সিনেমা দেখে বেরনো এক বাচ্চার প্রশ্নবানে জেরবার তার মা!

Movie : Amazon Obhijaan
Directed by : Kamaleswar Mukherjee
Starring : Dev, Laboni Sarkar, David James, Svetlana Gulokava
Music by : Indradeep Dasgupta
Language : Bengali
Rating : 3.5/5


গত সন্ধ্যেতে লর্ডস মোড় পেরনোর পর আস্তে আস্তে নবীনা সিনেমাহলের দিকে এগোতেই সব সাইজের চাকাগুলোর গতি স্লথ হয়ে যাচ্ছিল কারণ হলের ঢোকার মুখে তখন শ’তিনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে শঙ্কররূপী দেব’কে একঝলক দেখবে বলে! ভিড় ঠেলে কোনমতে ঢুকতেই এক মুহূর্তের জন্য হলেও মনে হবে আপনি কলকাতার বুকে এক টুকরো আমাজনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন! ঢোকার রাস্তার পাশে সার দিয়ে এলিডিতে চলছে আমাজনের জঙ্গলের ফুটেজ, বোঝা যাচ্ছিল এসভিএফ টিম বাংলার সবথেকে বড় বাজেটের সিনেমার সেলিব্রেশনে কোনরকম খামতি রাখে নি।

জন সমুদ্রের মাঝে পছন্দমত সিটে বসার অভিযান শেষ করতেই আবিষ্কার করলাম পাশেই এক বাচ্চা গুছিয়ে বসেছে অভিযানের সাক্ষী হওয়ার জন্য, হলের আলো-আঁধারিতে ততক্ষনে শুরু হয়ে গেছে এই গল্পে শঙ্করকে নিয়ে ওর ব্যক্তিগত অভিমতের অভিযান মানে কি হবে, কি দেখবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ওর মা অবশ্য মাঝে মাঝেই উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন অমুক পশু’কে দেখা যাবে তমুক পশু’কে দেখা যাবে বলে…উৎসাহের চরম পর্যায়ে অন্ধকার হলের ঝকঝকে স্ক্রিনে একাধিক ব্ল্যাক প্যান্থারের আক্রমন ও কয়েকশো দর্শকের হাততালি নিয়ে এন্ট্রি নিলেন সাহসী শঙ্কর! শুরু হল বিভূতিভূষণের তৈরি চরিত্র নিয়ে পরিচালক কমলেশ্বর মুখার্জি’র নিজস্ব গল্প।

আপনাদের গল্প নিয়ে বিশেষ কিছুই বলব না কারণ ওটা হলে গিয়ে দেখাটাই বাঞ্ছনীয়। যে ব্যাপারগুলো অবশ্যই শেয়ার করা দরকার আপনাদের সাথে তার মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম হল ভিস্যুয়াল, আমাজনের ভয়ংকর সুন্দর প্রকৃতিকে এভাবে বাংলা সিনেমার ক্যামেরায় ধরা যায় তা প্রমান করে দিলেন সৌমিক হালদার। ন্যূনতম রিসোর্স এবং বড় একটা রিস্ক ফ্যাক্টর নিয়ে এই স্কেলে শুট করে আসার জন্য অনেক সাধুবাদ প্রাপ্য টিম কমলেশ্বরের। এছাড়াও পরিচালক মুখার্জি অবশ্যই সাধুবাদ পাবেন গল্পের চরিত্রবিন্যাসে, যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন এবং কাস্টিংএ অ্যানা ফ্লোরিয়ানের জন্য শ্বেতালেনা’কে নির্বাচন অনেক সাহায্য করেছে গল্পটাকে, সত্যি বাচ্চা মেয়েদের হিরো-আইডল হতে পারে অ্যানা। কিছু জায়গায় ভীষণ বুদ্ধিমত্ত্বার সাথে খেলেছেন পরিচালক, বেশ কিছু কঠিন কঠিন অ্যাকশেন টাইমে একদম ক্লোজে ক্যামেরা নিয়ে যান নি, সেটা অস্বাভাবিক না লাগলেও যেহেতু এটা অনেকটা লার্জার দেন লাইফ গল্প তাই ঐ সমস্ত জায়গাগুলোতে আরও নাটকীয় করা যেত।

এর মাঝে অবশ্য সিনেমার ফার্স্ট হাফ শেষের লাইট জ্বলতেই পেছনের বাচ্চাটা দেখি সামনে চলে এসেছে, চোখে-মুখে স্পষ্ট হিংস্র জন্তুগুলো’র সাথে শঙ্করের লড়াই বেশ মনে ধরেছে! ‘আমাজন অভিযান’র ভিএফএক্স নিয়ে সবারই প্রশ্ন ছিল যে কতোটা উন্নত হয়েছে সেক্ষেত্রে একটা কথা বলা যেতে পারে, বুনিপ নিয়ে যারা চূড়ান্ত রসিকতা করেছিলেন তারা একটু হলেও আশাহত হবেন কারণ এই টাকাতে যেভাবে কাজ করা হয়েছে তাতে একদম অবিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে যাবে না অ্যানাকোন্ডা বা টরেন্টুলারা! আরেকটা আশঙ্কা ছিল এখানে শঙ্করের প্রেম না হয়ে যায় অ্যানা’র সাথে, চিত্রনাট্যের স্বার্থে নির্মম হয়েছেন পরিচালক এটা খুব ভালো দিক, তবে সিনেমার মাঝে ধারাভাষ্যটা অন্যভাবেও ভাবতে পারতেন পরিচালক। আমাজনের দুর্গম জঙ্গলে শঙ্কর তথা দেব অভিনেতা হিসেবে যথেষ্ট হিংস্র! প্রত্যেকটা ফ্রেমে দেবের চেষ্টা, পরিশ্রমটা বোঝা যাচ্ছিল।

বাংলায় বসে এরকম একটা দুঃসাহসিক চিন্তাভাবনা করার জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ পাবে এসভিএফ এবং পুরো আমাজন টিম, বাংলা সিনেমার রূপকথার গল্প এভাবেই শুরু হোক!  আপনারা কেউ যদি বাড়ির বাচ্চাদের ভুল করে না নিয়ে এসে আসেন তবে আফসোস করবেনই কারণ এটা আদ্যপান্ত বাচ্চাদের সিনেমা। নতুন বছরের শুরুতে বাড়ির বাচ্চাদের জন্য এর থেকে সেরা গিফট আর কিছু হতে পারে না!

২ ঘণ্টা ২৫ মিনিটের রূপকথার অভিযানের পর হলের লাইট জ্বলতেই হাততালিতে ভরে গেল গোটা হল কারণ যে সাহসটা আজ বাংলা সিনেমা দেখিয়েছে সেটা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই! আমাজন থেকে একরাশ অক্সিজেন নিয়ে পার্কিং লটে আসতেই দেখি সেই বাচ্চাটার ‘সোনার দেশ’ সত্যি আছে কিনা? সেখানে কি হয়, কে থাকে ইত্যাদি প্রশ্নের মুখে রীতিমত জেরবার মা’য়ের আকুতি, “বাবা, এবার তো বেরো সিনেমাটা থেকে…ওটা সিনেমা রে!” বিস্ফোরিত সরল চোখদুটো তখনও বিশ্বাস করতে চাইছে না তার মা’য়ের কথাগুলো…!