সলজ্জ দৃষ্টিবদল সময়ের সাথে বদলে গেল দৃষ্টিকোণে…

বাংলা সিনেমা মানেই বাংলা সংস্কৃতি। আর তারই সাথে, বাংলা সংস্কারও। টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির রমরমার সেই স্বর্ণযুগ থেকেই বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের হাসিকান্নার পাশাপাশি বারো মাসে তেরো পার্বণ হয়ে আনন্দ-উঁৎসব-অনুষ্ঠানও জায়গা করে নিয়েছিল রূপোলি পর্দায়। তারই মধ্যে বোধ হয় সামাজিক গুরুত্বের কারণেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ এবং স্ক্রিনটাইম দাবী করে নিয়েছিল বিয়ের অনুষ্ঠান। আর তা হবে না-ই বা কেন? প্রাচীন রূপকথা থেকে আধুনিক প্রেমকাহিনী – সবকিছুতেই বিয়ে-ই মধুরেণ সমাপয়েৎ – “হ্যাপিলি এভার আফটার”। বাঙালি রোমান্টিক জাত। প্রেমের পূর্ণতা তাদের কাছে সারা জীবন একসাথে থাকা দিয়েই। আর তারই সামাজিক প্রকাশ ঘটত বিয়ের মাধ্যমে। প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই তাই জরুরি ছিল বিয়ের দৃশ্যায়ন।

স্বর্ণযুগের সিনেমায় তাই বিয়ে দেখানো হয়েছে বড় যত্নে, বড় ডিটেলে। গৃহসজ্জা থেকে নহবত, চর্বচোষ্য থেকে মন্ত্রপাঠ, আত্মীয়দের খুনসুটি থেকে নায়কনায়িকার সলজ্জ দৃষ্টিবদল – এ সবই ঘুরেফিরে আসত সিনেমাগুলোর বিয়ের দৃশ্যে। এমনকি, বেশ কিছু সিনেমার কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিয়ে – তা নায়কের শেষ দৃশ্যে নায়িকাকে মণ্ডপ থেকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া হোক বা অচেনা এক দম্পতির বিয়ের পর এ-ওর প্রেমে পড়া। সেইসব সিনেমায় বিয়ে শুধু উৎসবই ছিল না, হয়ে উঠেছিল বাঙালির সংস্কৃতিযাপন।

স্বর্ণযুগের জুটিদের পেরিয়ে এসে নব্বইয়ের দশকেও বাংলা সিনেমায় বিয়ে নিজের সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণভাবে বজায় রেখেছিল। ‘বিয়ের ফুল’ হোক বা ‘জামাইবাবু জিন্দাবাদ’, কমার্শিয়াল ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ হোক বা সমান্তরাল ধারার ‘পারমিতার একদিন’, সবেতেই বিয়ে শুধু উৎসব নয়, কাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সে দশকের সবচেয়ে প্রিয় জুটি প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণাকেও তাই বারে বারেই বসতে হয়েছে এমনই সব ফিল্মি বিয়ের পিঁড়িতে। দর্শকরাও লক্ষ্মীর কৃপা থেকে বঞ্চিত করেননি সেইসব ছবিকে।

কিন্তু সময়ের নিয়মে বাংলা আর বাঙালিরাও এগিয়েছে নিজের গতিতে। জীবন হয়ে উঠেছে ইঁদুরদৌড়। উৎসব-অনুষ্ঠানে মজে থাকার সময় কমে গিয়েছে অনেকটাই। সেই রীতি মেনেই এখনকার বাংলা সিনেমাতেও বিয়ে নিয়ে ক্রেজ তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। বরং তাতে প্রাধান্য পাচ্ছে প্রেম থেকে শুরু করে লিভ টুগেদারের মতো সাহসী বিষয়ও।

তাই বাঙালির প্রিয় জুটি প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা যখন আবার কাজ করতে চলেছেন একইসাথে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে – দাম্পত্যের কেমিষ্ট্রি তাঁদের নতুন সিনেমা ‘দৃষ্টিকোণ’-এ কী আবার বড় ভূমিকা নেবে? হাজার হোক, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর তাঁদের একসাথে কাজ করা ছবি ‘প্রাক্তন’ও তো বিয়ে আর বিয়ে ভাঙার গল্প।

তবে পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলির এই গল্পে উকিল-ক্লায়েন্টের চরিত্রে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা, সেখানেই জমে উঠেছে এঁদের মধ্যে সম্পর্কের রসায়ন, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সলজ্জ দৃষ্টিবদল থেকে জুটির সমীকরণ বদলেছে দৃষ্টিকোণে! সব মিলিয়ে, কৌতূহল থেকেই যাচ্ছে আগামী ২৭শে এপ্রিল ‘দৃষ্টিকোণ’ আর বাংলার এই সোনালি জুটিকে নিয়ে।