“আমার মনে হয় না ধনঞ্জয়ের ক্ষেত্রেও আইন ব্যবস্থার কোন ত্রুটি ছিল”- অরিন্দম শীল।

সাধারণ মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় সেইদিনই সজাগ হয়ে গেছিল যখন 'ধনঞ্জয়' আসছে বড় পর্দায়, এই খবরটা চাউর হয়। আদপে কি ধনঞ্জয় জাস্টিস পেয়েছিল নাকি পুরো ব্যাপারটার মধ্যে ছিল অন্য কোন রহস্যের গন্ধ?

সাধারণ মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয় সেইদিনই সজাগ হয়ে গেছিল যখন ‘ধনঞ্জয়’ আসছে বড় পর্দায়, এই খবরটা চাউর হয়। আদপে কি ধনঞ্জয় জাস্টিস পেয়েছিল নাকি পুরো ব্যাপারটার মধ্যে ছিল অন্য কোন রহস্যের গন্ধ? আর যেখানেই রহস্য দানা বেঁধেছে পরিচালক অরিন্দম শীলের আতসকাঁচ সেখানেই হানা দিয়েছে, তবে কি এবার সামনে আসতে চলছে সত্যিটা? সেটার জন্য অবশ্য আপনাদের অপেক্ষা করতে হবে ১১ই আগস্ট পর্যন্ত, তবে ট্রেলার লঞ্চের পরই বিতর্কগুলো দাঁতনখ বের করে নানাভাবে আক্রমন করছে পরিচালকসহ পুরো টিমকে। এই প্রত্যাশার পর্বতপ্রমান চাপের মাঝে কি বলছেন পরিচালক? তা জানতে পৌঁছে গেছিলাম আমরা। প্রোমোশনে চূড়ান্ত ব্যস্ততার মাঝে বাতানুকূল গাড়ির মধ্যে আবছা আলোতে বসেই শুরু হল এই বছরের সবথেকে বিতর্কিত ছবি নিয়ে কিছু অকপট স্বীকারোক্তি, আলো কম থাকলেও আলোচনার মাঝে মাঝে পরিচালকের চোখে স্পষ্ট ছিল আত্মবিশ্বাসের ঝলক…

সোশ্যাল সাইটে ইতিমধ্যে ১.৫ মিলিয়নের উপর মানুষ দেখে ফেলেছে ‘ধনঞ্জয়’র ট্রেলার, এটা থেকে স্পষ্ট মানুষের উৎসাহ বেশ নজরকাড়া, প্রত্যাশার চাপ কতোটা?

অরিন্দম- সোশ্যাল সাইটে আসলে ১৮ লক্ষের উপর ভিউ, যেটা আমার কোন ছবির ক্ষেত্রে হয় নি। ১৫-১৬ লক্ষ হয়েছে কিন্তু ১৮ লক্ষের উপর হয় নি! হ্যাঁ, মানুষের উৎসাহ যে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। তবে এটাকে চাপ বলবো কিনা জানি না কারণ সেটা তো সব সিনেমা রিলিজের আগেই থাকে, এটা একটা মতবাদ, একটা সম্পূর্ণ মূল্যবোধের জায়গা থেকে দীর্ঘ রিসার্চ করে একটা সত্য উদ্ঘাটণের চেষ্টা। এই সিনেমা কোন গিমিক নয়! এটা একটা সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে বানানো। এবার  মানুষ সেটা একসেপ্ট করলো কিনা, দেখার বিষয়।

‘ধনঞ্জয়’র সত্যতা সবার সামনে আসা উচিৎ, এই তাগিদটা প্রথম কখন অনুভব করলে?

অরিন্দম- এটা অতনু ঘোষ (পরিচালক) আমাকে প্রথমে কিছু লিঙ্ক পাঠায় তো সেগুলো পড়ে মনে হল যে এটা নিয়ে সিনেমা বানানো উচিৎ। তারপর রিসার্চ করা শুরু করলাম, ভীষণ গভীরে চলে গেছিলাম, তারপর শ্রীকান্ত মোহতাকে ফোন করে বললাম এরকম একটা ভাবনাচিন্তা করছি এবং যেদিন বলেছি সেদিন  ৫ মিনিটের মধ্যে ও বলল এটা নিয়ে সিনেমা বানানো উচিৎ, তারপরই জোরকদমে কাজ শুরু হয়ে যায়।

১৯৯০’র ঘটনা, ২০০৪এ ফাঁসি এখন ২০১৭ সালে আসছে সিনেমাতে, ব্যবধানটা একটু বেশী নয় কি?

অরিন্দম- এটা নিয়ে সেভাবে কেউ ভাবে নি কেন আমি জানি না! এটুকু বলতে পারি যে, পরিচালক হিসেবে আমি তো অনেক তরুন। সাড়ে চার বছর ধরে পরিচালনা করছি, সেই জন্য আমার যখন মনে হল যে এই সাবজেক্ট নিয়ে সিনেমা বানানো যায়  তখনই আমি করেছি, কারুর জন্য অপেক্ষা করি নি।

প্রায় ৪০ জনের উপরে কাস্টিং নিয়ে সিনেমাটা করেছো…

অরিন্দম- ৪৮ জন…

‘দুর্গা সহায়’র মত একটা পারিবারিক সিনেমা বানিয়ে এতো বড় একটা কাস্টিং নিয়ে এরকম সিরিয়াস সিনেমা বানানো, নিজেকে রূপান্তর কিভাবে করলে?

অরিন্দম- ওটা আমি নিজেকে খুব সহজে ট্র্যান্সফর্ম করতে পারি। আমি মনে করি, যে জোনে আমি কাজ করছি সেখানে যদি নিজেকে পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারি তবেই সেটা সম্ভব। এর আগে আমি ব্যোমকেশ করেছি, আরেকটা ডিফিকাল্ট সিনেমা এবং এটা (ধনঞ্জয়) করবো জানতাম , তার মাঝে ‘দুর্গা সহায়’ করা। একটু সহজ, একটু ছোট ছবি সেইভাবেই প্ল্যান করা মানে আমার রেস্টটা আমার কাজের মধ্যে দিয়েই, আলাদাভাবে রেস্ট নিই না।

কিছু মানুষ এই সিনেমাটা এই সময় আসার পেছনে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের কথা বলছেন, তাঁদেরকে কি বলবে?

অরিন্দম- যাঁরা বলছেন তাঁরা সবসময় সব কিছুর পেছনে কোন না কোন উদ্দেশ্য দেখেন, তাঁরা হয়তো তাঁদের বাড়ির স্ত্রী, বন্ধুর সাথে  কথা বললেও সেখানে দ্বিচারিতা দেখেন সেইসব মানুষদেরকে আমি আর কি বলবো (হাসি)!

সিনেমাটা বানাতে গিয়ে সবথেকে ডিফিকাল্ট কোন জায়গাটা লেগেছে?

অরিন্দম- রিক্রিয়েটিং  ফিউ সিনস! খুব ডিফিকাল্ট। এমন হয়েছে এক এক সময় যে, যেটা রিক্রিয়েট করছি মনিটারের সামনে বসে নিজে দেখতে পারতাম না, অসুবিধে হত। কিছু কিছু সত্যি ঘটনা সেটাকে রেখে ফিকশ্যানালাইজড করা, এবার যে যে জায়গা সত্যি ঘটনাগুলোর উপর নির্ভর সেগুলো তো রিক্রিয়েট করতে হয়েছে এবং এই জায়গাগুলোই খুব ডিফিকাল্ট ছিল। ভীষণ মানসিক চাপ পড়েছিল অভিনেতা, অভিনেত্রীদের উপর ,আমার উপর, আমার টিমের উপর।

তাহলে এটা ডকুমেন্টশণের পর্যায়ে ফেলা যায়?

অরিন্দম- এটা ডকুমেন্ট্রি স্টাইলে ফিকশ্যানালাইজ করা কিন্তু না, সেইভাবে ডকুমেন্ট্রি বলা যাবে না আবার একদিক থেকে কিছুটা ডকুমেন্টশণও বলা যায় কারণ আমরা যে চরিত্রগুলোকে মিট করেছি , যে ধরনের কথা তারা বলেছে সেইগুলোই ছবিতে ডায়লগ হয়ে গেছে, যে সিচুয়েশনগুলো তারা বলেছে সেইগুলোই রিক্রিয়েট করেছি।

তবে কি ‘ধনঞ্জয়’ দেখার পর সাধারণ মানুষের দেশের আইন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কোথাও একটা নড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

অরিন্দম- আমাদের আইন ব্যবস্থাকে আমি কোনভাবে অবমাননা করি নি। আর আমার মনে হয় না ধনঞ্জয়ের ক্ষেত্রেও আইন ব্যবস্থার কোন ত্রুটি ছিল, তাঁরা তাঁদের কাজ করেছেন। ধনঞ্জয়ের পরিবার খুব গরিব ছিল, একটা পর্যায়ের পর উকিল দাঁড় করাতে পারে নি তো পুরো ব্যাপারটা একপেশে হয়ে যায় তবে সেই সময় সমাজ ও মিডিয়ার একটা অসম্ভব চাপ ছিল, যে চাপের কাছে হয়তো আইন ব্যবস্থা মাথা নত করেছিল, সেটা হতে পারে। আমি আইন ব্যবস্থার উপর কোনভাবে আঙুল তুলতে চাই নি এবং তুলিও নি।

তোমরা ধনঞ্জয়ের বাড়ি গিয়েছিলে রেকি করার সময়, অনেকটা টাইম কাটিয়েছিলে রিসার্চের জন্য…

অরিন্দম- হ্যাঁ সেগুলো আমাদের ছবিও তোলা আছে, ভিডিও আছে সেইসব মুহূর্তের ,সেগুলো ভীষণ পার্সোনাল জায়গা আমি প্রকাশ করতে চাই না কিন্তু এখন বোধহয় সেই সময় এসেছে কিছু কিছু ফুটেজ প্রয়োজন পড়লে সবার সামনে নিয়ে আসার।

কিন্তু খবর আছে ওঁরা নাকি চিঠি মারফত জানিয়েছে যে, সিনেমাটা সামনে না আসুক, সেই সময় আপত্তি করে নি?

অরিন্দম- আমি কোন চিঠি পাই নি (হাসি)…

তাহলে কি প্রিমিয়ারে ওঁদের পরিবারকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

অরিন্দম- ওঁদেরকে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছি, ওঁদের সাথে কথাও বলেছি আসলে ওঁরা কোথাও একটা এটা দেখতে চাইছেন না, ট্রেলার দেখেও কষ্ট পেয়েছে আর সেটাই স্বাভাবিক, আমিও কোনভাবে চাই না এই কষ্টটা বাড়াতে আমি চাই যে এই ২৭ বছরে পরিবারটি যে গ্লানির মধ্যে দিয়ে গেছে সেখান থেকে যদি কোনভাবে মুক্তি পায় তাহলেই হয়তো ভালো।

এখন অবধি তোমার বানানো সবথেকে কঠিন সিনেমা ‘ধনঞ্জয়’।

অরিন্দম- হ্যাঁ, পক্ষে।

এস ভি এফ ছাড়া অন্য কোন প্রোডাকশন হাউসের সাহস ছিল না এই সিনেমা বানানোর।

অরিন্দম- হুম, পক্ষে।

অনির্বাণের প্রতি একটা দুর্বলতা আছে পরিচালকের।

অরিন্দম- (হাসি)পক্ষে।

আগামীদিনে বাংলার মেনস্ট্রিম সিনেমার সংজ্ঞাটা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে পরিচালক।

অরিন্দম- চেষ্টা করবো, পক্ষে কি বিপক্ষে বলতে পারব না।

তোমার সিনেমাতে পর্দার পেছনে সবথেকে বড় এক্স-ফ্যাক্টর বিক্রম ঘোষ।

অরিন্দম- হ্যাঁ, পক্ষে।


সাধারণ মানুষের  মনে এখন একটাই প্রশ্ন, ধনঞ্জয় আদপে দোষী না নির্দোষ? এই প্রশ্নের সদুত্তর কি এই সিনেমা দেবে?

অরিন্দম- এটা মানুষই বিচার করবে ১১ই আগস্ট দেখার পর…

প্রশ্নের ওপারে- শুভদীপ কাজলী (এডিটর)।