়েছে সেটাতে বানানো সম্ভব নয়! শুধুমাত্র আমরা যদি সবাই মিলে কষ্ট করি তাহলে সেই টাকাটা বাঁচিয়ে একটা ভালো ছবি করা সম্ভব। তাই অব্যবস্থা প্রচণ্ডভাবে ছিল, আমরা তো ব্যবস্থা পেয়ে অভ্যস্ত, শুটে গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা নেই, বসার জায়গা নেই, খাওয়ার জায়গাও নেই ! কিন্তু তার সঙ্গে দেখি ঐ মানুষটার ডেডিকেশন অসম্ভব রকম এবং যতটুকু টাকা পেয়েছে সেই বাজেটে এই সিনেমা দাঁড় করাতে গেলে এই এই জিনিসগুলো যেগুলো পেয়ে আমরা অভ্যস্ত তা দেওয়া সম্ভব নয় জেনেও এই বিরক্তির জায়গায় আস্তে আস্তে আমাদের সম্মানটা বেড়েছে! বিরক্তিটা সম্মানে ট্রান্সফার হয় অভিরূপের জন্য!

তুমি যদি চরিত্রটা ছেড়ে নিজে লাইফে গোয়েন্দা হতে তাহলে এই মানুষগুলোর জীবনের কোন জিনিসগুলোর অনুসন্ধান করতে?

রাজ চক্রবর্তী- (হাসি) এতো সিরিয়াসলি বারবার প্রেমে পড়ে কি করে? কে জানে!

সৃজিত মুখার্জি- (অনেক ভেবে) ও নিজের রাগটা এতো কন্ট্রোল করে কি করে?

কাঞ্চন মল্লিক- একটা মানুষ এতো হনেস্ট হয় কি করে?

প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি- একটা মানুষ এতো হাম্বেল হয় কি করে?

তনুশ্রী- ও এখনো প্রথম সারিতে আসছে না কেন?

রুদ্রনীল ঘোষ- এই তো চাপে ফেললে (হাসি)… রাত ১০টা’র পর কোন ফোন ধরে না কেন?

অনেকদিন পর আবার মুখ্যচরিত্রে তুমি। এই ব্যবধানের কারণ কি ?

রুদ্রনীল- (চোয়াল শক্ত করে) এটা আমি বলতে পারবো না, ইন্ডাস্ট্রি বলতে পারবে! এই ইন্ডাস্ট্রি’র তো একটা ধরন রয়েছে তো কি হয় দেখবে কেউ যদি পুলিশ হয় চিরকাল পুলিশই হবে , যে গুন্ডা হয় সে গুন্ডাই হয়ে আসছে! এটা একটা অভ্যেস বা আমি বলবো এটা দৃষ্টিহীনতা! আমি ছোট চরিত্র করতে করতে বড় হয়ে উঠেছি তাও আমি বলবো আমি অনেক লাকি যে খরাজ মুখার্জি বা রজতাভ দত্ত বা রাজেশ শর্মা যাঁকে এখন বলিউড নিয়ে মাতামাতি করছে তাদের টলিউডই ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারল না, সেখানে আমাকে ঘন ঘন ব্যবহার করবে এটা তো বিরাট ভেবে ফেলেছি আমি (হাসি)! আমি বোধহয় অনেক বেশী পেয়ে ফেলেছি এই ব্যবস্থায়।

গোয়েন্দা ‘K’ কে কেন দেখতে যাবেন দর্শকরা?

রুদ্রনীল- কারণ এই গোয়েন্দা বাংলার দর্শক আগে দেখে নি, মনে হবে এই গোয়েন্দা তো আমার পাশের বাড়ির ছেলে আর সায়েন্স ফিকশ্যান ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার একসাথে বাঙালী দর্শক এর আগে দেখেন নি।

একহাতে যেকোন চ্যানেলের টিআরপি বাড়ানোর ক্ষমতা রাখেন রুদ্রনীল ঘোষ

রুদ্রনীল- নাহ।

বলিউডের প্রোজেক্টকে নির্দ্বিধায় ‘না’ বলতে পারেন অভিনেতা।

রুদ্রনীল- হ্যাঁ।

বিয়ে, সংসার, জামাইষষ্ঠীতে বিশ্বাস নেই রুদ্রনীলের ।

রুদ্রনীল- হ্যাঁ (হাসি)।

ইন্ডাস্ট্রিতে একমাত্র মানুষ যে নিজের অসংখ্য গার্লফ্রেন্ড আছে বলে দাবি রাখেন ।

রুদ্রনীল- হ্যাঁ ।

পুনশ্চঃ- রেকর্ডার অফ করতেই সোফায় গা এলিয়ে বসে বললেন, “তুমি একটা প্রশ্ন করেছিলে না যে, আমি গোয়েন্দা হলে কি করবো? একটা ব্যাপারে আমার তদন্ত করার ইচ্ছে আছে…”

“হ্যাঁ, বলো…”

রুদ্রনীল- “একটা ইভেন্টে যশ, বুম্বাদাকে প্রায় ৩০ মিনিট বসিয়ে রেখে লেট করে ঢোকে কিন্তু দেরিতে আসার কোন রিগ্রেশেন তার চোখে মুখে নেই! আমার খুব তদন্ত করার ইচ্ছে এই আত্মবিশ্বাস বা সাহসটা পায় কোথা থেকে এরা ?”

“এবার এই ইন্টারভিউ’র প্রথম দিকের ধোঁয়াশাটা কাটলো মনে হচ্ছে!”

প্রশ্নের ওপারে- শুভদীপ কাজলী (এডিটর)।