শিল্পীর ট্যালেন্ট ও গৃহিণীর সাহসে ভর করেই আবারো সফল কৌশিক গাঙ্গুলী !

কন্ঠীর

পুজোয় যদি কমপ্লিট প্যাকেজ জমজমাট ছবি দেখতে চান দেখে ফেলুন ‘কিশোর কুমার জুনিয়র‘। অনেকেই ছবির নাম দেখে ভাবছে প্রসেনজিৎকিশোর কুমার সেজেছেন মহানায়কের পর। যা ভেবে অনেকেই খড়্গহস্ত। কিন্তু তা নয়, এ ছবি কিশোর কন্ঠীদের নিয়ে গল্প। যদিও গল্প শুধু কিশোর কন্ঠীর জীবনীর চেয়েও বেশী ভারত পাকিস্তান হামলা উগ্রপন্থী ডাকাত বিষয় নির্ভর।

Kishore Kumar Juniorযেখানে এক কিশোর কন্ঠী গায়ক অনেক কষ্ট করে কিশোর কুমারের মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা করে রাতের পর রাত শো করে। যার চাপ নিতে না পারায় রোজ মদ্যপান করে তাকে বাড়ি ফিরতে হয়। সংসার তার গানের অর্থতেই চলে। সংসারের লক্ষী তার বউ অপরাজিতা আঢ্য। যে সংসার, স্বামীর মাতলামো, সঙ্গীত জীবনের স্ট্রাগল, ছেলের লেখাপড়া, পিতাপুত্রের দ্বৈরথ সব একা হাতে সামলায়। এই কিশোর কন্ঠী গায়কের আসল নাম রজত ঘোষ নামটাই হারিয়ে যায় সে হয়ে যায় কিশোর কুমার জুনিয়ররজত ঘোষ নামটা কার সঙ্গে মিল পাচ্ছেন? গৌতম ঘোষ। আশি – নব্বই দশকের দাপুটে কিশোর কন্ঠী। কিন্তু গৌতম ঘোষ নিজ নামেই পরিচিত ছিলেন কিশোর কন্ঠী হলেও তো এ হেন কিশোর কন্ঠীর ভাগ্য ফেরে ভারতীয় মন্ত্রী আমলাদের প্রোগাম করতে দিল্লী থেকে যখন সে ডাক পায়। রাজস্থান সহ নানা জায়গায় শো। কিন্তু সব আশায় জল ঢেলে কিশোর কুমার জুনিয়র তাঁর স্ত্রী ও মিউজিশিয়ানরা বিমানবন্দরে নামতেই হাইজ্যাক করে নেয় কিছু দুস্কৃতি। এই কিডন্যাপের থেকে কিভাবে কিশোর কুমার জুনিয়র ও তার স্ত্রী বেরিয়ে আসে সেই নিয়েই গল্প। কিশোর কুমার একজন বাঙালী যার গান ভারত তথা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে কতটা হৃদয়গ্রাহী তাই এ ছবির বিষয়। কোনো মিউজিক্যাল ছবি যদি দেখতে চান, গোল্ডেন এরার গানময় এ ছবি। যেখানে ছবির ডায়লগ হয়ে যায় অনেক কিশোরের অসাধারন সব গান।

হাসি কান্না গান কমেডি সবের মিশেল পারফম এ ছবি।

Kishore Kumar Juniorএবার আসি ছবির ভালো মন্দে,

ভালোপ্রসেনজিৎ ছবির শুরু থেকে কিশোর হেয়ারস্টাইলে, ক্লিনসেভ বুকে খোলা জামার বোতামে, টলটল মদ্যপ পায়ে, নেচেগেয়ে যা অভিনয় করেছেন একজন কমপ্লিট প্যাকেজ কমপ্লিট পারফর্মার। অতি অভিনয় লাগেনি কারন কিছুকিছু জায়গায় মেলোড্রামা দরকার ছিল। এ ছবি প্রসেনজিৎ ছাড়া হতনা। কষ্টের দৃশ্য গুলোতে প্রসেনজিৎ অনবদ্য। মুখের মাসেল ডায়লগ ডেলিভারির সঙ্গে যেভাবে নাড়িয়েছেন তা অনবদ্য। অপরাজিতার অভিনয় অসাধারন। লাউডনেস অনেক কম। কখনও কমেডি কখনও দুঃখ অপরাজিতা – সাবিত্রী চ্যাটার্জ্জী ঘরানার অভিনয় করেছেন। অপরাজিতা যখন বুড়ো ডাকাত সর্দার মাসুদ আখতার কে বলে ‘আবোদা বুড়ো’ হল হাসিতে ফেটে যায়। কিংবা ডাকাতদের হেঁসেলে ঢুখে অপরাজিতার রান্না করা… হাইজ্যাক গল্পের ছবিটাকে ফ্যামিলি ড্রামা বানিয়ে দেয়। অন্যদিকে অপরাজিতা যোগ্য সহধর্মিণীর মতো যখন বলে,

‘শিল্পী হতে গেলে ট্যালেন্ট লাগে আর শিল্পীর বউ হতে গেলে সাহস লাগে’ … দুরন্ত অভিনয়।

Kishore Kumar Juniorশান্তিলাল পুত্র ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় পিতার চেয়েও অনেকদূর এগোবে, এত দুর্দান্ত অভিনয় করেছে কিশোরকন্ঠীর ছেলের ভূমিকায়। তবে এ ছবির সেরা অভিনয় রাজেশ শর্মার। ছবির শেষে প্রসেনজিৎরাজেশের ডায়লগ চোখে জল আনবেই। সঙ্গে অবশ্যই লামা হালদারমাসুদ আখতারলামা র অভিনয় মহঃ রফি কন্ঠী হয়ে গান গাওয়া চমৎকার। ক্যামেরার কাজ বেশ সুন্দর। পুরনো দিনের কিশোর কুমারের সব হিট হিট গান নতুন মিউজিক এরেঞ্জে এইচডিতে যদি শুনতে চান এ ছবি মন ভরাবে।

মন্দ – কিশোর কন্ঠীদের বিমানবন্দর থেকে আততায়ীরা কিডন্যাপ করে নিল ভারত সরকারের লোক সেজে। ভারত সরকারের পরিষেবা কি এত ঢিলেঢালা হয়? যেখানে তাঁদের আমন্ত্রিত শিল্পীকে সরকারের নাম ভাড়িয়ে ডাকাতরা ধরে নিয়ে গেল? কিরকম আজব কিছুটা।
Kishore Kumar Juniorকিশোর কন্ঠী দের গল্প তাই ছবির শুরুতেই গৌতম ঘোষের নাম উল্লেখ করেছেন পরিচালক। খুব ঠিক কাজ। কিন্তু এ ছবি কুমারশানু ময়। এমনকি ছবির শেষেও হাজির কুমার শানু। এ ছবির প্লেব্যাকে কিশোরের গলার মতো কুমার শানুর গলা লাগেনি। গৌতম ঘোষকে দিয়ে একটা গান গাওয়ানো হলে তাকে দেখানো হলে ছবির শেষে আরও এই কন্ঠী শিল্পীদের সম্মান জানানো হত। শুধু একটা নাম লিখেই কৃতজ্ঞতা দিয়ে ক্ষান্ত হওয়া কেন? এ হেন কিশোর ট্রিবিউটে অমিত কুমার কে দিয়ে কেন গাওয়ানো হলনা? গানগুলো তাহলে আরো শ্রুতিমধুর হত। ছবিটা কিশোর কন্ঠীর লড়াইয়ের গল্প থেকে চটজলদি কিডন্যাপিং র গল্পে সরে গেছে। কিশোর কন্ঠীর বৃত্ত দেখাতে ছবি সব উপাদান দিয়ে শেষ করা হয়েছে শেষ দৃশ্যে। কিন্তু পুরোপুরি কিশোর কন্ঠী সহ লতা আশা হেমন্ত কন্ঠীদের লড়াই দেখানো হল কই?

কিন্তু এন্টারটেনমেন্ট ভরপুর ছবি দেখতে হলে এ ছবি পুজো কার্নিভালে মাস্ট। একটা মন ভালো করা এফেক্ট আছে ছবিতে। কৌশিক গাঙ্গুলী বলেছেন ‘কিশোর কুমার জুনিয়র‘ তাঁর নতুন ছবি। একদম তাই। তাঁর ‘বিসর্জন’,’শব্দ’,’ওয়ারিশ‘ আর্ট ফিল্ম ফরম্যাট থেকে বেরিয়ে একদম হার্ডকোর কমার্শিয়াল ছবি বানিয়েছেন। যেখানে অহেতুক আঁতলামো নেই। সবার ভালো লাগার ছবি। সঞ্জয়লীলা বনশালী একদিকে যেমন ”হম দিল দে চুকে সনম’,’ দেবদাস’ বানাচ্ছেন অন্যদিকে ‘ব্ল্যাক’ বানিয়েছেন। একজন পরিচালকের নামে যাতে সব ক্লাস মাস এক হয় তাই এটা খুব দরকার। একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা সহ ভার্সেটাইল পরিচালকও তিনি, সেটাই কৌশিক গাঙ্গুলী প্রমাণ করে দিলেন।

Written By – শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়