বিজয়া ইতি নয় – বরং নতুন শুরু !

বিজয়া

‘বিসর্জন’ এর পরেই আসে ‘বিজয়া‘। সিঁদূর খেলার পর প্রতিমার চোখের জল পান পাতা দিয়ে মুছিয়ে দেবী প্রতিমাকে মিষ্টি খাইয়ে হাতে পান দিয়ে দেবীমূর্তির কানে কানে বলতে হয় “আসছে বছর আবার এসো মা”। এই বলে তাঁকে আবাহন জানানো হয়। বিজয়া তাই শেষ নয় আরেক শুরুর আবাহন – জয়গান। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ও ‘বিসর্জনর’ -এর সিক্যুয়েল ‘বিজয়া’ আনলেন নতুন চমকে। ছবির দেবী প্রতিমা জয়া আহসান – পদ্মা। তাঁকে খড়বাঁশ দিয়ে নতুন করে গড়ে তুলেছে গণেশ মন্ডল আর দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে নাসির আলি ওরফে সুভাষদা।

বিসর্জন কিন্তু বিজয়া র সমার্থক নয়। তাই বিসর্জন দশমী ব্যবহার হয়না। বিজয়া দশমী ব্যবহার হয়। বিজয়া শব্দটি এসেছে বিজয় থেকে। পূরাণে দেবীশক্তির আবাহন ও বিজয় এই থেকেই বিজয়ার উৎস। বিজয়া তাই ইতি নয়। বরং নতুন শুরু। ‘বিজয়া’ ছবির কোনো গল্প , গল্পের মোড় কিছু বলেই ছবি দেখার উৎসাহ রহস্য নষ্ট করবনা করব কিছু বিশ্লেষণমূলক আলোচনা এ ছবি দেখবেন কেন?

বিজয়া সিনেমা রিভিউ
‘বিজয়া’ দেখতে গেলে অবশ্যই বলব আগে ‘বিসর্জন’ ছবিটি দেখে নিন। প্রায় সবারই দেখা বক্সঅফিস হিট জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি তবু দেখা থাকলেও আরেকবার দেখে নিন। তাহলে ‘বিজয়া’ রিলেট করতে অনুভব করতে আরো আরো ভালো লাগবে। যদিও ‘বিজয়া’ র এডিটিং অসাধারন আর সেখানে ঘুরেঘুরে এসছে ‘বিসর্জন’ র দৃশ্য। সেটা বাড়তি মনে হয়নি ছবিতে বরং বাস্তবেও অতীত মনেতে সেভাবেই ভীড় করে বর্তমানে। ‘বিজয়া’ শুধু আর দুই দেশের ধর্মের মানুষের প্রেমগাথা হয়ে উঠে আসেনি এই ছবি অনেক বেশী ম্যাচিউর। পরিচালক মশাই একটা বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন ‘বিজয়া’ ছবিতে। বাংলাদেশ থেকে কলকাতা তথা ভারতে আগত অসুস্থ মানুষদের কথা। যারা এই দেশে আসে ভালো চিকিৎসার কারনে। তারা নতুন দেশে চিকিৎসা করাতে এসে কি কি পরিস্থিতির সন্মুখীন হয় সেই ঘটনাই তুলে ধরেছেন পরিচালক। কিন্তু এর ভিতর অন্তঃসলিলা প্রেমগাথা বয়ে গেছে।

” তোমার পাশের দেশ,
তোমার পাশের বাড়ি ।
তোমার কথার রেশ,
তোমার পাশের গাড়ি । “

জয়া আহসান বিজয়া সিনেমা রিভিউ।‘বিজয়া’ ছবি আর পাঁচটা প্রেম পরকীয়া ছবির থেকে অনেক বেশী গভীর অনেক বেশী ম্যাচিউর যে ছবি দেখে চোখ রুমাল দিয়ে মুছতেই হবে। ভালোলাগা ফুল ছিড়ে ভোগ করা, আর ভালোবাসা গাছে রেখে ফুলকে ভালোবাসা। জয়া আহসান। এ ছবির প্রাণপ্রতিমা। যে প্রাণপ্রতিমার ভাসান হয়না কিন্তু তাঁর জীবনে ঘটে গেছে একের পর এক ভাসান। এই এতো শোক এত দুঃখ কি ভাবে একা হাতে সইছে একা নারী পদ্মা। জয়ার মর্মস্পর্শী ডায়লগেই উঠে আসে সে কথা

” পদ্মা দাস, পদ্মা হালদার, পদ্মা মণ্ডল …
এই একটা জীবনে তিন তিনটে পদবী নিয়ে ভুগতাছি । “

জয়াকে দেখে কখনও মনে পড়ে যায় সন্ধ্যা রায়ের গ্রাম্য সারল্য মাখা প্রতিমা মুখ, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের জল ধরে রাখা চোখ, আবার কখনও মহুয়া রায়চৌধুরীর গ্ল্যামারের ছটা বধূ বেশে কিছু দৃশ্যে। গণেশ মন্ডলের কথা ধরেই বলি জয়ার বর্ননা –

“আমি তো হ্যাঁ রে নিজের বাসায় দেইখা দুবেলাই চমকাই!
আর আপনি তো এরে পাঁচ ছয় বৎসর পর দেখতাছেন সুভাষদা।”

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বিজয়া সিনেমা রিভিউ।ছবিটা দেখতে যান অবশ্যই কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্য। এক একটা দুঃখের প্রানান্তকর দৃশ্যে উনি দুঃখটা যেভাবে হাসাতে হাসাতে দর্শককে ভুলে দিয়েছেন তার জন্য ওঁনাকে কুর্ণিশ। অনেকেই বলবেন এ ছবি গভীর মননের ছবি খুব স্লো ছবি। আমি বলব … না। এ ছবি গভীর দুঃখের স্পর্শকাতর ছবি হয়েও অনেক জায়গায় চিত্ত বিনোদনের ছবি। আর সেটা কে করেছে? গণেশ মন্ডলের ডায়লগ। ঐ যে বললাম জীবন সায়াহ্নে এসেও যে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতে পারে। অস্কিজেন মাক্স মুখে নিয়ে যে নার্স দের সঙ্গে তাস খেলতে পারে। যে বলতে পারে দুলাল লাহিড়ী ডাক্তার বাবুকে আপনাকে আমাদের স্কুলের ছোটোবেলার হেড মাস্টারমশাইয়ের মতো দেখতে। এ ছবি ম্যাচিউর কারন ভালোবাসা পরকীয়া মানে শুধু না পাওয়া থেকে প্রতিহিংসা হিংসা নয় বরং দায়িত্ববোধ। যেখানে পদ্মার ভালোবাসা নাসির আলি কিন্তু পদ্মাকে স্ত্রী করে নেয় প্রতিপত্তিবান গণেশ মন্ডল।

পদ্মার কথায় গণেশ মন্ডল কে “বিয়ার পর স্ত্রী হিসেবে আমি কোন ধর্মটা পালন করিনি কউ?” গণেশ মন্ডল বলে ” ভালোবাসার মানুষ মনের মানুষ পাওয়ানটা সহজ কথা নাহ। পাইছো যখন ছাইড়ো নাহ। ”

গণেশ মন্ডল ‘বিসর্জন’ ছবিতে ছিল খুব ক্ষমতাবান গ্রামের অধিপতি। কিন্তু ‘বিজয়া’ তে সে অসুস্থ, আগের চেয়ে কম ধণী আবার বর্ডারে যার মাল পাচার হয়। গণেশ মন্ডল তার ডায়লগ ডেলিভারি লুক সব এ ছবিতে অনবদ্যর বেশী কিছু থাকলে তাই। কৌশিক গাঙ্গুলী ‘বিজয়া’ করে অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেতে পারেন। অনেকসময় গণেশ মণ্ডল কৌশিক গাঙ্গুলীকে দেখে উৎপল দত্তের কথা মনে পড়ে যায়। একজন পরিচালক যিনি অভিনেতা থেকে পরিচালক হননি তাঁর এত দুরন্ত অভিনয় খুব বিরল। পরিচালক কাহিনীকার চিত্রনাট্যকার অভিনেতা সবেতে সেরা ও বিরল।
আবীর চট্টোপাধ্যায় বিজয়া সিনেমা রিভিউ।‘বিজয়া’ র আরেকটি গুরত্বপূর্ণ চরিত্র নাসির আলি ওরফে সুভাষদা ওরফে আবীর চট্টোপাধ্যায়। আবীরকে ‘বিজয়া’ তে আরও পরিনত লেগেছে। আরও সুন্দর লেগেছে। ছবির প্রথম প্রেমদৃশ্য পূর্বরাগ দৃশ্য যখন কলকাতায় এসে দেখা হচ্ছে আবার পদ্মার সঙ্গে তাঁর নাসির এর।

‘দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার–
জগতে কেহ যেন নাহি আর॥
সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব।

কালিকাপ্রসাদের গানএই পরিস্থিতিতে পদ্মা নাসির এর মনে পড়ছে বাংলাদেশের কথা আর তখনই ভেসে আসছে স্বর্গীয় কালিকাপ্রসাদের গান ,

“বন্ধু তোর লাইগা রে..
আমার তনু জড়জড়
মনে লয় ছাড়িয়ারে যাইতাম
থুইয়া বাড়ি ঘর ….বন্ধু তোর লাইগা রে ।। “

আমাদের প্রাক্তন কে দেখলে এক লহমায় পুরনো সবটা মনে পড়ে যায় তো এভাবেই। আর এ গানে মনে পড়ে কালিকাদাকে। পরিচালক লিখেই দিয়েছেন ছবির শুরুতে “কালিকাদা মনেমনে জানলাম তুমি ছবিটা দেখছো।”

ছবির আরেকটা দৃশ্য মন ছুঁয়ে গেলো। যখন গণেশ মন্ডল তাঁর স্ত্রীকে নাসির আলির কাছে সম্প্রদান করছেন। এই দুই পুরুষের বোঝাপড়ার দৃশ্যে দরজার পাশে আশা করেছিলাম পদ্মা দাড়িয়ে সব শুনে কাঁদছে পরিচালক দেখাবেন। বিসর্জন র মতো আবীর জয়ার সেই ধোওয়া দৃশ্যটা। কিন্তু ‘বিজয়া’ তে পরিচালক দরজার পাশে অঝোর ধারায় কান্না চোখে দাঁড় করালেন এক পাগল প্রতিকী বৃদ্ধের চরিত্রকে। যেন তারও পাগল হবার কারন ভালোবাসার স্বপ্ন সত্যি না হওয়া। যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশী মন ভরিয়ে দিলেন পরিচালক। শিশুঅভিনতা হার্ষিল বিজয়া সিনেমা রিভিউ।শিশুঅভিনতা হার্ষিল নিস্পাপ মুখে ছড়া বলতে বলতে কি মিষ্টিই না লেগেছে। এক শান্ত দৃষ্টিতে কখনওবা কৌতুহলের দৃষ্টিতে অসাধারন করেছে। বিসর্জন র চেয়েও বিজয়া তে মন্টু হার্ষিলের অভিনয় অনেক বেশী জায়গা পেয়েছে। মন্টুর গায়ের জরুল আর নাসির আলির গায়ের জরুল এক … গায়ে কাঁটা দেবার মতো সে দৃশ্য … জয়ার অপলক চাহনি। পাউডার দিয়ে ঢেকে দেয় মা ছেলের কালো জরুল। আরেকটা বিষয় আবীরের মতো হ্যান্ডসাম নায়ক থাকা সত্বেও একজন তথাকথিত অসুন্দর দেখতে লোক গণেশ মন্ডল এ ছবির নায়ক হয়ে উঠল। দর্শকরা গণেশ মণ্ডলের থেকে অন্য কোনোদিকে তাকাতে পারবেনা এ ছবিতে। চরিত্রাভিনেতা নায়ক এ ছবির। যা বিশাল পাওনা এখনকার বাংলা ছবির। আগে তো এভাবে ভাবা হতনা নায়ক নায়িকার বাইরে বাদ বাকী চরিত্র ফুলদানী হয়েই থাকে বেশী। কিন্তু তিনজনের অভিনয়ই দুরন্ত নইলে ছবিটা এত মর্মস্পর্শী হতনা। জয়া আহসান পদ্মার শেষ দেখায় নাসির আলিকে বলা কথা গুলো মন কেমন করায় বড্ড বড্ড।

লাউ লামা হালদারলাউ লামা হালদার আবারও অসাধারন। কমিক রিলিফ টু আবেগপ্রবন দৃশ্যে সেরা লামা। গণেশের বোন লক্ষ্মী কমলিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ছবিতে নেই। লক্ষ্মী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলা হল। হয়তো সেই ভালোবাসার টানাপোড়েন। পদ্মার মতো মনের জোর সবার থাকেনা। মুসলিম ডাক্তারের চরিত্র যিনি করেছেন অনবদ্য। কিছু অসংলগ্ন যদি লাগে সেটা গণেশ মন্ডলের শেষ দৃশ্য একজন অস্কিজেন মাক্স নেওয়া লোক যার হার্টের ভালভ অতি দুর্বল যেকোন মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে সে ঐ ভাবে ফিরে আসছে একটু অকল্পনীয় লাগে। কিন্তু ঐ যে গণেশ মন্ডল মানেই নেতিবাচক মানুষ নয়। তাই সে জীবনের শেষটুকুও উপভোগ করে আনন্দ করে বাঁচতে জানে। ছবির শেষ, শেষ হয়েও হইলনা হয়তো শেষ হয়তো আবার কোনো শুরুর ইঙ্গিত কিন্তু শেষটা অনবদ্য।

অরিজিৎ সিং এর কন্ঠে অনবদ্য গানের রেশ এখনও কাটেনি ,

” ও সবই তো গল্পের বই
হাজার রঙের সুর,
চাঁদ থেকে রোদ্দুর-
মলাটের নাম ধরে ডাকে ।