অন্য আবহ… আবারো ঋতুপর্ণের জন্য …

ঋতুপর্ণ ঘোষ

“Latitude মানে বোঝ?” ………the horizontal line between life and death? … আলো এসে দৃষ্টি ঝাপসা করে দেবে যে অনিকেত; আর তখন, তুমি বলবে,” ফোকাসটা ঠিকঠাক পাচ্ছি না…” একটা গিঁট পড়ে গেছে, পাহাড়ের রাস্তাতে পথ চলতে চলতে একটা একটা করে গিঁট erase করে দেওয়া হবে, আর তারপর…তুমি বলো তো, আমার সাথে কাজ করে কেমন লাগছে তোমার? ওরা দীপ্তি কে আটকে রেখেছে মেকআপ রুমের ভিতরে….চিৎকার করে উঠতে চায় বার বার,” অপ্রতিম লাগছে, শোনো…শোনো…. কিন্তু তুমি যে মেকআপ করা পছন্দ করো না!” “ম্যাডাম,শুনছেন…বেলভেডিয়া রোডের উপরে রাশি রাশি সিনেমার রিল ছড়িয়ে আছে, ওদিকে যে গাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে …” আর কত রঙ চরাবি তুই বিনি?! রোগের বাড়িতে সেজেগুজে যাওয়া যেন তোর একটা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে!ঋতুপর্ণ ঘোষ ….আয়নাতে ভিজে কপালের টিপটা খুলে রাখে শিখা; বিনোদিনী চোখের কাজলের রেখাতে আর একটা টান দেয়। “এমন ঝড় বাদলের রাতে খোকাকে কেউ ঘুম থেকে তুলে দাও; শরীর খারাপ করবে!” ….ঘুমের আগে ঘুম, ঘুমের পরে শব; শবদেহ জুড়ে প্রতিধ্বনি শোনা যায়,” বল দেখি আমি তোর কে হই?” …বারান্দার রেলিং জুড়ে থমথমে দাঁড়িয়ে থাকে শিখা; শ্রীমতী সরকার তখন স্টেজের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে, স্পটলাইটের তলাতে নিজেকে কেমন যেন গরল স্নাত মনে হয়, কে একটা অন্ধকার থেকে অস্ফুটে বলে ওঠে,”আমি তোকে বড় ভালোবাসি রে বিনি!” ……. আয়নাতে ফোকাসটা ঠিক করে নাও অনিকেত, এত হাত কাঁপলে চলে! …….” আমাকে ভালোবাসে এ কথা এর আগে কত বার কত লোকে বলেছে, তবে তখন তাদের চোখ লাল ছিল, সাদা চোখে তোমার মতো করে কেউ তো বলে নি, আমি তোমাকে ঠকাতে পারব না গো..”ক্যামেরা অ্যাকশনে ঋতুপর্ণ ঘোষ এমনি করে কেবল সংলাপ ভিড় করে আসে আবার মুছে ফেলা যায়; শ্রীমতি সরকার বলে ওঠে,” ভুল সংলাপ বললেন মাস্টারমশাই…. আমার জন্য নয়, আমার বিনিময়ে…” হ্যাঁ, সে কথা ঠিক বটে কেবল বিনিময়ের রাস্তাতে নিজেকে কুড়িয়ে কুড়িয়ে রাখা, এ যেন সেই ট্রেনে তুলে দিয়ে পাশ থেকে সরে পড়া, এর পর কোন স্টেশন, কোথায় যাচ্ছি কিচ্ছু জানি না! আস্তে আস্তে ফোকাসটা ঠিক হয়ে আসে, মদের গেলাসে দিনমণি অস্ত যায়, আর শিখার হাতে দু মুঠো ঘুমের ওষুধ তুলে দেয় বিনোদিনী; সেই ঘুম…ঘুমের আগে ঘুম, ঘুমের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে দিদি,” এই দিদি, দিদি রে….তৃপ্তি কে ফোন করে বল, একবারটি আসতে, আমি ভুল করে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছি!” তৃপ্তি, না….দীপ্তি…না না…তৃপ্তি, তুমি তখন কোথায় ছিলে কেউ জানত না, রাত জেগে রিল কেটে কেটে বের করে এনেছিলে শ্রীমতী কে, সে তো কেঁদেই খুন! তোমার বুকে হাজার বছর ধরে পাথর জমা করে করে একটা দেওয়াল তুলে দিয়েছে মেকআপ বক্স, বিনোদিনী তাতে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে, তুমি তো জানতে জীবনে সব টুকুর আস্বাদ না পেলে পানসে হয়ে যায় দিন রাত সব কিছু, তবু বলো তো তোমার কেমন লাগছে? …সারা রাত জেগে থাকে প্যারাম্বুলেটর; তারপর সেই ঘুম, ঘুমের আগে ঘুম, ঘুমের পরে রাখা থাকে শব, টিয়া বলেছে ও শেষ পর্যন্ত দেখবে, সিনেমা হলের একটা একটা করে আলো নিভে যায়, মাস্টারমশাই, এক রাতের জন্য ঐ পালাতে বেঁচে নিতে দেয় শিখাকে, বিনোদিনী শুনতে পায় থার্ড বেল পড়ে গেছে! শ্রীমতি তখন সেই রেলিং জুড়ে স্থবির হয়ে গেছে, latitude মাপতে মাপতে নাভি পথ বেয়ে এগিয়ে চলে অপ্রতিম, প্রেম করা হয়ে গেছে বিনোদিনীর সাথে, শিখার স্তনদেশ জুড়ে শহরের জনস্রোত বয়ে চলেছে যেন, তার আর ভালোবাসা হলো না!বিনোদিনী ঋতুপর্ণ ঘোষ দীপ্তি কে একবার ঘুম থেকে তুলে দাও, আজকে গহন কুসুম বনে ডুকরে কেঁদে মরছে শিখা, ওর যে প্রক্সি দেবার পালা ! ব্যাকস্টেজে দাঁড়িয়ে আছে বিনোদিনী, আর তারপর শ্রীমতী কে জরিয়ে ধরবে ঘুম, ঘুমের আগে ঘুম, আর ঘুমের পরে শব, শব দেহ জুড়ে আঁকা হয়ে আছে শ্রীমতীর দেহগন্ধ, টিয়া যা দেখছে তার চেয়ে আরো বেশী বাকি থেকে যাবে, মদের গেলাস ভেঙে পায়ে বিঁধে যাবে বার বার, হব্যিসীর বাটি জুড়ে আঁকা হয়ে থাকবে অশ্রুজল! তোমাকে তখন কেউ কী চিনতে পারবে শিখা? আয়নাতে দাঁড়ানো শ্রীমতী কিংবা বুকে ফেলে আসা বিনি? দিপ্তী আবার ঘুমতে চলে যাবে, ঘুমিয়ে যাবে সময়। কেবল শব দেহ স্বপ্ন দ্যাখে, শ্যুট করছে আর মুছে ফেলছে, একটা রোদ-ছায়া ঘেরা বারান্দার আবহে নিশ্চিন্ত উন্মাদ গান গেয়ে চলেছে,” জল তরঙ্গে ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি টেউ তুলে সে যায়…” ………….সিনেমাটা শেষ হলে, অপ্রতিম বলে উঠবে,” আপনি তো সেই প্রেম-ই করবেন, ভালো তো আর বাসবেন না!” রেলিং জুড়ে বিকেলের মতো বিন্দু বিন্দু করে শেষ হয়ে যাবে যে সে কে, শিখা, বিনোদিনী, নাকী শ্রীমতী? …….দিপ্তী শোনো, প্রক্সি তোমাকে দিয়ে যেতেই হবে; তারপর দাঁড়িয়ে থাকবে ঘুম….ঘুমের আগে ঘুম, আর ঘুমের পড়ে জীবন, আবহমান।।