বুঝতে নারি !!

ব্যস,ব্যস, আর প্রশ্ন করবেন না! প্লিজ। কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলব, তারপর বলবেন, "নারীকে বুঝতে নারি"!

নারীদিবস – মানে কী বলুন তো? মানে, এই দিনটায় কী করতে হয়? আচ্ছা, আচ্ছা,বুঝেছি! অনেক নারীকে একসঙ্গে জড়ো করে লাইনে দাঁড় করিয়ে পুজো করতে হয়! কী? না? তাহলে কী কোনো পতাকা-টতাকা তুলতে হয় স্বাধীনতা দিবসের মত? তাও না? হ্যাঁ, তাহলে নিশ্চয়ই ১০৮ বার নারীর নাম লিখতে হয় খাতায়? আহ! তাহলে আজকে করতেটা কী হয়? দেখেছেন, এই হচ্ছে আপনাদের সমস্যা।

আচ্ছা, গালভরা নাম দিয়ে দিবস তো বানিয়েছেন একখানা, কিন্তু বাস্তবে কী করতে হয়, সেটা বলতে পারছেন না ? আবার বলছেন “চটছেন কেন”? এইজন্যই তো নারীকেন্দ্রিক সিনেমাগুলোর এই অবস্থা ! আসলে আপনারা বিষয়টা নিয়ে ভীষণ কনফিউজড! বুঝলেন? এই যে ‘নারী’ নামক একটা ‘বস্তু’ পৃথিবীতে আছে, এটাকে কোথায় রাখবেন, কীভাবে রাখবেন, মাথায় তুলে নাচবেন নাকি দলা পাকিয়ে ফুটবল খেলবেন, সম্মান দেবেন কী দেবেন না, স্বাধীনতা দেবেন কি দেবেন না, বা দিলেও কতখানি দেবেন – এই নিয়ে আপনারা ভীষণ কনফিউজড!

আমার কী মনে হয় জানেন? সবটাই আপনাদের খেয়াল। কখনও ইচ্ছে হল তো ‘মা’ বলে ডাকলেন, আবার ইচ্ছে না হলে ঠোঁটে রং মাখিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এ তো আপনাদের নিত্যদিনের পুতুল খেলা। যতক্ষণ ইচ্ছে হল খেললেন, ভেঙে গেলে আবার নতুন কিনে আনলেন।

ওহ! হ্যাঁ,হ্যাঁ,হ্যাঁ, আমি তো একটু অন্যদিকেই চলে যাচ্ছি। তা কী যেন আমায় বলতে বললেন? নারীকেন্দ্রিক সিনেমা কেন ততটা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না? আপনারা সাংবাদিকরাও না – কোথা কোথা থেকে টপিক খুঁজে খুঁজে বের করেন।মাথা নেই,মুন্ডু নেই, একেবারে ননসেন্স!

আসলে হয়েছে কী, মানুষ সহজাত প্রবৃত্তির শিকার। মানুষের আদিতম প্রবৃত্তি হল কাম। তাই সাধারণত তারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সেক্ষেত্রে পুরুষকেন্দ্রিক সিনেমায় মেয়েরা আকৃষ্ট হবেই। কিন্তু নারীদের সহজাত প্রবৃত্তি ঈর্ষা। এর প্রমাণ আমরা রামায়ণের মন্থরা-কৈকেয়ী থেকে শুরু করে পুরাণের বিনতা-কদ্রু হয়ে একেবারে হালফিলের মেগা সিরিয়ালগুলোয় প্রচুর পরিমানে পেয়ে থাকি। আর সম্ভবত সেই ঈর্ষার বশবর্তী হয়েই একশ্রেণীর মেয়েরা, যারা নিতান্ত ছাপোষা, সাংসারিক জীবনের গন্ডির মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, তারা বিদ্রোহী নারীকেন্দ্রিক সিনেমাগুলো দেখতে খুব একটা পছন্দ করে না।

কথায় আছে না, ‘ঘর-পোরা গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’, সেই কারণে অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকেই পরিবারের স্বামী বা শ্বাশুড়ির দল গৃহবধূদের সিনেমাগুলো দেখার অনুমতি সবসময় দিতে পারেন না। আবার, বড়পর্দায় নারীকে তার স্বাতন্ত্র্যে দেখাতে গেলে তাকে বিদ্রোহিনী করে তুলতেই হবে, যে কিনা প্রচলিত সমাজ কাঠামোকে ভেঙে খান খান করতে চায়, আবার সমাজে প্রচলিত দুর্নীতি, অবক্ষয়গুলোর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। প্রচলিত গতানুগতিক নারীকে রূপোলী পর্দায় তুলে ধরলে তার অভিনবত্ব কিছু থাকেনা। ফলতঃ তার ভাগ্যে এক-আধখানা খসে পড়া ভাঙা তারা ভিন্ন জোটেনা কিছুই। অন্যদিকে নারীর বিদ্রোহী হয়ে ওঠা অনেক পুরুষই ভাল চোখে দেখেন না। যতই মুখে নারী-স্বাতন্ত্র্য, নারী স্বাধীনতার কথা বলা হোক না কেন, একটা অদৃশ্য সীমারেখা যে এখনও নারী আর পুরুষকে কিছুতেই সমান অধিকারে বসতে দিচ্ছে না, তা কিন্তু নিঃসন্দেহে স্বীকার করতে হয়।

দেখুন ,সমাজের চাহিদার নিরিখে দেখতে গেলে আমাদের এই তথাকথিত পিতৃভূমিতে পুরুষকেন্দ্রিক সিনেমাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যেমন ধরুন “ডন”,”শাহেনশা”,”হলিডে”,”কৃশ”,”সুলতান”… আর কতই বা বলব? অবশ্য আপনি বলতেই পারেন নারীকেন্দ্রিক সিনেমাও তো আছে – “কাহাণি”, “নীরজা”, “আকিরা”, “এলার চার অধ্যায়”, “দেবী”, “দমন”, “পিঙ্ক”, “মর্দানি”। তবে তুলনামূলকভাবে হাতেগোনা ওই কয়েকটাই। এর একটা কারণ বোধ হয় এই সামাজিক চাহিদা।

দেখুন, আরেকটা বিষয়ও আপনি ভাবতে পারেন, এই খেলাধূলা থেকে শুরু করে শিল্প-সংস্কৃতি, শিক্ষা -সবেতেই কিন্তু সমাজে দুটো ক্যাটেগরি বানিয়ে রেখেছে। একটা জেনারেল ক্যাটেগরি – নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই হামলে পড়তে পারে, আরেকটা লেডিস ক্যাটেগরি – যেখানে পুরুষদের প্রবেশাধিকার নেই। এটা যেমন আপনি কাব্য-সাহিত্যের ক্ষেত্রে দেখতে পাবেন, যেমন নারীবাদী কবিতা, নারীমুখী কবিতা, আবার রাস্তাঘাটে চলাফেরার পথেও দেখতে পাবেন- নারীদের জন্য স্পেশাল ট্রেন, বাসে-ট্রামে-মেট্রোয় আলাদা সিট। কেন বলুন তো? আসলে এখনও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে তাদের সমান বলে মনে করে না,আন্ডারএস্টিমেট করে।   আর, এইসব স্পেশাল ব্যবস্থা করে এই ‘নারী’ নামক অবলা – নিরীহ জীবটির প্রতি খানিকটা করুণা করে মাত্র। এই নারীদের প্রতি সমাজের এহেন করুণাসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি যতদিন না বদলাচ্ছে ততদিন এইসব নারীবিদ্রোহ, নারীর আদর্শ নিয়ে তৈরি হওয়া ফিল্মগুলো কোনদিনই খুব একটা জনপ্রিয়তা পাবে বলে আমার মনে হয় না।

ব্যস,ব্যস, আর প্রশ্ন করবেন না! প্লিজ। কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলব, তারপর বলবেন, “নারীকে বুঝতে নারি”!