ছেলেটার বয়স ১৪ কি ১৫! ভয় ছিল “চ্যাম্প” রিমেক নয় তো?

চিরাচরিত আইটেম নাম্বার, হিরোর এক ঘুষিতে ভিলেনের আকাশ-ভ্রমন ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে এসে এ যেন দেবের “পাগলু-মোচন”।


Movie : Chaamp
Directed by : Raj Chakraborty
Starring : Dev, Rukmini Maitra, Priyanka Sarkar, Chiranjeet, Laboni Sarkar
Music by : Jeet Gannguli, Raftaar, Anupam Roy
Language : Bengali
Rating : 3.5/5


মধ্য কলকাতার এক বিখ্যাত সিঙ্গেল স্ক্রিন, ২৪ তারিখ রাতের শেষ শো’র স্লট পেয়েছে দেবের প্রথম সন্তান “চ্যাম্প”। খানিক আগেই ঘণ্টা বাজিয়ে “টিউবলাইট”র কানেকশেন কাটার পর হল থেকে বেরনো মানুষগুলোর চোখ-মুখ বলছে, চোখে বা মনে কোথাও টিউবের আলো সেভাবে পড়ে নি, অন্ধকারে হাতড়ে গেছেন ২ ঘণ্টা! বেরিয়ে আসার পর হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো এক মধ্যবয়স্ক দম্পতি, তাঁদের কথোপকথনটা ঠিক এইরকম –

 – “কাল তো ছুটি, চ্যাম্পটা দেখে নিই?”

 – “সব খারাপ কাজগুলো কি একদিনেই করবে?”

 – “আরে চলোই না! কি হবে? আর যাই হোক বাংলা সিনেমা তো !”

মজাদার এই কথোপকথনে বিরতি পড়তে বাধ্য হলো কারন পাশে দাঁড়িয়ে দুটি কচি ছেলে, সম্ভবত ঈদের উপহারস্বরূপ আদায় করেছে ‘চ্যাম্প’র দুটো টিকিট, ছেলেটার বয়স কত আর হবে ১৪ কি ১৫! সিনেমার চরম বোদ্ধার মত মাথা নাড়িয়ে পাশের বন্ধুকে বলছে, “নিয়ে তো এলি, এটা আবার কোন রিমেক নয় তো?” ওপাশ থেকে আসা উত্তরটা চাপা পড়ে গেলো সিনেমা শুরুর ঘণ্টার আওয়াজে।

প্রসঙ্গত সামনের সিটে সেই দম্পতি পপকর্ন হাতে বিরাজমান! গোটা সিনেমার কোলাজ দিয়েই শুরু হোল ছোট্ট শিবাজির উত্থান কাহিনী। পুরুলিয়ার কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামের অভাব অনটনে মানুষ হওয়া ছোট্ট শিবাজি ডাস্টবিন থেকে খাবার খুঁজতে গিয়ে কুড়িয়ে পায় বক্সিং গ্লাভস আর দেখতে পায় বাড়ির পাশে মুদির দোকানের সাদা-কালো টিভিতে গুরুদেব মহম্মদ আলির বক্সিং! ব্যস ছোট্ট শিবাজির মাথায় ঢুকে যায় বড় হয়ে কি হতে চলছে, সেই সাধনাতে মগ্ন ছোট্ট শিবাজি ডুব দেয় গ্রামের পুকুরে আর জাম্প কাটে বেরিয়ে আসে শিবাজি (দেব), সাদর অভ্যর্থনা পায় হলের হাততালি আর সিটি দিয়ে! এরপরই শিবাজি পায় তার শিক্ষাগুরু বুড়োদা (চিরঞ্জিত) কে, যার হাত ধরে সে প্রথমবার আসে কলকাতায় আর সঙ্গে পায় একজন অন্ধভক্ত বুড়োদা’র বোন  সাথী (প্রিয়াঙ্কা সরকার) কে, যে নিজের সোনার হার বিক্রি করে কিনে নিয়ে আসে বক্সিং গ্লাভস শিবাজির জন্য! এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এগিয়ে যায় শিবাজির ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গল্প। গল্পের প্রত্যেক মোড়ে মেলে বেশ কয়েকটি চরিত্র, তাঁদের মধ্যে কমলেশ্বর মুখার্জি, পদ্মনাভ দাসগুপ্ত বেশ নজর কেড়েছেন। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা এই সিনেমা মনে করায় যে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে থাকেন একজন নারী! এই আপ্তবাক্য এখানে ভীষণ স্পষ্ট, শিবাজি’র জীবনেও দুজন নারী কখনো হাঁসিয়েছেন আবার কখনো কাঁদিয়েছেন, একজন শিবাজির মা (লাবণী সরকার)স্ত্রী জয়া (রুক্মিণী)। প্রথম সিনেমায় বেশ পরিনত অভিনয় করলেন রুক্মিণী এবং এই জুটি যে আরও বেশ কিছু মনে রাখার মত ইনিংস খেলবে বোঝা যাচ্ছে!

ইমোশেন, রোমান্স, অ্যাকশেন, ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই সেটা মানসিক ও শারীরিক দুই ভাবে, সব কিছু নিয়ে ‘চ্যাম্প’ অনেক ফিট এই সময়ের বাংলার নতুন সিনেমার উদাহারন হিসেবে! পরিচালক হিসেবে রাজ চক্রবর্তী এই সিনেমায় কিন্তু বেশ হাত খুলে ব্যাটিং করেছেন, সিনেমা কমার্শিয়াল হলেও রেখেছেন বাস্তবতার ছোঁয়া, যেটা এই মুহূর্তে মেন স্ট্রিম বাংলা সিনেমার জন্য খুবই প্রয়োজন। তবে স্ক্রিপ্টে কিছু কিছু জায়গায় আরও যত্নবান হলে ভালো হত, যেমন শিবাজির উত্থান কাহিনী যেন হঠাৎ করে হয়ে গেলো কোন বাধা ছাড়াই!

চিরাচরিত আইটেম নাম্বার, হিরোর এক ঘুষিতে ভিলেনের আকাশ-ভ্রমন ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে এসে এ যেন দেবের “পাগলু-মোচন”

অনেক বাধা বিপত্তি কাটিয়ে জীবন যুদ্ধে ও বক্সিং রিং-এ শিবাজি জিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত ওপরে তুলতেই আবার বেজে উঠলো শো শেষের ঘণ্টা! সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পাশ দিয়ে যাওয়া সেই বাচ্চা ছেলেটির বিজ্ঞের মত বলে উঠলো, ”হুম এই গল্প আগে তো দেখি নি! দেবের পরের সিনেমা কি আছে রে?” বোঝা গেলো আর যাই হোক দেবের ফ্যান তালিকায় ঢুকে পড়লো এই খুদেটিও! হলের সামনে সুখটান দেওয়ার সময় ধোঁয়ার মাঝেই অদূরে ভেসে এলো সেই দম্পতির টুকরো একটা কথা, “কালকে রথ, ও বাড়ি থেকে মা কে নিয়ে আসবে কিন্তু! এই বছর একসাথে রথ দেখবো”…… ঝড়, জল মাথায় নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ‘টিউবলাইট’কে উপেক্ষা করেই ভিড় বাড়ছে হলগুলোর সামনে…

আবার জয় হোল বাংলা সিনেমার, যেন হলের সামনের কাট-আউটে শিবাজির চওড়া হাসি জানান দিচ্ছে এই যুদ্ধে অনেকটাই এগিয়ে গেলো বাংলা সিনেমা, নেপথ্যে অবশ্যই দেব!