এই সিনেমা অনেকের রাতের ঘুম কাড়তে চলেছে!

এরপর যদি এই কেস নিয়ে কেউ রিসার্চ করতে যায় একবার হলেও সিনেমাটা দেখবেন...

১১ই আগস্ট সকালবেলা,যথারীতি রোজকারদিনের মত প্রাতঃভ্রমণ সেরে এই চায়ের দোকানে পেপারটা হাতে নিয়ে কালুকে একটা লাল চা সঙ্গে দুটো মারি বিস্কুটের তলব করে জুত করে বসলেন পঞ্চাশের আশেপাশে বয়সী অনিমেষবাবু। লালের সাথে অবশ্য অনেক পুরনো সম্পর্ক ওনার, চা বাদেও রাজনৈতিক দিকেও কট্টর লালপন্থী হিসেবে পাড়াতে নাম আছে যদিও পালাবদলের কিছু আগে থেকে উদাসীনতাই ওনার রাজনীতি সম্পর্কে বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশের অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়, তবে মাঝে মধ্যেই পেপার পড়তে পড়তে বা চা’য়ের দোকানে অন্যায়ের প্রতিবাদে ভাষণ দিতে দুবার ভাবেন না কিন্তু লালের প্রসঙ্গ এলেই থমথমে হয়ে যান, একটা স্পষ্ট হতাশা বিরাজ করে চোখে-মুখে, আক্ষেপও হতে পারে কোনদিন তা স্পষ্ট করেন নি। সেদিন অবশ্য আলোচনা বা সমালোচনার প্রসঙ্গ ছিল ‘ধনঞ্জয়’ কারণ দোকানের সামনের দেওয়ালে পোস্টারে জুড়ে ধনঞ্জয় ওরফে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অসহায় মুখ আর তা নিয়ে নানা মানুষের নানা মত, ১৫ মিনিট পর মনে হচ্ছিল ওখানে চেয়ার-টেবিল আর কালো কোট থাকলে আরও একটা রায়ে শিলমোহর পড়ে যেত! উত্তেজনার চরম মুহূর্তে এক ফাজিল যুবক সহাস্যে বলে উঠলো, “করলে এনজয় আর ধরা পড়লে ধনঞ্জয়!”

তৎক্ষণাৎ বক্র দৃষ্টিতে অনিমেষবাবু তাকান ওর দিকে তারপর আমার দিকে একটা অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে বলে উঠলেন,”নাহ! আজ উঠি”…ওনার এই দৃষ্টির মানেটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট  কারণ জানেন আমি আজ দেখব সিনেমাটি এবং কাল হয়তো ওঁকে কোন সঠিক তথ্য দিতে পারব সিনেমাটি নিয়ে সেই আশায়…হালকা বৃষ্টি শুরু হল, আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে গেলেন অনিমেষবাবু…

নাহ, বিকেলে আর পাঁচটা দিনের মত বৃষ্টি হয় নি, তবে পরিবেশ থমথমে এবং আরও বেশী থমথমে শহরের এক নামী মলের প্রিমিয়ার শো’টা, সবাই যেন একটা দোটানায় অপেক্ষা করছে, প্রশ্ন একটাই, ‘এতোদিন যা জেনেছি, শুনেছি তা কি মিথ্যে?’। প্রথমেই পরিচালক শীল ঝটকা দিলেন ধনঞ্জয়ের শূন্যে ছটফট করা দুটো পা দেখিয়ে, কিছুক্ষণ পর তা নিথর হয়ে গেল আর সঙ্গে বিক্রম ঘোষের এক অদ্ভুত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ঠিক সুরেলা নয় কিন্তু একটা অস্বাভাবিক হাঁসফাঁস,ছটফটানি!

খুব যত্ন করে, রিসার্চ করে পরিচালক সাজিয়ে দিয়েছেন সমস্ত প্রশ্ন যা এই কেসটার ইনভেস্টিগেশন পদ্ধতিকে ফেলে দিল এক প্রশ্নের মুখে। মূলত এটা কোর্টরুম ড্রামা এবং সেই ঘটনাগুলো বলতে যেটুকু ভিসুয়্যাল দেওয়া যায় ততটুকুই দেওয়া হয়েছে, অহেতুক কোন শট নেই যেটা আপনার অপ্রাসঙ্গিক লাগতে পারে আর সব থেকে প্লাস পয়েন্ট হল কোর্টরুম ড্রামাতে যে কথার প্রাচুর্য থাকে, ভাষার মারপ্যাঁচ থাকে সেটা ফুলকো লুচির মত পরিবেশন করা হয় নি, প্রত্যকেটা ডায়লগ একদম নিখাদ, মেদহীন ও টু দ্যা পয়েন্ট, ক্রেডিট অবশ্যই পদ্মনাভ দাসগুপ্ত ও পরিচালকের। সিনেমার বিষয়বস্তু, প্রাসঙ্গিকতা সবকিছু পাশে রেখে তিনজনের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আলাদা করে বলতেই হবে, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, মিমি চক্রবর্তী ও সুদীপ্তা চক্রবর্তী।

একজন রাঢ় বাংলার কর্মঠ, দেহাতি মানুষের কথাবার্তা, চালচলন যেভাবে হওয়া উচিৎ ঠিক সেইভাবে নিজেকে তৈরি করেছেন অনির্বাণ, এক এক সময় মনে হচ্ছিল ধনঞ্জয়ই সত্যিই আমাদের সামনে, হয়তো এখনো ওঁকে বিচার দেওয়া সম্ভব যদিও নিয়তি কারুর জন্য দয়া করে না! উকিলের ভূমিকায় মিমি এবং প্রমান করে দিলেন ইন্ডাস্ট্রি যদি চায় এরকম আরও অনেক সাহসী চরিত্রে চমকে দিতে পারেন তিনি আর সুদীপ্তা চক্রবর্তী’র কাছে থাকবে একটাই বক্তব্য, হয়তো এমন কোন চরিত্র অবশিষ্ট নেই যেটাতে ওনার অভিনয় প্রানদান করতে পারে না!

এছাড়া কাঞ্চন মল্লিক, কৌশিক সেন, মীর, পরান বন্দ্যোপাধ্যায় সহ প্রত্যেকের অভিনয় ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য। ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট আপনাকে বসিয়ে রাখতে বাধ্য হবে কারণ কোথাও আপনার বিরক্ত লাগার কোন জায়গা নেই। ফিকশ্যানালাইজড ডকুমেন্টশন হলেও অসাধারন এডিটিং ও স্ক্রিন-প্লে’র জন্য সবসময় একটা সাসপেন্স আর আক্ষেপের মিশ্র অনুভূতি থাকবে পুরো সময় জুড়ে। তবে সিনেমা চলাকালীন যে সিনে ধনঞ্জয়ের বাবা নিজেদের অসহায়তার কথা বলছেন কাব্য সিনহাদের, সেই সময় ধনঞ্জয়ের বাবার পেছনে দাঁড়ানো পরিবারের কোন সদস্যা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান, পেছনের সিটে বসা দুই ভদ্রমহিলা খিল খিল করে হেসে ওঠেন ওইভাবে পড়ে যাওয়ার ধরণ দেখে! ভীষণ বিরক্ত এবং অবাকও লাগলো এইধরণের মানসিকতার মানুষজন আমাদের সমাজে আছে বলেই হয়ত ধনঞ্জয় ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে বলে যেতে পারল,

“আমি গরীব, শুধু সেইজন্য আমার ফাঁসি হচ্ছে!”

এই সত্যি বলার সাহসের জন্য কুর্নিশ জানাতেই হয় পরিচালক অরিন্দম শীল সহ পুরো টিমকে এবং এরপর যদি এই কেস নিয়ে কেউ রিসার্চ করতে যায় একবার হলেও সিনেমাটা দেখবেন… হল ছাড়ার সময় একটা কথা মনে হল, পেহলাজবাবু একটা ভাল কাজ করে গেলেন ধনঞ্জয়ের সেন্সর করে!

১২ই আগস্ট সকাল বেলা এক জায়গা, একই চা’য়ের দোকান। অনিমেষবাবু ঢুকেই প্রথমেই তাকালেন আমার দিকে অবশ্যই চোখে মুখে একটাই প্রশ্ন, “কে বুঝলে?”। পরিষ্কার ভাষায় বললাম, “সবকিছু দেখে শুনে আপনার ভাল নাও লাগতে পারে কারণ সেইসময়ের রাজনৈতিক চাপের কথাও আছে!” খানিকটা মনমরা হয়ে করুণ নয়নে তাকিয়ে থাকলেন আর দু’কাপ লাল চা নিয়ে একটা আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, “আমি টিকিট কেটেই দেখব, কিছুটা বলো মানে কিভাবে পুরো ব্যাপারটা দেখালো?” অগত্যা কিছু কিছু তথ্য, প্রমানগুলো নিয়ে যা যা বক্তব্য, রাজনীতি-সমাজ-মিডিয়ার চাপ সব শুনেটুনে প্রথমেই যেটা করলেন আমার মোবাইল থেকে নিজের একটা টিকিট কাটলেন (আপনারও টিকিট কাটতে চাইলে ক্লিক করুন) বিকেলের শো’য়ের আর রাজনীতির প্রসঙ্গে যে মানুষটা উদাসীন হয়ে যান সেই মানুষটার ঠোঁটে একটা অদ্ভুত হাসি, লাল চা’তে শেষ সুড়কি টানটা দিয়েই কাগজটা ভাঁজ করতে করতে বলে গেলেন, ” আলবাত দেখতে হবে এই সিনেমা, এবার তো অনেকের রাতের ঘুম কাড়তে চলেছে এই সিনেমা!”…… যেন চোখে-মুখে একটা জয়ের ছাপ, আবার বৃষ্টি শুরু হল আর ক্রমশ ঝাপসা হয়ে গেলো অনিমেষবাবুর পা’দুটো…