যেমন খুশি প্রশ্ন করো প্রতিযোগিতাটি আরও বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে যখন এক মেদিনীপুরের ছেলে আরেক মেদিনীপুরের ‘কাকু’কে প্রশ্নবানে আউট করার চেষ্টা করে আর সেটা যদি পঞ্চাশতম ইনিংসে হয় তো ক্যায় বাত!! (কাকু কেন বলা হল সেটা সাক্ষাৎকারে বুঝতে পারবেন) উদ্দেশ্য ছিল পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের আগামী সিনেমা ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’ নিয়ে আড্ডা, যদিও আলোচনা শুধু সিনেমাতেই আটকে ছিল না…দক্ষ হাতে ব্যাট সামলে টলিপাড়ার ব্যস্ত অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য শুভেচ্ছা জানালেন আরও একটা পঞ্চাশের জন্য… সাক্ষাৎকার শেষে একটা কথাই মনে হল আগামী পঞ্চাশেও “তোমাকে চাই”..

“আলিনগরের গোলকধাঁধা” নামটার মধ্যেই একটা রহস্য লুকিয়ে, সেই সিনেমার মূল চরিত্র সোহমকে কিভাবে রপ্ত করলে? পরিচালকের কাছে শুনছিলাম, চোখ পিটপিট করা, হাতের অঙ্গভঙ্গি এসব নিয়ে বেশ কাজ করেছো…

অনির্বাণ- সেটা যেকোন একটা চরিত্র পাওয়ার পরই শুরু হয়ে যায়। চরিত্রের একটা ডিজাইন হয় যেমন ধনঞ্জয়ের ক্ষেত্রে একরকম, ঈগলের চোখে একরকম ছিল বা দুর্গা সহায় ,সব চরিত্রেই আমি চেষ্টা করি এমন একটা এক্সট্রা এলিমেন্ট ঢোকাতে যেটা আমার নেই! সেরকম সামান্য কিছু জিনিস রাখার চেষ্টা করি যেমন ধরো এই সিনেমাতে আমি গলাটা নিয়ে একটু কাজ করেছি ডাবিংএ, সেটা দুর্গা সহায়ের মত একদম নিজের গলা ভেঙে ফেলার ব্যাপারটা নয় আবার ব্যোমকেশে আমার গলার যে রিয়েল বেস সেটাও নয়, একটু সেখান থেকে সরে এসে অন্যরকম করার চেষ্টা। এবার এই ছেলেটার গলা শুনে, চোখের দিকে তাকিয়ে, অঙ্গভঙ্গি দেখে মানুষের যাতে বুঝতে সুবিধে হয় যে এই ছেলেটি আমি নয়, সোহম। অভিনয়ে দুইধরনের ব্যাপার থাকে একটা হচ্ছে ভেতরটা তৈরি করে বাইরেটা যা করার করলে আরেকটা হয় বাইরের বিভিন্ন এলিমেন্ট দিয়ে ভেতরটা তৈরি করলে…

ব্যোমকেশের পরিচালক সায়ন্তন আর আলিনগরের পরিচালক সায়ন্তন, পার্থক্য পেলে?

অনির্বাণ- একদম এক , সায়ন্তন ইজ ভেরি ফোকাসড, স্মার্ট , প্রচণ্ড একরোখা কাজের ক্ষেত্রে, খুব কম কথা বলে…

তুমিও তো তাই কম কথা বলো, একরোখা…টিউনিংটা এখানেই তৈরি হয়েছে…

অনির্বাণ- হ্যাঁ, এক হয়ে গেছে। কাজের প্রয়োজনে কথাবার্তা ছাড়া তবে কি হাসি-ঠাট্টা-আড্ডা হয় না তা নয় যেহেতু সায়ন্তন, শুভ,  সুদীপ্তদা, সৌগত এরা সবাই বন্ধু হয়ে গেছে তাই সেসবও হয় কিন্তু কাজ মাথায় তুলে কেউ আড্ডা দিই না। আমি খুবই উপভোগ করছি সায়ন্তনের কাজ দেখে…

তুমি নাকি এই সিনেমার নায়িকা ! ব্যাপারটা কি?

অনির্বাণ- (হেসে) এটা কিছুই না, পার্নো শুটের সময় ভ্যান থেকে বেরনোর ১০-১৫ মিনিট পর আমি বেরতাম, সেটা যে সবসময় হয়েছে তা নয় (হাসি)… ঐ যে হয় না হিরোইনরা দেরি করে আসে সেখান থেকে পার্নো মজা করে বলেছিল তুমিই হিরোইন এই ছবির! অনেকরকম ব্যাপার আছে, যেমন সায়ন্তনের টিম আমাকে কাকু বলে ডাকে…

কিরকম…

অনির্বাণ- এটা শুরু হয়েছিল ব্যোমকেশ থেকে। তো একদিন ওদের টিমের শুভ ফোন করে আমাকে বলে এরকম ব্যোমকেশ করছি তোমার ডেটের ব্যাপারে ইত্যাদি ইত্যাদি… তখন ওকে ফোনে আমি বেশ জ্ঞানমূলক কথাবার্তা বলেছিলাম, (গলা গম্ভীর করে) “শোনো শুভ, এই ডেট হলে অমুক, তুসুক…এই চরিত্র করতে গেলে তোমাদের সাথে বসতে হবে…চরিত্রটার একটা ব্যাপার আছে “(হাসি) তারপর ফোনটা রাখার আগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও বলে ওঠে, “হ্যাঁ,কাকু!” তখন থেকেই সায়ন্তনরা আমাকে কাকু বলে ডাকে। এই কাজ করতে গিয়ে কাকু, নায়িকা এরকম নাম জুটছে কপালে তবে ভালোবেসে ডাকে তাই কোনরকম আপত্তি নেই…

তোমার নামে চরিত্রের নামকরণ হলে সেটা কতোটা তৃপ্তি দেয়?

অনির্বাণ-  না, চরিত্রের নাম আমার নামে হলে সেটা মোটেই তৃপ্তি দেয় না। এই সিনেমাতেও সৌগত (বসু) প্রথমে চরিত্রের নাম অনির্বাণ রেখেছিল আমিই অনুরোধ করি নামটা পরিবর্তন করার জন্য, তারপর সেটা সোহম হয়, এর পেছনে আরেকটা টেকনিক্যাল কারণও আছে আগের সিনেমা “জোজো”তে চরিত্রের নাম ছিল অনির্বাণ তাই পরপর দু’বার একই নাম ঠিক না। আর আমার চরিত্রের নাম অন্য হলেই খুশি হই, বেটার লাগে  ঐ নতুন জামা নতুন দোকানে কেনার মত একটা ব্যাপার!

Anirban Bhattacharya
Anirban Bhattacharya

এখন তো কেউ তোমার ডেট পাচ্ছে না, শোনা যাচ্ছে  এক বড় হাউসের চুক্তির জন্য তুমি অন্য সিনেমাতে সময় দিতে পারছো না…

অনির্বাণ- এই মুহূর্তে সময় দিতে পারছি না কিন্তু ভবিষ্যতে অবশ্যই পারবো, আসলে এখন পরপর কাজের কথা হয়ে আছে আগে থেকেই তো এই বছরের শেষ পর্যন্ত হবে না তবে নিশ্চয়ই করবো…

তোমার ফ্যানেরা অনেকেই বলে যে তোমার সাথে কথা বলতে গেলে খুব ভয় পায়, এটা কেন?

অনির্বাণ- জানি না একদম, হ্যাঁ এটা হতে পারে যে আমি ‘ফ্যান’ যে ব্যাপারটা সেটা নিয়ে আমি খুব একটা প্যাম্পার হই না মানে ঐ হ্যালো বন্ধুরা, হাই ফ্রেন্ডস , তোমাদের জন্য এই উপহার আনছি এইসবগুলো আমি করতে পারি না কারণ আমি কাজ করি (একটু থেমে) মূলত নিজের আনন্দে। আমি শুধুমাত্র নিজের কাজের জন্য দায়ী এবং দিনের শেষে নিজের আনন্দটাই ম্যাটার করে। হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো যে দর্শকদের কোন মূল্যই নেই তোমার কাছে?…অবশ্যই আছে কিন্তু আমি দর্শক দিয়ে শুরু করি না যে দর্শকদের কোনটা ভালো লাগবে, আমার প্রাধান্য থাকে যে কোন চরিত্রটা করে আমার ভালো লাগবে… সঠিক শব্দটা হল অন্তর্মুখী। ফলত ফ্যানেরা মনে করে বোধহয় রাগ করে খুব তবে হ্যাঁ একটু হামবড়াভাব নিয়ে হাঁটি, লোকজন ভাবে প্রচণ্ড রাগী কিন্তু সেটা আমি একদমই নয়!

তাহলে অনির্বাণ ভট্টাচার্য হাসি ঠাট্টা করে?

অনির্বাণ- (হেসে) প্রচণ্ড…

প্রত্যেক সিনেমা থেকেই অভিনেতাদের পাওনার ঝুলিতে কিছু না কিছু আসে, এই সিনেমাতে কি এল?

অনির্বাণ- (তৎক্ষণাৎ) সৌগত’র স্ক্রিপ্টটা ! ব্রিলিয়ান্ট। এক কথায় বলবো এই সিনেমার হিরো এই স্ক্রিপ্ট, একদম বেস্ট পার্ট তারমধ্যে তো সুদীপ্ত মুজমদারের ক্যামেরাও চলে আসবে…সায়ন্তনের এই টিমটা একদম আলাদা…

পার্নোর সাথে কেমেস্ট্রি কেমন তৈরি হল…

অনির্বাণ- ভীষণ ভালো, খুবই খুনসুটি হয়েছে একদম জলের মত মানুষ, ঐ সব কিছু নেই…শুটিং করতে করতে অনেক আড্ডা হয়েছে খুব ভালো বন্ধুও হয়ে গেছে আমি তো পার্নোকে এই বলেই ডাকি (উদাত্ত গলায়) “বলো বন্ধু!”…

Anirban Bhattacharya and Parno Mittra
Anirban Bhattacharya and Parno Mittra

ধনঞ্জয়ে অভিনয়ের পর তোমার নাম কিন্তু পরমব্রত, আবীর, যীশু এঁদের সাথে তুলনা হচ্ছে, একই সারিতে আনা হচ্ছে..এটা কি ভাবে দেখছ?

অনির্বাণ- (আক্ষেপের সুরে) আমি জানি না কেন নাম নেওয়া হচ্ছে! দেখো আমি যখন  মেদিনীপুরে স্কুলে পড়াশুনা করি তখন থেকে পরমদা, আবীরদা, যীশুদা এঁরা অভিনয় করছেন। আমি বলছি যে ওঁরা আমার আগের ব্যাচ। অনেকে এই কথাটা আমাকে বলেছে তবে কেন জিজ্ঞেস করলে গ্যাস খাওয়ানোর জন্য বলে যে তুই এতো ভালো অভিনয় করিস তাই নাম নেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি… আমি বলছি এটা একদম ঠিক নয় এতে একটা জেনারেশন প্রবলেম হয়, গুলিয়ে যায়! আমি হচ্ছি ইন্দ্রাশিস, সাহেব, ঋষি, অর্জুন, গৌরব, রিদ্ধিমা  এদের ব্যাচ , এই জেনারেশন থেকে বিলং করি। আমার মতে জেনারেশনের সাথে আরেকটা জেনারেশনের তুলনা হতেই পারে কিন্তু সেটাকে এক লাইনে নিয়ে আসা ঠিক নয় তা হলে একটা হিস্টোরিক্যাল ভুল হবে। এবার যদি ঋদ্ধি একটা ভালো অভিনয় করে তখন সেটা সৌমিত্রবাবুর সাথে  তুলনা হতেই পারে, আলোচনা হতেই পারে… আমি  এটাই বলতে চাইছি যে কাউকে কারুর জেনারেশনে নিয়ে গিয়ে ফেলা উচিৎ হবে না…এটা পরিষ্কার থাকা খুব দরকার…

এদিকে তোমার অনেক ভক্তরা চাইছে তুমি ফেলুদা হিসেবে কাজ করো…কি বলবে তাদের?

অনির্বাণ- আমি তো তোমাদেরই একটা আর্টিকেলে দেখেছিলাম কিসব সার্ভে করেছিলে…সেটা তো আর আমার উপর নির্ভর করে না, আমার ইচ্ছে আছে ফেলুদা করার এবার আমি তো নিজে করতে পারি না কেউ যদি করেন আমাকে ডাকেন অবশ্যই করবো…

যে জেনারেশনের কথা বললে তাঁরা অনেকেই বিয়ে করে ফেললেন, ওদিকে তুমি নতুন ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছো, ইঙ্গিত কোন দিকে…

অনির্বাণ- (স্মিত হেসে) হ্যাঁ, বিবাহের দিকেই তবে এখন নয় আরও এক, দেড় বছর লাগবে…

প্রশ্নের ওপারে- শুভদীপ কাজলী (এডিটর)।