কাকাবাবুর ক্র্যাচে ভর দিয়ে সুইজারল্যান্ডের ফ্যান্টাসি-মোচন!


Movie : Yeti Obhijaan
Directed by : Srijit Mukherji
Starring : Prosenjit Chatterjee, Aryann Bhoumick, Jisshu Sengupta
Music by : Indraadip Dasgupta
Language : Bengali
Rating : 3/5


এই কিছুদিন আগে অবধি দু’জনের মধ্যে বেশ একটা ঠাণ্ডা লড়াই চলত, দু’জন না বলে দুটো জায়গা বলা অবশ্য বেশী ভালো। এদিকে ব্যংকক-পাটায়া আর ওদিকে সুইজারল্যান্ড। বাংলা সিনেমার কমার্শিয়াল বাজারে হিরো-হিরোইনের ফ্যান্টাসি নাচের পিঠস্থান এই দুটি জায়গা তাই এই দু’য়ের মধ্যে একটা লড়াই থাকে কে কটা গানে জায়গা পেল? যদিও লজিস্টিক বিচার ব্যংকক ও তার সতীর্থরা এগিয়ে কিন্তু এবারে সৃজিত মুখার্জির দৌলতে সুইজারল্যান্ড অনেকখানি এগিয়ে গেল বলা যায়। লজিস্টিক দিক থেকে সবথেকে কঠিন ওখানে কোন সিনেমার সিংহভাগ শুট করে আসা তাই এতো দিন হিরো-হিরোইনের ফ্যান্টাসি নাচ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল সুইজারল্যান্ডকে কিন্তু এবার হল সেই ফ্যান্টাসি-মোচন। সৃজিত এন্ড কোং সফলভাবে কাকাবাবুর ক্র্যাচে ভর দিয়ে বাংলা সিনেমাকে নিয়ে গেল একদম অন্য একটা স্কেলে। সিনেমা দেখে একটা ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল পরিচালক প্রথম থেকে শেষ অবধি আগাগোড়া বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে বানিয়েছেন কারণ এই প্রজন্মের কাছে ডিজিটাল যুগে ‘কাকাবাবু’র উপস্থিতিটা আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন। তাই কাকাবাবু সব সময় ‘লার্জার দেন লাইফ’, এমনকি অত উঁচুতে কনকনে ঠাণ্ডায় কাকাবাবু বিনা টুপিতে পাহাড় ভেঙে উপরে উঠতে থাকেন!

তবে এই সিনেমা যদি খুব মন দিয়ে দেখা যায় একটা জিনিস বুঝতে পারবেন সৃজিত মুখার্জি কেন এতো প্রোডাকশন-ফ্রেন্ডলি পরিচালক! সময় এবং বাজেট দুটোই গুরত্বপূর্ণ বিদেশে শুট করতে গেলে আর সেটা যদি সুইজারল্যান্ড হয় তাহলে আরও নিখুঁত হতে হয়! সেই কাজটা একদম যথাযথ করেছেন পরিচালক কারণ নূন্যতম ভিএফেক্স ব্যবহার করে পাহাড়ের আবক্ষ সৌন্দর্যের সাথে কাকাবাবু’র হিরোয়িক ইমেজ তৈরি করা মুখের কথা না, যদিও কিছু জায়গায় প্রয়োজনীয় শটের ঘাটতি চোখে পড়েছে কিন্তু অক্লান্ত প্রচেষ্টার কাছে সেটা হার মানতে পারে! এছাড়া সৃজিতের নিজস্ব কিছু এডিটিং স্টাইল চোখে পড়ার মত যেমন হেলিকপটারে বসে সন্তু-কাকাবাবু’র ওয়ান টু ওয়ান কনভার্সেশন বা হঠাৎ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বন্ধ করে দর্শকদের চমকে দেওয়া ইত্যাদি…এই সিনেমার সবথেকে বড় পাওনা কাকাবাবু ওরফে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, হ্যাঁ ‘ওরফে’টা সচেতনভাবেই ব্যবহার করা কারণ এই কাকাবাবু’র কোন বিকল্প নেই!

বাঙালীদের মনে ফেলুদা বললেই যেমন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়’র মুখ মনে ভেসে ওঠে ঠিক তেমনই কাকাবাবু বললে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জিই ভেসে উঠবেন মানুষের মনে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, ক্র্যাচ হাতে এরকম নিখুঁত অভিনয়, ঠাণ্ডা মাথা অথচ ক্ষিপ্র ও তীক্ষ্ণ প্রতিটি পদক্ষেপ আর সবথেকে বড় কথা ‘মিশর রহস্য’র পর এতো বছর ঘুরে গেলেও সেই এক ছাঁচে ফেলছেন প্রসেনজিৎ নিজেকে তাই কাকাবাবুর চরিত্রকে এভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য অনেক ভালোবাসা পাবেন তিনি, এছাড়া সন্তু (আরিয়ান) এবারে ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ, একদম কাকাবাবু’র একনিষ্ঠ ছাত্র। সিনেমাতে আরও দুটি জিনিস আপনাদের আগের কাকাবাবুর থেকে ভালো লাগবে, এক গানের ব্যবহার ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, বাহবা পাবেন অবশ্যই ইন্দ্রদীপ দাসগুপ্ত আর অ্যাকশেন শটে পরিচালক অ্যানিমেশন ব্যবহার করেন নি, পুরো ফাইটটাই রিয়েল। সবমিলিয়ে এই পুজোতে আবারও লম্বা রেসের ঘোড়া সৃজিত মুখার্জি’র “ইয়েতি অভিযান”। পরিবারকে নিয়ে দেখার মত সিনেমা তাই আজকে থেকে আসছে সপ্তাহ হাউসফুল বোর্ড ঝুললে অবাক হওয়ার থাকবে না, তবে একটা কথা যেটা অনেকেই ভেবেছিলেন বা সোশ্যাল সাইটে আলোচনার বিষয় হয়ে গেছিল যে ইয়েতিও কি বুনিপের মত কিছু একটা হবে না তো? সে ব্যাপারে বলে রাখি, নাহ! সেই ধারণাটা ভাঙবে বরং কাকাবাবু’র সাথে যে ‘ইয়েতি’র লড়াই হয়, দেখলে চমকে যাবেন! সেই ব্যাপারটাতে না হয় আপাতত সিনেমা হলের অন্ধকারেই আলোকপাত হোক!

পুনশ্চ- ভবিষ্যতে যদি বাংলা সিনেমার স্মরণীয় সামগ্রীর নিলামসভা হয় তবে এই ক্র্যাচের ডিম্যান্ড কিন্তু উপরের দিকেই থাকবে!