এবার মহালয়া পয়লা মার্চ !

ভোর

মহালয়া মানে পিতৃপক্ষ শেষে দেবী পক্ষের শুরু, মহালয়া মানে পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ…কিন্তু কজন বাঙালি মনে রাখেন সেই কথা! নিউ জেনারেশন আদৌ পরোয়া করেনা এসব কিছুর, কিন্তু জেনারেশনের পর জেনারেশন আসে যায় তবুও বাঙালীর কাছে মহালয়ার মানে হয়ে থেকে যায়, ভোর বেলার রেডিওতে বাজা মহিষাসুরমর্দিনী। যে বাঙালী ঘুমকাতুরে কোনোদিন ভোর দেখতে নারাজ, সেও ঘড়ির অ্যালার্ম সেট করে রাখে, আর তারপর নয় রেডিও সেট বা হাল ফ্যাশনের অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বেজে ওঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই লেজেন্ডারি গলার স্বর,’আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমন্ডলি…’ এ যেন প্রত্যেক বাঙালীর কাছে প্রথম প্রেমের মতো একটা অদ্ভুত নস্টালজিয়া! এটা তো কেবল রেডিও শো নয়, এটা ছাড়া যেন আজো বাঙালির দুর্গাপুজো শুরুই হয় না! অনুষ্ঠানটি প্রথম রেকর্ড করা হয়েছিল উনিশশো-একত্রিশ সালে! আর তারপর, বাকি টা ইতিহাস!

একা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রই নয়, প্রত্যেকটি গান যত্ন করে সুর দিয়েছিলেন স্বয়ং রবি ঠাকুরের বরপুত্র পঙ্কজ মল্লিক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ , দ্বীজেন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখার্জী, মানবেন্দ্র বাবু, কে ছিলেন না কন্ঠ শিল্পীর আসনে! এ যেন একই আকাশে হাজার তারার ভীড়, তবে এই অনুষ্ঠানের জীবন বলতে যদি কিছু বোঝানো যায়, তবে সেটা অবশ্যই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সোত্র পাঠ! সব মিলিয়ে এমন একটা পরিবেশনা যে এই এত বছর পরেও, ভীষণ হাইটেক চালচলনের যুগেও বাঙালির কাছে মহালয়া আজো কেবল একটা শোনার অনুষ্ঠান হয়েই থেকে গেল! তবে চীরকাল-ই কী তাই ছিল? আসলেই নয়! এই এত খ্যাতি, এত আলোর মধ্যেই নেমে এসেছিল অন্ধকার, আর আকাশবাণী কোলকাতা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে জাস্ট ফিনিশড ঘোষণা করে ঐ একই সময়ে শুরু করতে চেয়েছিল অন্য রকম এক মহিষাসুরমর্দিনী!  কিন্তু ঐ বলে না, সব ভালো সব জায়গাতে মানানসই হয় না! এই ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল! বাঙালির সেই মহালয়া যেন এক কালো দিন… আকাশবাণীর নামে লোকে ঠাট্টা করতে শুরু করে ছিল! আর ফল? আবার হাতে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র অ্যান্ড কোম্পানিকে… কত বড় হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তারা, যে আত্মাভিমানে আকাশবাণীকে ফিরিয়ে দেন নি। আবার ফিরে এসেছিল সেই জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মহালয়া, যা ছাড়া ওই দিন ঘুম ভাঙার কথা ভাবাই যায় না!উনিশশো ছেষট্টি সাল পর্যন্ত প্রত্যেক বছর লাইভ হয়েছে এই অনুষ্ঠান! আর আজো দীর্ঘ ছিয়াশি বছর পরেও মানুষের মনে জীবন্ত দুর্গার রূপ হয়ে রয়ে গেছে। আজো আলোর বেণু না বাজিয়ে দেবী পক্ষের শুরু ভাবা খুব দুষ্কর!

কী? পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে না? এমন একটা গল্প যদি চোখের সামনে দেখতে পেতাম! তবে সে আক্ষেপ রেখে আর কাজ নেই, প্রডিউসার প্রসেনজিত চট্ট্যোপাধ্যায় এই ইনিসিয়েটিভটা নিয়েই নিয়েছেন! ছবির নাম, মহালয়া ছাড়া আর কী বা হতে পারে! পরিচালক, সৌমিক সেন। আর অভিনয়ে একঝাঁক তারকা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চরিত্রে শুভাশীষ ব্যানার্জিকে দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়! ট্রেলারে যিশু সেনগুপ্ত প্রসেনজিত চ্যাটার্জি, শুভময় এই সকলকে ছেড়ে তার দিকেই চোখ চলে যায় বার বার! হার্বাটের পর শুভাশীষের সুদীর্ঘ কেরিয়ারে যে আর একটা রাজমুকুট এনে দেবার পোটেনসিয়াল এই ছবির আছে, তা ট্রেলার দেখে বোঝা যাচ্ছে। উত্তম কুমারের চরিত্রে যিশু সেনগুপ্ত বেশ মানানসই, প্রসেনজিতের ভয়েসওভার ট্রেলার থেকে মনোযোগ সরাতে দেয় না এক মুহূর্তের জন্যও। আর যা একেবারে মনের ভিতরে গিয়ে আঘাত করে খুব আদুরে মহালয়ার স্মৃতিগুলো, সেটা অবশ্যই সুপ্রীতি ঘোষের গান বাজল তোমার আলোর বেণু…. । রসগোল্লার অভাবনিয় সাফল্যের পর, সেই হ্যাঙ্গ ওভার কাটতে না কাটতেই আবার একটা পিরিওড ড্রামা নিয়ে হাজির হলেন শমিক। আর তার বিষয়বস্তু এতটাই বাঙালির মনের কাছের যে, এই ছবি যে আরো একটা ইতিহাস সৃষ্টি করবে তা বেশ নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। ছবির রিলিজ ডেট পয়লা মার্চ, ট্রেলার দেখে মন ভরেছে তা স্বীকার করতেই হয়, কিন্তু তারচেয়ে আগ্রহ বেড়েছে অনেকগুণে, দেখা যাক এই মহালয়া কিংবদন্তী হয় নাকী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় হাজার হাজার বিফল পিরিওড ফিল্মের ভিড়ে।