“কমরেড, এখন আমাদের কী পজিশন ?”

উত্তমকুমার

“মাসিমা, মালপো খামু” থেকে “সেটা বড় কথা নয়।” “একবার বলো, আমি উত্তমকুমার ” থেকে “কমরেড, এখন আমাদের কী পজিশন?”

বাংলা সিনেমা আর কমেডির সেকাল একাল নিয়ে আলোচনায় বসলে, এখনও যে চোখ প্রথমে সেকালের দিকেই চলে যাবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমায় তো বটেই, তারও আগে, প্রথম যুগের বাংলা ছবিতেও কমেডির ইনিংস চলেছে স্ট্রেট ব্যাটে। যার মধ্যে প্রথমেই নাম করা যায় নবদ্বীপ হালদার আর নৃপতি চাটুজ্জে-র। সে যুগের তারকা এই দুই কমেডি অভিনেতা বাংলা কমেডি অভিনয়ের ধাঁচ ঠিক করে দিয়েছিলেন যেন। পরবর্তীকালে, আরও দুই দিকপাল কমিক অভিনেতা, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আর জহর রায়, অনুসরণ করেছেন তাঁদেরই। এবং মনে রাখতে হবে, এইসময়কার কমেডি ছিল মূলত সিচুয়েশনাল কমেডি – এবং শারীরিক বা বাচিক কমেডি তখন প্রবল জনপ্রিয়। যেমন, ভানুর বাঙাল ভাষা বা জহরের স্থূলকায় দেহ হাসির উদ্রেকে সহায়ক হতো।

কিন্তু শুধু তাই নয়, তখন বাংলা সিনেমার একটা স্পষ্ট চর্চার বিষয় ছিল কমেডি। আরও ভালো করে বলতে গেলে, শুদ্ধ কমেডি-নির্ভর সিনেমা তখন সংখ্যায় ছিল যথেষ্ট। আর তাই, কমেডিয়ানরাও ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। একার কাঁধেই সিনেমা বয়ে দিতে পারতেন তাঁরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উত্তম সুচিত্রা থাকা সত্ত্বেও সাড়ে চুয়াত্তর সিনেমার স্পটলাইট কিন্তু কেড়ে নিয়েছিলেন সেই তুলসী চক্রবর্তী – পরবর্তীকালে যিনি স্বয়ং সত্যজিতের নির্দেশনায় কাজ করেছেন ‘পরশ পাথর‘-এ।

এর পরের যুগের কমেডি অভিনেতারাও অভিনয়ে বা জনপ্রিয়তায় কম তো ছিলেনই না, বরং নিজেদের আঙ্গিক ধরে রেখেছিলেন নিখুঁতভাবে। সন্তোষ দত্ত, চিন্ময় রায়, তরুণকুমার, রবি ঘোষ… কে নেই? এঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন বহু দর্শকের সিনেমায় যাওয়ার কারণ। বিশেষভাবে নাম করতেই হয় অনুপকুমারের। অসাধারণ অভিনয়ক্ষমতার অধিকারী এই মানুষটিকে কমেডিয়ান বলেই দাগিয়ে দেওয়া হলেও, তার কারণও ছিল। তাঁর কমিক টাইমিং ও অভিব্যক্তি ছিল দেখার মতো।

সে যুগের বহু সিরিয়াস অভিনেতাও, সঙ্গতভাবেই মনে করতেন, কমেডি অভিনয়ই সবচেয়ে কঠিন। তাই স্বয়ং উত্তমকুমার (মৌচাক, ধন্যি মেয়ে, ব্রজবুলি) থেকে উৎপল দত্ত – কমেডিতে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে ছাড়েননি কেউই।

কিন্তু আশির দশক থেকেই ছবিটা বদলাতে থাকে। সিনেমার ধরণে আসে বিবর্তন। মেলোড্রামাটিক স্ক্রিপ্ট, চড়া অভিনয় আর দুর্বল গল্পের এই সিনেমাগুলিকে অনেকেই বাংলা সিনেমার অন্ধকার যুগ বলে থাকেন। সূক্ষ্ম কমেডি, প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস তার জায়গা হারিয়ে ফ্যালে বাংলা সিনেমা থেকে। বদলে আসে শুধু “জোক” করে লোক হাসানোর চেষ্টা। সিচুয়েশনাল কমেডি, বা কমেডির জন্য আলাদা ভাবে স্ক্রিপ্ট লেখা প্রায় বন্ধই হয়ে যায়।কিন্তু এই অন্ধকারের মধ্যেও, মিটমিট না, বেশ তেজের সঙ্গেই জ্বলেছেন এক বিরলপ্রতিভা। তিনি শুভাশিস মুখার্জি। সিরিয়াস অভিনয়ে মাঝে মাঝে জাত চেনালেও, কমেডি অভিনয়ই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে। প্রায় তিন দশক বিস্তৃত কেরিয়ারে প্রসেনজিৎ বা চিরঞ্জিতের সাথে কাজ হোক, বা দেব আর জিতের সাথে – সংসার সংগ্রাম বা শুধু একবার বলো হোক, কিম্বা খোকাবাবু আর আওয়ারা – এমন বহু সিনেমা আছে, যার কমেডির পুরো গুরুদায়িত্বটাটাই কাঁধে বয়েছেন শুভাশিস। একা কুম্ভ হয়ে।

নব্বই দশকের শেষ থেকে কিন্তু আশার আলো কিছুটা হলেও নতুন করে জাগিয়ে তোলে টেলিভিশন। চ্যানেলে চ্যানেলে হাল্কা বিনোদনের অনুষ্ঠান থেকে কমেডির বেশ কিছু প্রতিভাবান নাম উঠে আসে। রজতাভ, কাঞ্চন, খরাজ, বিশ্বনাথ, রুদ্রনীল এমনই ক-জন। এঁরাই এখনও বাংলা সিনেমার পরিচিত কমেডিয়ান। নতুনদের মধ্যে এরই মধ্যে নাম কিনেছেন পার্থসারথি।

এঁদের অভিনয়ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ না থাকলেও, সন্দেহ থেকে যায় বাংলা নতুন কমেডি সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। দু-একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম (যেমন ভূতের ভবিষ্যৎ) বাদ দিলে, সফল বাংলা কমেডি এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তবে ধীরে ধীরে কমার্শিয়াল সিনেমায় তো বটেই, অন্য ধারার সিনেমাতেও জায়গা করে নিচ্ছে কমেডি। যেমন গোড়ায় গণ্ডগোল, বাই বাই ব্যাঙ্কক বা হাওয়া বদল। বাংলা সিনেমার কমেডির সেই পুরোনো সুদিন কী তাহলে একটু হলেও ফেরার আশা আছে? প্রশ্নটা থেকেই যায়। দর্শকরাই দিতে পারবেন এর উত্তর।