স্বপ্নের দিনে জীবন ছড়িয়ে রেখে চলে গেলেন মৃণাল সেন !

মৃণাল

শহরে তখন বড়দিনের ভীষণ রোশনাই। চারিদিক ঝলমল করছে। কোনো কারণ ছাড়াই পার্কস্ট্রীটে খানিক ঘুরে বেড়াচ্ছি, দুপুরবেলার শীতের আদুরে রদ্দুরে কোলকাতা বড় সুন্দর লাগছিল। হঠাৎই খবর উড়ে এল কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী চলে গেছেন। সেদিন মনে মনে জেনেছিলুম এমন বড় কবির চলে যাওয়ার জন্য যেন বড়দিন-ই যথাযোগ্য দিন ছিল। বছরটা শেষ হয়ে আসছে। হাতে আর একটা মাত্র খুচরো দিন। আঘাত যে আবারো নেমে আসতে পারে, কে ভেবেছিল। রবিবারের বেহায়া সুন্দর সকাল, তারিখ তিরিশে ডিসেম্বর, দুহাজার আঠেরো। ডিসেম্বর স্বার্থপরের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর কোলকাতা নতুনকে বরণ করে নিতে নিত্য সেজে উঠছে, এই এত প্রস্তুতির মধ্যে কে ভেবেছিল মৃণাল সেন আর থাকবেন না। এ যেন সেই শেষ উইকেটটা পড়ে যাওয়ার মতো। ঋত্বিক, সত্যজিত আর এই আজ মৃণাল, মানুষের আশা ভরসার আকাশটাকে গোহারা হারিয়ে দিল বছরটা। সময় যখন নেয়, মেপে ওজন করে দামী জিনিসটাই তো নেবে। পঁচানব্বই বছরের এক দীর্ঘ জীবনের আকাশ পেয়েছেন মৃণাল সেন

অনেক সিনেমার পরিচালনা, অসংখ্য পুরষ্কার, আর বেশ কিছু বই। জীবনের আকাশে প্রাপ্তির ঘর যেন ভর্তি। তাও আমাদের কেমন যেন ভাবতে অসুবিধা হয়। মনে পড়ে যায় ভুবন সোমের কথা। জীবনের একঘেয়েমি থেকে একটু ছুটি নেওয়ার স্বপ্ন বাঙালি কী দেখতে পারত, আদরের ভুবন সোম না থাকলে! আকালের সন্ধানের প্রথম দৃশ্যে সেই যে দুটি গাড়ি বাঙলার ধানক্ষেত চিরে কোন এক অজানাতে যেন এগিয়ে চলেছে, আবহে সলিল চৌধুরীর গান,‘হেই সামালো ধান গো‘…এ যেন এই সেদিন দেখা দৃশ্য। বাঙালি ভুলতে পারবে না যে। একদিন প্রতিদিনের সেই কলতলার দৃশ্য মনে পড়ে যায়, লম্বা লাইনে নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নিস্পাপ অথচ লড়াকু অপেক্ষা, কোলকাতার লড়াই করে বাঁচা মানুষ গুলোর এত জীবন্ত ছবি আর যেন দেখে উঠতে পারবে না বাঙালি। কোলকাতা একাত্তরের সেই এনকাউন্টারের দৃশ্য মনে পড়ে। ক্যামেরা কাঁপছে, উত্তেজনার কী তীক্ষ্ণ প্রদর্শন! কেমন যেন একটা অভিমান দানা বেঁধে ওঠে মনে, কেমন যেন ভাবতে ইচ্ছে করে, বয়স যতই বাড়ুক, মৃণাল সেনের যেন চলে যাওয়ার কথা ছিল না। দাদা সাহেব ফালকে, পদ্মভূষণ, ষোল টা জাতীয় পুরষ্কার, এই সব কিছুর উপরে গিয়ে একটা যেন দারুণ অভাব এসে ধাক্কা দেয় বছরশেষে। কাছের মানুষ হারিয়ে যাওয়ার বেদনা তো এমনই হয়। এই ডিসেম্বর অনেক কিছু নিল, বছর শেষ হয়ে আসছে, মৃণাল সেনের চলে যাওয়া বাঙলা ছবির জগতে এক কালো দিন, এই আঁধারের পর আরো আঘাত যেন না আসে, ক্ষুদ্র মানুষ এর বেশি আর কী বা চাইতে পারে। নতুন বছরের নতুন সূর্যে যেন এই ক্ষতের একটু উপশম হয়।