‘বাজে ছবি’ নাকি!

মানুষের মন বৈচিত্র্যময়, বিচিত্র তার রুচি, তার ভালোলাগা-মন্দলাগা। তাই এই বাজে ছবি বা ভালো ছবির সর্বসম্মত কোন সংজ্ঞা বোধহয় হতে পারে না। সেকথাই নেপথ্য বলতে চাইলেন পরিচালক অনির্বান পাড়িয়া, তাঁর "বাজে ছবি"তে।

“বাজে ছবি”– আসলে যে কোনটা যে বাজে আর কোনটা যে ভালো, তার মাপকাঠিটা আমাদের এই তথাকথিত সুশিক্ষিত, সুমার্জিত সমাজ আজও ঠিকমত ঠিক করে উঠতে পারলো না। গুনের বিচার কি হবে জনপ্রিয়তার নিরিখে ? নাকি গুনই হবে জনপ্রিয়তার একমাত্র শর্ত ? মানুষের মন বৈচিত্র্যময়, বিচিত্র তার রুচি, তার ভালোলাগা-মন্দলাগা। তাই এই বাজে ছবি বা ভালো ছবির সর্বসম্মত কোন সংজ্ঞা বোধহয় হতে পারে না। সেকথাই নেপথ্য বলতে চাইলেন পরিচালক অনির্বান পাড়িয়া, তাঁর “বাজে ছবি”তে।

জটিল কাহিনীবিন্যাসে রয়েছে ঘটনার ঘনঘটা । প্রেম থেকে প্রেমভাঙা, বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের ইশারা ছুঁয়ে ধরা পড়েছে অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক । সম্পর্কের টানাপোড়নে বারবার তার ছিঁড়ে যাওয়া, আবার নতুন করে জোড়া লাগানোর চেষ্টা, তারই মধ্যে থেকে উঠে আসে সম্পর্ক ও সম্পর্ক-বহির্ভূত নতুন নতুন রসায়ন । হতাশা, অনুপ্রেরণা, প্রত্যাশা, প্রত্যাশা পূরণ ও ভঙ্গের মধ্যে দিয়ে কাহিনী যত এগিয়েছে, ততই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে । এরই মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রূপা বৌদির (অনিন্দিতা) টুকরো টুকরো কমিক রিলিফ।

দেবুদা‘র ভূমিকায় দেখা গেলো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে, হতাশাকে কাটিয়ে উঠে, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ আপ্তবাক্যকে মনে রেখে মাটি আঁকড়ে লড়াই করার প্রেরনা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেছে, যা মনে করায় মুক্তধারায় ধনঞ্জয় বৈরাগীর সেই গান, ‘তোর শিকল মোরে বিকল করবে না/ তোর মারে মরম মরবে না’।

ছবিতে দেখা যায় যে প্রতিভা কিংবা গুনের থেকে বড় হয়ে ওঠে প্রাত্যহিক চাহিদা। ছবিতে পরিচালক অভীকের (কৌশিক সেন) স্ত্রী রঞ্জনার (প্রিয়াঙ্কা সরকার) কাছে প্রকৃত অর্থ ঢাকা পড়ে যায় কাগুজে অর্থের স্তূপে। তবুও অভীক প্রাত্যহিক চাহিদার ঊর্দ্ধে নান্দনিক উৎকর্ষকে জায়গা দেয়। আপোষ করে না প্রযোজকের সঙ্গে। আবার, এই আপোষ না করার আরেক প্রতিনিধি হিসেবে বারবার ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় অভীকের বাবা চিত্রশিল্পী অজয়কে (শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়)। পারিপার্শ্বিক কেজো মানুষের চাপের কাছে এই ধরনের সৃষ্টিশীল কিন্তু অকাজের মানুষগুলো যে অসহায় হয়ে পড়ে, কোন কিছু বলার ভাষা হারায়, তারই কাহিনী ‘বাজে ছবি’।

দেখুন ট্রেলার :

ছবিটিকে একটি অন্যমাত্রা এবং চাঞ্চল্যের গতিশীলতা দিয়েছে রঞ্জনা এবং অনীকের (দেবদূত ঘোষ) তথাকথিত বন্ধুত্বের সম্পর্ক, যা ক্রমে বন্ধুত্বের সীমানা অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়ে পড়ে বন্ধুত্ব বহির্ভুত এক সম্পর্কের জটিলতায় এবং অভীক-রঞ্জনা-অনীকের সম্পর্ক ত্রিকোণে আবর্তিত হতে হতে গল্পের কাহিনীটি এগিয়ে যায় একটি আশাবাদী পরিনামের দিকে, যে আশাবাদ মনে করায়-

“যাহার লাগি চক্ষু বুজে/ বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর/ তাহারে বাদ দিয়েও দেখি/ বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর”

তবে হ্যাঁ, ‘বাজে ছবি’ সম্পর্কে যে কথাগুলো না বললেই নয়ঃ ক্যামেরার কাজ দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে চল্লিশের আগেই চালসে এলো নাকি! ছবিটির একটি দৃশ্য যে প্রশ্ন রেখে যায়- চিত্রশিল্পী অজয় কি এতোটাই উদাসীন যে, পুকুর পাড়ে বসে ছবি বিক্রি করেন? ছবির সম্পদনার কাজ দেখে মনে হয়েছে সদ্য প্রতন্ত্য গ্রাম থেকে আসা কোন কিশোরকে হঠাৎ কলকাতার রাস্তায় একা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, না বুঝেই সে একবার এদিক যাচ্ছে তো একবার ওদিক যাচ্ছে! কিন্তু এর পরেও সম্পদনার যে ছোট্ট কাজটি হঠাৎই নজর কাড়ে সেটি হোল-অসামান্য নস্টালজিক ভাবে দুই প্রজন্মকে এক করে দেওয়া হয়েছে ধূমপানের একটি কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যে।

প্রযোজক শ্রীরাম মিত্তলের একটি ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য, এই ধরনের ব্যতিক্রমী একটি ছবি প্রযোজনা করার সাহস দেখানোর জন্য!

REVIEW OVERVIEW
Baje Chobi : Movie Review