সংস্কৃতির লড়াইতে এগিয়ে বাঙলাই…

টালিগঞ্জের ইন্ডাস্ট্রীতে কম্পিটিশান কোনো নতুন বিষয় নয়! এই অভিনেতার সঙ্গে ওই অভিনেতার খিটিমিটি হোক বা এই ডিরেক্টরের সঙ্গে ওই ডিরেক্টরের ইগোর যুদ্ধ, সব মিলিয়ে বিষয় গুলো জলভাত! কিন্তু সংস্কৃতির প্রশ্ন যখন এল, তখন দেখা গেল অন্য এক রূপ! নিজেদের পার্সোনাল লড়াই গুলো সাইডে রেখে হাতে হাত রাখা এক অভিনব টালিপাড়া দেখা গেল নানা ভাবে। অসুবিধাটা শুরু হয়েছিল শাহরুখ খান স্টারার জিরো আর উইনডোজ প্রোডাকশনের রসগোল্লা আর রাজ চক্রবর্তীর অ্যাডভেঞ্চার অফ জোজোর রিলিজ ডেট ক্ল্যাশকে ঘিরে!কোলকাতার বড় বড় সিঙ্গল স্ক্রীন গুলোতে কিং খানের দাপটে ঠাঁই পাচ্ছিল না বাঙলার দুটো বেশ প্রশংসনিয় কাজ। একদিকে ইতিহাস আর ইমোশানের ঘেরাটোপে তৈরী ছবি ডিরেক্টর পাভেলের রসগোল্লা। আর অন্যদিকে ছোটদের নিয়ে তৈরী ছোটদের বেশ ইন্টারেস্টিং ছবি অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজো।

প্রথমে আসা যাক রসগোল্লার প্রসঙ্গে, বাঙলাতে হিস্টোরিকাল বায়োপিক, তাও আবার ফিকসান, আর সেও কিনা রসগোল্লার মতো একটা বঙ্গিয় ইমোশান আর তার সৃষ্টিকে ঘিরে, খুব বেশী হয়েছে বলে মনে পড়ে না। উইন্ডোজ প্রোডাকশনের দীর্ঘ রিসার্চ আর লড়াই, ডিরেক্টর পাভেলের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই ছবিটি অলরেডি কিন্তু দর্শকের মন জয় করে ফেলেছে! মাল্টিপ্লেক্স গুলোকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই একটা ক্ষেত্রে! তারা স্টার সুপারস্টারের বিভেদ টুকু করে নি। অবস্থা এমনই ছিল যে শিবপ্রসাদ নন্দিতাকে এস.আর.কের দারস্থ হওয়ার কথাও ভাবতে হয়েছে। সিঙ্গেল স্ক্রীন গুলোতে ঠাঁই পায় নি রসগোল্লা অনেক জায়গাতেই। শাহরুখের বেঙ্গলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়ার কথা মাথায় রেখে তাকে অনুরোধ করার কথাও ভাবতে হয়েছে, যেন তিনি একটা সুযোগ করে দেন বাঙালির এমন ঐতিহ্য নিয়ে তৈরী একটা ছবিকে একটু সঠিক ভাবে দর্শকের কাছে পৌছে দেওয়ার। কিন্তু কথায় আছে, ভালো জিনিসকে বোধ হয় কোনো বাধাতেই আটকে রাখা যায় না! আর রসগোল্লার বিষয়, তার পরিবেশনা দিয়ে মানুষের মন জয় করে নেওয়াটা সেই সত্যিটা আবারো প্রমাণ করে দিল।

আর যদি বলতে হয় অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজোর কথা, তবে সবার আগে এটা স্বীকার করতেই হয়, বাঙলাতে ছোটদের জন্য ছবির সংখ্যা খুবই কম। নেহাত একটা মোনজদের অদ্ভুত বাড়ির সাফল্য দিয়ে এ সত্যি তো বদলানো যায় না। এমন ছবি তিন চার বছরে এক একটা আসে। বিষয়, পরিবেশনা এসব পরের কথা, আসল কথাটা হলো বাচ্চারা দেখে আনন্দ পাচ্ছে কী না। আর যদি সেই মাপকাঠিতে বিচার করতে হয় তবে অ্যাডভেঞ্চারস্ অফ জোজো কে নেহাত অসফল বলা যায় না।

আর সব শেষে আসে কিং খান স্টারার জিরো। ছবি নিয়ে জল্পনার শেষ ছিল না। কিন্তু রিলিজের পর দেখা গেল নামের মতো সাফল্যের খাতাতেও বেশ বড়সড় একটা জিরো পেয়েছে ছবিটি। এস.আর .কে-র ভাগ্য নেহাত খারাপ চলছে বলা যায়। নয়তো রান্ঝনা মেকার্সদের থেকে এমন একটা ছবি কেউ আশাই করতে পারে নি। যে সমস্ত সিঙ্গেল স্ক্রীন গুলো রসগোল্লা বা অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজোকে ফেলে স্টার পাওয়ারের জোরে জিরোকে বেছে নিয়েছিল তারা বোধহয় ভুলেগিয়েছিল, মানুষ স্টারকে ভালোবেসে ছবি দেখলেও, খারাপ ছবি দেখে না কিছুতেই।

সৃজিত মুখার্জীর টুইটার পোস্টে জিরোর সঙ্গে লড়াইটা লড়ার জন্য শিবপ্রসাদ আর রাজ চক্রবর্তীকে বেস্ট উইশেস দেওয়া টা বুঝিয়ে দিলো আবারো, টালিগঞ্জে যতই রেষারেষি থাকুক, সময় এলে বাঙালি আজো নিজের সংস্কৃতি আর ইমোশানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হাতে হাত রেখে লড়াইটুকু দিব্যি করতে পারে। তখন আর কোনো বিভেদ থাকে না। আজ বক্সঅফিসে জিরোর মুখ থুবড়ে পড়া, আর রসগোল্লা বা অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজোর সাফল্য নতুন করে জানান দিয়ে দিল যে, আজো মানুষ ভালো কনটেন্টকেই সাপোর্ট করে। কেবল মাত্র স্টার পাওয়ার দিয়ে ডুবে যাওয়া কোনো গল্প কেই তীরে তুলে আনার পক্ষপাতী বাঙালি আজো নয়, কখনো থাকবে না।