সুপ্রিয়া নাকি ঘর ভেঙেছে মহানায়কের ! কিন্তু উত্তমের লেখা এই চিঠি … কি সেই কথা বলে?

সুপ্রিয়া উত্তম
সুপ্রিয়া দেবী আমাদের ছোটোবেলার নিষিদ্ধ রমণী কিন্তু বড় আদরের বড় প্রিয় আমাদের নস্টালজিয়া। সুপ্রিয়া মানেই যেমন সেক্স সিম্বল তেমনি সুপ্রিয়া মানে ঢাকাই শাড়ি কপালে বড় সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে চওড়া সিঁদূর, সোনায় মোড়া গা, বড় নাকছাবি, আঁচলে চাবির গোছা। তেমনি সুপ্রিয়া মানে ঘিয়ে গরদে জননী-র মতো এক বিধবার দাপট। যেন এক কমপ্লিট ওম্যান সুপ্রিয়া। যে আজীবন বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় অশ্লীলতার দায়ে ‘বিষ কন্যা’।সুপ্রিয়া দেবী
সুপ্রিয়া মহানায়ক কে যে উজাড় করা ভালোবাসা দিয়েছিল তাই কিন্তু মহানায়ক কে বাঁচিয়ে রেখেছিল। যখন তিনি মহানায়ক তখন সুপ্রিয়া মহানায়কের ছায়াসঙ্গিনী ছিলেন। সমাজ সুপ্রিয়াকে সঙ্গিনী এক্সট্রা তকমা দিলেও এটা ভেবে দেখেনি কেউ উত্তমের সেসময় যোগ্য সঙ্গিনী সুপ্রিয়া। যে উজাড় করা নিখাদ ভালোবাসা ও সেবা সুপ্রিয়া উত্তম কে দেন সেটা  কম কথা নয়। যখন সুপ্রিয়া নিজেও কেরিয়ারের মধ্যগগনে। যিনি ঋত্বিক ঘটক-র “মেঘে ঢাকা তারা”,”কোমল গান্ধার” করে ফেলেছেন অন্যদিকে “আম্রপালী” কে নিজ গরিমায় উদ্ভাসিত করান, আম্রপালী রূপে যিনি ছিলেন তারাশংকর-র প্রথম পছন্দ, যিনি বলিউডেও কাজ করে এসেছেন তিনি শুধুমাত্র উত্তমকে ভালোবেসে নিজের একক ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। সেসময় শুধু উত্তম নায়িকাই রয়ে গেছেন সুপ্রিয়া। উত্তম-নায়িকা তিনি তখন শুধু তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতে। কিন্তু অন্য ভিন্নধারার  ছবিতেও ভানুমতীর খেল দেখাবার পারদর্শীতা সুপ্রিয়ার ছিল। যেমন সুপ্রিয়ার হারিয়ে যাওয়া ছবি ‘নতুন ফসল’ কিংবা ‘স্বরলিপি’। এই ছবিগুলি এখন আর পাওয়া যায়না কিন্তু সুপ্রিয়ার অভিনয় প্রশংসনীয় হয়। কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে বড় করে দেখেছিলেন সেদিন সুপ্রিয়া। যে ভালোবাসা কোনদিনও সমাজ ভালো চোখে নেয়নি, আজও সুপ্রিয়ার প্রপৌত্র প্রপৌত্রী বয়সীরা তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করে আজও পাননি এতটুকু সম্মান।সুপ্রিয়া দেবী
 সুপ্রিয়া উত্তমের ঘর ভেঙেছে সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু উত্তমের লেখা প্রেমপত্র সুপ্রিয়াকে… কি সেই কথা বলে? একতরফা সুপ্রিয়াই শুধু এগিয়ে গেছেন এ হেন পরকীয়া সম্পর্কের দিকে? উত্তম সুপ্রিয়াদের নাচ শেখাতেন বব। তৎকালীন খ্যাতনামা ড্যান্সার। সুপ্রিয়া একাও বহুবার বব ওরফে ববিদার সঙ্গে নাচ প্র্যাকটিস করেছেন।সুপ্রিয়া দেবীউত্তম কুমারের লেখা চিঠি থেকে উঠে আসে, সুপ্রিয়ার প্রতি তাঁর নির্ভরতার এক প্রেম। পজেশিভনেস। সেখানে গৌরী দেবীকে কোনো অসম্মান করেননি। প্রথম সংসারের প্রতি দায়িত্ব পালন করে গেছেন চিরকাল। আসলে মানুষ টা সবাইকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজের রক্তচক্ষুর কাছে সেটাই কাল হল। সমাজের কাছে উত্তম-সুপ্রিয়ার প্রেম দুসরি প্যায়ার। কিন্তু ভালোবাসার কি এক নম্বরি দু-নম্বরি হয়?
উত্তমের সুপ্রিয়াকে লেখা চিঠির অংশ বিশেষ,
উত্তমের সুপ্রিয়াকে লেখা চিঠি।
চুপ করে থাকতে হয় এই প্রেমের মুগ্ধতায়। উত্তম-সুচিত্রা জুটিতে কিন্তু সুচিত্রা সেন উত্তম সেবিকা শুধু রূপোলি পর্দায়। কিন্তু সুপ্রিয়া দেবী উত্তম সেবিকা বাস্তবে। সুচিত্রা উত্তমের প্রেমিকা রক্তমাংসে নন শুধু ছায়াছবিতেই।কিন্তু সুপ্রিয়া রক্তমাংসের প্রেমিকা। সুচিত্রার কাছে উত্তম বরং প্রেমিকের চেয়েও বেশী প্রতিদ্বন্দ্বী। এখানেই তফাৎ সুপ্রিয়ার সঙ্গে। সুপ্রিয়া বাস্তব জীবনে নায়িকা হবার চেয়েও উত্তম সেবিকা হতে চেয়েছেন। এক সফল নায়িকা হয়েও। অনেক উত্তমের ছবির নায়িকার রোল থেকে বাদ পড়েছেন সুপ্রিয়া উত্তমের অন্য নায়িকা পছন্দ বলে। বোম্বের নায়কদের প্রত্যাখান করেছেন উত্তমের মানু বেণু। প্রথম দিকে উত্তম মোটেই সুন্দর দেখতে ছিলেন নাহ। যাকে দেখলেই প্রেমে পড়ে যাওয়া যায় এমন নয়। তিলেতিলে নিজেকে গড়ে তুলেছেন উত্তম কুমার। তথাকথিত রূপবান না হয়েও গড়ে তুলেছেন চওড়া বুক, নির্মেদ পীঠ, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি আর ছিলই তো মনভোলানো হাসি … চরম একটা যৌন আবেদন। যাতে সবাই ওঁকে কেউ স্বামী কেউ প্রেমিক কেউ দাদা কেউ ভাই ভাবত মনেমনে। বেশীরভাগ মেয়েরাই চাইত ওঁকে প্রেমিক হিসেবে পেতে। একটা লাভিং পার্সনালিটি। আবার যা জ্বালিয়ে দিত অন্যকে। নিজেও কম কষ্ট পাননি কম জ্বলেননি উত্তম এই প্রেম অপ্রেমে। কিন্তু নিজেকে সহজলভ্য করেননি।
কিন্তু সুপ্রিয়া কি একাই পেতেন উত্তম কে। কিংবা গৌরী? নাকি সুচিত্রা?
মাছির মতো অন্য মেয়েরা অন্য ইন্ডাস্ট্রির নারীরা ভনভন করত উত্তমের ময়রা স্ট্রীটের ফ্ল্যাটে। চলত রাত পার্টি। যেসব পার্টিতে ভোর রাতেও রান্না সাজিয়ে লুচি ভেজে আনতে হত সুপ্রিয়া দেবীকে। এত মেয়ে ভনভন করত উত্তম একটু একটু ভুলও করে ফেলতেন। রক্তমাংসের পুরুষ, মদ্যপান, ইন্ডাস্ট্রির চাপ, মধ্যগগনের খ্যাতি,দুই সংসার সবমিলিয়ে টানাপোড়েনে থাকতেন উত্তম। সুপ্রিয়া চাইতেন না এই এত মহিলা তাঁদের ফ্ল্যাটে এসে রাতপার্টিতে হৈ হোল্লা করুক। যদিও সেরা হোস্ট চিরকালই সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়া নাজেহাল হয়ে যেত নিজের মেয়ে সোমাকে ভালো রাখতে, উত্তম কে ভালো রাখতে বারংবার উত্তমকে বোঝাতেন ” প্লিজ সোনা, বাইরের মেয়েদের এন্ট্রি দিওনা তোমার ফ্ল্যাটে,তোমার জীবনে।” হয়তো লক্ষ লক্ষ মেয়ে যাকে ভালোবাসে তাঁকে সুপ্রিয়া পাচ্ছেন এক পরকীয়ায় সেই থেকেই সুপ্রিয়া পেয়েছেন সমাজের অবহেলা, অপমান, যন্ত্রনা। নায়িকাদের মধ্যে সাবিত্রীর সঙ্গে উত্তমের প্রেম ছিল। কিন্তু তা নিস্কাম প্রেম। সাবিত্রী প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন উত্তমকে। যা মানতেন সুপ্রিয়া। উত্তমকে নিয়ে ঘর বাঁধার ইচ্ছে ছিলনা সাবিত্রীর। এ কথা স্বীকার করেন সুপ্রিয়াও। আর সুচিত্রা সেন! সুচিত্রার ছিল একটা অধিকারবোধ উত্তমের উপর। এক গভীর বন্ধুত্ব। সে বন্ধুত্ব কতটা জানতে যাননি সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া রোববার গুলো পেতেন উত্তমকে। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দের কবিতা। পড়ে শোনাতেন উত্তম সুপ্রিয়াকে।সোনা সুপ্রিয়া উত্তম
১৯৬৩ র ৮ ই জানুয়ারী পরিপূর্ণ ভাবে প্রথম পান সুপ্রিয়া উত্তমকে ময়রা স্ট্রীটের বাড়িতে সুপ্রিয়ার জন্মদিনে। ঐ সময় থেকেই সুপ্রিয়া ডির্ভোস নিতে চান তাঁর প্রথম স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরীর থেকে। কিন্তু উত্তম রাজি হননি। শেষমেষ ১৯৬৩ র মাঝামাঝি ডির্ভোস নেন সুপ্রিয়া। উত্তম কোনদিনও ডির্ভোস দেননি গৌরী দেবীকে। সুপ্রিয়াকে কোনদিনও অসম্মানও করেননি। আরেকটা কথা বলে রাখা উচিৎ প্রথম স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরীর দ্বিতীয় বিবাহ দেন সুপ্রিয়া নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। এসব মধ্যবিত্ত সমাজে চোখ ছানাবড়া করে দেবার মতো ঘটনা। সুপ্রিয়ার জামদানী শাড়ি, স্লিভলেস ব্লাউজ আর সুগন্ধী তে ময়রা স্ট্রীটের বাড়ি মম করত। ঘাড়ের কাছে একটা সেন্ট মাখতেন সুপ্রিয়া যা ওঁর আবেদন সবার কাছে বাড়িয়ে দিত। সুগন্ধীর গন্ধ মিশে যেত সুপ্রিয়ার হাতের রান্না মশলার জাদুতে। সঙ্গে ময়ূরপুচ্ছ ধুতি পাঞ্জাবীতে উত্তম কুমার। উত্তমকুমার বলতেন তিনি তিনটে জিনিস খেতে ভালোবাসতেন চা চিনি চুমু আর বিশেষ একজনের হাতের রান্না, বলে বেণুদির দিকে তাকিয়ে চোখটা স্লাইট মেরে দিতেন উত্তমভঙ্গিতে। এক প্রেমের তীর্থক্ষেত্র বৃন্দাবন ছিল ময়রা স্ট্রীটের বাড়ি। কিন্তু উত্তম ঘোর সংসারী। সংসার দুটোতেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি পার্টি শার্টির লীলায়। সুপ্রিয়ার ময়রা স্ট্রীটের বাড়িসেই জমজম ময়রা স্ট্রীটের বাড়ি আজ আর নেই। ধূলিসাৎ। অন্য মাড়োয়াড়ী কিনে বাড়ি তুলেছে হোটেল করেছে। নেই উত্তম-সুপ্রিয়া। শুধু রয়ে গেছে তাঁদের প্রেমের ছবি গুলি, সুপ্রিয়ার রান্নার রেসিপিতে আপনাদের দাদার প্রিয় পদ গুলোতে উত্তমের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা।

 

Written By – Subhadip Banerjee