বর্ষশেষের রাতে রাতপরীদের রূপকথা !

সত্তর

বছর শেষের রাত। পার্ক স্ট্রীট সেজে ওঠে আজও মায়াবী আলোয়। জনতার ঢল নামে, নাইটক্লাবের ডান্স ফ্লোর মেতে ওঠে ডিজে র তালেতালে। কিন্তু ষাট সত্তর দশকের এই সাহেব পাড়ার সঙ্গে আজকের পার্ক স্ট্রীটের হাজার গুন তফাৎ। তফাৎ আভিজাত্যে, তফাৎ সতন্ত্রতার, তফাৎ কালচারের।

ডান্স ফ্লোর এ সময় মেতে উঠত রুশ আমেরিকান ডান্সারদের নৃত্যে। প্রথম বাঙালী ক্যাবারে ডান্সার রূপে এলেন জয় করলেন মিস শেফালী। ষাটের শেষ সত্তর জুড়ে শেফালি যুগ। এরআগে কোনো বাঙালী মহিলা এত সাহসীনি কিংবা এত পারদর্শিনী ছিলেন না হোটেলের ক্যাবারে হবার মতো। সতেরোটি ডান্স ফর্ম শিখে শেফালি হয়ে ওঠেন কলকাতার হেলেন। হেলেন বললে তাঁকে অত্যুক্তি করা হয় তিনি সন্ধ্যা রাতের শেফালি শেফালির গল্পে আবার পরে আসছি। শেফালি কে অনুসরণ করে একে একে আরো বাঙালী ক্যাবারে গার্ল এলেন যারা শেফালির সমসাময়িক। এদের কিন্তু বাবা মা র দেওয়া একটা নাম আছে থাকত সবার। সেটাই ওঁদের অফিসিয়াল নাম কিন্তু ডান্স ফ্লোরে নামত ওরা মিস … নামে। নামত বললাম কারন বাঙালী সমাজ তখন মিস দের নীঁচু চোখে দেখত। কিন্তু গোপনে তাঁদের স্পর্শ করতে চেয়েছে কত কত পুরুষ।

যেমন মিস জে। আসল নাম জয়শ্রী সরকার। মিস শেফালী র আসল নাম আরতি দাস।তখন গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে নাচছেন মিস জে। ওদিকে ওবেরয় গ্র্যান্ডে মিস শেফালি। এসময় ক্যাবারেরা মঞ্চেও নাটক থিয়েটারে চলে আসে। শেফালিকে যেমন মঞ্চে এনেছিলেন তরুন কুমার। সম্রাট ও সুন্দরী,চৌরঙ্গী প্রভৃতি নাটকে শেফালির ছবি সবচেয়ে বড় করে থাকত। যেমন চৌরঙ্গী নাটকে শেফালিই মুখ্য আকর্ষন, টলি স্টাররা থাকলেও। তবে বিশ্বরূপায় চৌরঙ্গীতে কনি-র রোলের জন্য প্রথম ডাকা হয় মিস জে-কে। বিশ্বরূপার মালিক রাসবিহারী সরকার জয়শ্রী নামটা ছেঁটেকেটে মিস জে করে দিলেন। কিন্তু রোলটা পরে করেন শেফালি। বম্বের হোটেল বিশ্বরূপার চেয়ে তিন গুন বেশী টাকা অফার করায় মিস জে বম্বে চলে যান।এরকম আরও বাঙালী ক্যাবারে গার্ল যেমন মিস মণিকা, মিস রূপালী ,মিস মিতা।সত্তরের শেষ অবধি কলকাতায় চুড়ান্ত ক্যাবারে দের জনপ্রিয়তা ছিল। হোটেল থেকে বাঙালীর পাবলিক থিয়েটারে নেমে এল ক্যাবারে রা মিস জে, মিস শেফালি দের থিয়েটারে দেখতেই লোক আসত। ওঁদের নাচ হয়ে গেলে হল ফাঁকা হয়ে যেত। চলচ্চিত্রেও তখন তাঁদের চাহিদা ব্যাপক।উত্তম কুমার সত্যজিৎ রায় যার নাচের আকর্ষনে ছুটে যেতেন ফিরপোজ হোটেল। যা এখন শ্রীরাম আর্কেড শপিং মল। সুচিত্রা সেন , সুপ্রিয়া দেবীদের স্নেহধন্যা শেফালি।

সেসময়ের পার্কস্ট্রীট , নিউ মার্কেট চত্বরে তখন সাহেবী ছোঁওয়া। সাহেব , মেম কিংবা অভিজাত বাঙালীদের শুধু যাতায়াত এই নাইট ক্লাব গুলোয়। আমরা অনেকেই দেখি সিনেমায় ক্যাবারে নাচ সিকোয়েন্সে আশা ভোঁসলে গাইছেন হেলেন কিংবা বিন্দু , জয়শ্রী টি নাচছেন। কিন্তু আদতে তা হতনা। অভিজাত নাইট ক্লাবে শুধু মিউজিকের ওপর মিস শেফালি, মিস জে দের নাচতে হত।আজকাল যে হিন্দি রিমিক্স গানের ডি জে হয় থার্টি ফার্স্ট মানেই। আগে এত হালকা চালের মাস্তি ছিলনা। এখনকার নাইট ক্লাবের আইরিশ মনিপুরী চীনা ক্যাবারে দের পোশাক প্রায় নগ্ন। কিন্তু আগেকার ক্যাবারে গার্লরা বডিবেস কালার কাপড়ের আবরন আবৃতা থাকতেন মনে হত নগ্ন উরু পেট বুক কিন্তু তা আসলে আবৃত। শৈল্পিক দিকটাই আগে ভাবা হত অশ্লীলতা নয়। অভিজাত কালচার ছিল নাইট ক্লাব গুলোর। এত সস্তা ছিলনা সেখানে যে কারুর প্রবেশ অবাধ ছিলনা। কি সেখানকার পরিবেশ।

আশির দশক থেকে পট পরিবর্তন হতে থাকল ক্যাবারে দের। ছবিতে রইল ওঁদের জনপ্রিয়তা কিন্তু নাইট ক্লাব গুলোই কমতে লাগল। কয়েকবার তো অশ্লীলতার দায়ে বিভিন্ন পেশাদারী মঞ্চ থেকে ওদের নাটক নাচ বন্ধ করে দেওয়া হত। তবু চলত। আশির দশকের শেষার্ধ্বে শেষ হল ক্যাবারে যুগ। মিস শেফালি মিস জে দের বেছে নিতে হল অন্তরাল। নব্বই দশকের শুরুর দিকে ওরা কিছু নাচের চটুল নাটক করত সারকারিনা য়। সেসব নাটকে এডাল্ট মার্ক থাকত। কিন্তু সেই অভিজাত ধণী পরিবেশ শেষ হয়ে গেল। নাইট ক্লাব গুলো তে উড়তি যুবক যুবতীদের ভিড় বাড়ল নিম্নবিত্ত পরিবার থেকেও। সেই উচ্চবিত্ত হাই স্টেটাস হারালো। সারকারিনা র মতো পুরনো থিয়েটার হল বন্ধ হয়ে গেল ডি জে আধিপত্য গ্রাস করল। বলিউডি রিমিক্স গান আর উদ্দাম নাচ কিছু শরীর প্রদর্শন নাচ আলো আঁধারিতে মধুচক্র এসব হয়ে দাড়াল।আজো পার্ক স্ট্রীটের পাব গুলোয় ভীড় হয় কিন্তু মিস দের আর কেউ মিস করেননা।

বর্ষশেষের আলোকময় রাত গুলো আজ শুধুই অতীত ওঁদের কাছে। ঝলমলে ড্রেস গুলো রয়ে গেছে কিছু স্মৃতি হিসেবে। বার্ধক্যে সেগুলোই যৌবনের স্মৃতি। স্মৃতি টুকু থাক নিয়েই মিস রা বেঁচে আছেন অভাবে,কেউ বা গত হয়েছেন। পার্ক স্ট্রীট দিয়ে কত জল বয়ে গেল, কত ইতিহাস ঐ চৌরঙ্গী তে কত রাতপরীর রূপকথা আজও খুঁজলে পাওয়া যাবে চৌরঙ্গীর আনাচে কানাচে।