এ যেন সেই বিয়ে বাড়িতে খেতে বসার লাইনে হাপিত্যেশ করে অপেক্ষা করা…!

কোথাও ঘাড় ঘোরানোর সুযোগ নেই আর যদি ঘুরিয়েও ফেলেন শেফ গুপ্তা সুস্বাদু খাবারের লোভ দেখিয়ে আপনার ঘাড় আবার ঘুরিয়ে দেবে স্ক্রিনের দিকে।

Dish : Maacher Jhol
Chief : Pratim D. Gupta
Ingredients : Ritwick Chakraborty, Paoli Dam, Mamata Shankar, Arjun Chakraborty, Sauraseni Maitra & Others
Kitchen : Sony Pictures Networks and Joy B. Ganguly
Time to Taste : 1 hr 48 min
Garam Mashala : Anupam Roy


২০শে আগস্ট রবিবারের সন্ধ্যে, কলকাতার সিটি সেন্টার চত্বর পুরো জমজমাট, বিনা নোটিশে পুজো লেগে গেছে বাঙালীদের মনে! আইনক্সের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল এখানে কি সেল চলছে নাকি? যদিও উপরের এলইডি স্ক্রিনে তাকাতেই সেই ধারণাতে ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিল! এরপর অবশ্য মাথায় খেলল একটাই সম্ভাবনা অক্ষয় কুমারের “টয়লেটঃ এক প্রেম কথা”, ভিড় ভেঙে টিকিট কেটে ওপরে উঠে আমার সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকেই টয়লেটে ঢুকলেন ঠিকই কিন্তু পরমুহূর্তে বেরিয়ে এসে ভিড় জমালেন ৪ নং স্ক্রিনের ঢোকার মুখে, হ্যাঁ এখানেই চলছে বাংলার নবতম শেফ প্রতিম ডি. গুপ্তার মাছের ঝোল’।

অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে শো নির্ধারিত সময়ে শুরু হবে না কিছুটা লেট হবে, এ যেন সেই বিয়ে বাড়িতে খেতে বসার লাইনে হাপিত্যেশ করে অপেক্ষা করা! অগত্যা কথা বলা শুরু করলাম আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৫০ ছুঁই ছুঁই মিষ্টি একটা দম্পতির সাথে, এঁদের সাথে আমার আলাপ পর্ব অবশ্য কিছু আগেই শুরু হয় টিকিটের লাইনে, ঐ বর্তমানে খুচরো কয়েনের বাড়বাড়ন্তের খুচরো ঝামেলা নিয়ে! কথায় কথায় জানতে পারলাম দম্পতির সুপুত্র আজ সকালের ফ্লাইটে আমেরিকা রওনা দিয়েছে চাকরিসুত্রে, ছেলেকে প্রথমবার এতো দূরে পাঠানোর কষ্ট ভুলতে তাই ওনাদের আগমন এই নিখাদ বাংলা সিনেমা দেখতে, বেশ বুঝতে পারছিলাম এই ভদ্রলোকের বয়স হলেও চূড়ান্ত রোম্যান্টিক! জাতীয় সঙ্গীতের পরই শুরু হয়ে গেল আন্তর্জাতিক থেকে দেশীয় খাবারের সজ্জিত র‍্যাম্প ওয়াক, যেন এ বলে আমাকে দেখ ও বলে আমাকে দেখ! তার মাঝে অবশ্য বারবার লোভনীয় খাবারগুলো থেকে মনসংযোগে ব্যাঘাত দিচ্ছিল ঋত্বিক, পাওলি, মমতাশঙ্করের নিখুঁত অভিনয়।

হ্যাঁ, এটা সত্যিই খুব কঠিন কাজ, এতো খাবারের মাঝে ওঁদের মুখের এক্সপ্রেশন থেকে চোখ সরাতে পারবেন না আপনি। ফ্রান্স হোক কি কলকাতা ঝকঝকে,পরিমিত সিনেমাটোগ্রাফি যেন আরও মাতিয়ে দিল গোটা হলকে। ট্রিটমেন্টেও ফুল মার্কস পাবেন পরিচালক যেমন ধরুন যখন এত বছর পর ঋত্বিক কলকাতাতে ফিরে আসার পর যখন সে দুচোখ ভরে কলকাতাকে দেখে ক্যামেরা ফ্রেমে শুধু ওর এক্সপ্রেশনগুলোকেই ধরেছে কারণ কলকাতা তো আমাদের কাছে চেনা, ওর কাছে নয়! এমনকি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে যখন চাকুরিজীবী ঋত্বিকের ঘর দেখানো হয় সেখানের ইন্টেরিয়ার অন্য ঘরের থেকে আলাদা যেটা প্রমান দেয় ওর মানসিকতা বাড়ির মানসিকতার সঙ্গে মেলে না, এই ছোট ছোট কাজগুলো কিন্তু মাছের ঝোলের স্বাদ দ্বিগুন করে দিয়েছে!

ইন্টারভ্যালের আলো জ্বলতেই পাশে বসে থাকা ঐ ভদ্র মহিলা বলে উঠলেন, “তোমার মনে আছে টুবান সেই ৮ বছর বয়সে চা বানাতে যায় জেদ করে আর সে পুরো কেটে ছানা !” ভদ্রলোক সহাস্যে সম্মতি জানিয়ে আলত গলায় বললেন, “তুমি চা খাবে নাকি?”……ভদ্রমহিলার চা’য়ের চুমুকে হল অন্ধকার হল আর ঐদিকে শুরু হল ঋত্বিকের আসল পরীক্ষা, তাঁর মা (মমতাশঙ্কর)’কে ঐ ১৩ বছর পুরনো মাছের ঝোলটা রেঁধে খাওয়াতে পারে কিনা, তার সাথেই চলল দেভ’র (ঋত্বিক) ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়ন ও পাঁচ-ফোড়ন হিসেবে আমাদের বাঙালী বাড়ির চিরাচরিত সেন্টিমেন্টগুলোর সম্বলিত স্বাদে ভরপুর “মাছের ঝোল”। গোটা সিনেমাতে দুটো জিনিস লক্ষণীয়, এক এই সিনেমা অনেক প্রগতিশীল না হলে ঋত্বিক-পাওলির সম্পর্কের পরিনতি যেটা হতে পারত সেটা হলে বাংলা সিনেমা এক জায়গাতেই আটকে থাকতো কিন্তু সেটা হয় নি, যে রেজাল্টটা বেরল সেটা এই সময়ে ভীষণ প্রাসঙ্গিক ও বাস্তব এবং দুই, মধ্যবিত্ত ঘরে মা-বাবা’দের যেরকম প্রচলিত প্রত্যাশার চাপ থাকে সন্তানদের কাছে সেই প্রত্যাশাতে আঘাত করেছেন পরিচালক যে এরকমও হওয়া সম্ভব, এই চিন্তা ভাবনার বাংলা সিনেমাতে বিকাশ এই মুহূর্তে নেই, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

এক একসময় সেন্টিমেন্টগুলোকে নিয়ে এমন ভাবে খেলেছেন পরিচালক মনে হচ্ছিল কৌশিক গাঙ্গুলিশিবপ্রসাদ মুখার্জি’রাও বোধহয় তাঁদের আরও এক প্রতিযোগী পেয়ে গেলেন! স্ক্রিন-প্লে ও স্ক্রিপ্ট ভীষণ টানটান, কোথাও ঘাড় ঘোরানোর সুযোগ নেই আর যদি ঘুরিয়েও ফেলেন শেফ গুপ্তা সুস্বাদু খাবারের লোভ দেখিয়ে আপনার ঘাড় আবার ঘুরিয়ে দেবে স্ক্রিনের দিকে, তবে শেষে অবশ্য আপনি খালি হাতে ফিরবেন না, থাকবে আপনার জন্য একটা উপহার সেটা আপনারা হলেই গিয়েই চেঁখে আসুন। হলের আলোগুলো জ্বলতেই অনেকদিন পর শোনা গেল বাংলা সিনেমার জন্য মাল্টিপ্লেক্সে হাততালি!

সিট থেকে উঠতে গিয়ে ঐ ভদ্রমহিলার একটা কথা কানে এল, “টুবান কিন্তু সত্যি এখনো ভালো গান করে…”, ভদ্রলোক মাথা নিচু করে বেরনোর প্রস্তুতি নিতে নিতে বললেন, “বাড়ি চলো, ওকে একটা ফোন করতে হবে দেখি ও এখন কতদূর গেল…” বেশ বুঝতে পারলাম উনি পাবলিক প্লেসে ব্যাপারটা ইগনোর করলেও রিল লাইফে ছেলের সাথে বাড়ির সম্পর্ক কোথাও গিয়ে ওনাদের রিয়েল লাইফেও সম্মুখীন হতে হয়েছে, নাহ শেফ জিতে গেলেন! অনুপম রায়ের গানকে গরম মশলা করে যে রান্নাটা করেছেন “মাছের ঝোল” সেই রান্না আপামর বাঙালী যারা টেস্ট করেছেন এবং করবেন আগামী দিনে হলফ করে বলা যায় স্বাদটা জিভে নয় মনে থেকে যাবে আর পরে অবসরে মনে পড়লেই উঠবে একটা মিষ্টি তৃপ্তির ঢেকুর……!

বিঃদ্রঃ- খালি পেটে হলে ঢুকলে বেশ ভালো টাকা গচ্ছা যেতে পারে ইন্টারভ্যালে খাবার কিনে, আর বাঙালীদের এ ব্যাপারে পুরোপুরি ভরসা করা যায়!