বর্ষসেরা বাংলা ছবির অভিনেত্রীরা !

বছর

২০১৮ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি থেকে বেছে নেওয়া যাক প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীদের, যাদের সতন্ত্রতা এ বছর উল্লেখযোগ্য টলিপাড়ায়। এ বছর টা যেন বুঝিয়ে দেয় নায়িকা দের কোন বয়েস হয়না, অভিনেত্রীদের কোন থামা হয়না, তাঁরা সব রূপেই নতুন মাত্রা রাখেন। এ বছরটা সেরকমই দর্শনীয়।

তনুজা মুখার্জ্জী ( সোনার পাহাড় ) – একুশ বছর পর ফিরলেন বাংলা ছবিতে। মা ছেলের গল্পে বাংলা ছবিতে তাঁর প্রিয় বাংলা ভাষায়।লোনাভেলা থেকে কোলকাতায়।তনুজা সমর্থ মুখোপাধ্যায়। তনুজা এতদিন বাংলা ছবি না করলেও বাংলা তাঁর ঝরঝরে। প্রমাণ দিলেন আরো একবার পরমব্রতর সেরা ছবি ‘সোনার পাহাড়’ এ। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের সবটুকু দিয়ে সন্তান কে মানুষ করে যখন সন্তান চাকরী পেয়ে বউ নিয়ে আলাদা হয়ে যায় মা ও পারেনা বউমাকে মেনে নিতে এই মন কষাকষিতে বাড়তে থাকে দুরত্ব।আর তখনই তনুজা ওরফে উপমা মুখার্জ্জীর বাড়ি আসে এক বারবনিতার সন্তান বিটলু। প্রথমে শিশুটিকে ঘৃণা ও তারপর নিজের নাতি সন্তান করে নেন যাকে উপমা। বিটলু প টা বাদ দিয়ে করে নেয় উপমাকে উমা। আর এই অসম বন্ধুত্বর সূত্রধর পরমব্রত।উ পমা বিটলুর মধ্যেই খুঁজে পান নিজের সন্তান বাবানের ছেলেবেলা। তাই শাহরুখ খানের নামী রেস্তোরায় উপমা খাওয়ান এক বারবনিতার সন্তানকে।সোনার পাহাড়ের যে স্বপ্ন উপমা আর বাবান দেখেছিল সেই স্বপ্ন দেখতে থাকে উপমা বিটলু। সোনার পাহাড়ে গিয়ে মিলে যায় উপমা বাবান বিটলু র ত্রিবেণী।

রুক্মিনী মৈত্র ( কবীর)

পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় ছবি ‘কবীর’ যাঁরা রুক্মিণীর রূপে মুগ্ধ, তাঁদের বলি, তিনি তার চেয়েও বেশি কিছু। কবীরে রুক্মিণীর অভিনয় দর্শকমনে অন্য জায়গা করে নিয়েছে এ বছর। অসাধারন কাজ করেছেন তিনি। ইয়াসমিন খাতুনের মতো এক সন্ত্রাসবাদীর ভূমিকায় তাঁকে মানিয়েছে দারুণ। রুক্মিণী সত্যি প্রমাণ করলেন বিউটি উইথ ট্যালেন্টের মহিমা কোথায়। শুধু দেবের গার্লফ্রেন্ড হয়ে ছবিতে থাকা নয়, ইয়াসমিন খাতুনের চরিত্রে রুক্মিনী কতটা সতন্ত্র বুঝিয়ে দিয়েছেন। দুরন্ত এক্সপ্রেস জুড়ে রুক্মিনীর অভিনয় দুরন্ত।

পাওলি দাম ( মাটি )

এই গল্প মেঘলার (পাওলি দাম) । দেশভাগের যন্ত্রণা আজও কীভাবে বংশ পরম্পরায় কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে বাঙালির বুকে , তা স্পষ্ট করে দিয়েছে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘মাটি’। মেঘলাদের বাংলাদেশের বাড়ি, ঠাকুর দালান, দুর্গা পুজো, আর তাঁর ঠাকুমার টুকরো টুকরো ছবি আর গল্প জুড়েই তৈরি হয়েছে ‘মাটি’-র গল্পের বুনোট। বাংলাদেশের সেই বাড়িতে একটা খুন, আর ঠাকুমার স্মৃতির টানে বাংলাদেশ যায় মেঘলা। খুঁজে বার করার চেষ্টা করে রক্তাক্ত সময়ের অজানা দিক। সেই খুনের কিনারা করতে চায় সে। এই সময়ে এক বাংলাদেশের ব্যক্তির (আদিল হুসেন) সঙ্গে আলাপ হয় মেঘলার । তারপর কী হয়? কোন কিনারায় গিয়ে ঠেকে মেঘলার মনের-মাটি? পাওলির লুক কিছু জায়গায় এ ছবিতে ‘গৃহদাহ’ র সুচিত্রা সেনকে মনে করায়। সিরিয়াল মেকার পরিচালকদ্বয়ের ভালো পদক্ষেপ এই ছবি ‘মাটি’।

চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় (দৃষ্টিকোন) –

চূর্ণী একাকিত্বের আলপনা এঁকেছেন ‘দৃষ্টিকোণ’ এ। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটিকে নিয়ে এবছরের। চূর্ণী আলাদা করে নিজের জায়গাটা বুঝিয়ে দিয়েছেন এ ছবিতে।কি অসাধারন অভিনয়টাই না করেছেন চূর্ণী। কি মার্জিত সংযত অভিব্যাক্তি স্বামী পরকীয়ায় মোহাচ্ছন্ন হচ্ছে দেখেও।নিজের ঘর ভাঙছে দেখেও কি স্থিতধী চূর্ণী।এমন অভিনয় চূর্ণীই পারেন। পুরীর সমুদ্রতটে বিশাল সমুদ্রকে রেখে একা শটে চূর্ণী। কি দুরন্ত ক্যামেরার কাজ গোপী ভগতের। নিজের সংসারে নিজেই ব্রাত্য হয়ে পড়ছেন।বাথরুমে একা বসে কাঁদছেন চূর্ণী।

‘নিমেষে মিলিয়ে যায় পাল তোলা দিন গুলো
ফাঁকা পথ টানি রথ সারা গায়ে স্মৃতি ধুলো
একটা আঁচড়ে সব স্বপ্নেরা পিষে যায়
অমরত্বের দাবি সমুদ্রে মিশে যায়
তুমি আমি মুখোমুখি নীরবতা পালনের গান শুনে যাই।’

সমুদ্রের বালিতে জড়াজড়ি হয়ে গেছে জীয়ন শ্রীমতীর জুতো। রুমকি চূর্ণী হাত দিয়ে এক বুক হাহাকার নিয়ে দুটো জুতো আলাদা করে দিচ্ছেন।যে সময় তাঁর ডুকরে কেঁদে ওঠার কথা সেসময় কি শান্ত। এক অদ্ভুত চাহনি নিয়ে চূর্ণী রুমকি জীয়ন কে বলছেন ‘হ্যাঁ আজ আমি খারাপ কারনটা ঐ যে বললে টিপিক্যাল হাউসওয়াইফ।ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছো?”

‘যদি এই মুঠো ভরা শিউলি ফুল, যদি ঐ খুলে রাখা কানের দুল
লক্ষীটি একবার ঘাড় নেড়ে সম্মতি দাও আমি যাই ছেড়ে…’

দূরে সমুদ্রে জলকেলি করতে করতে রুমকির সংসারে এসে গেছে তাঁর পরিবর্ত। তাঁর জায়গাই তাঁর বাচ্চাদের স্বামীকে নিয়ে শ্রীমতী জলকেলি করছে। অথচ নিজের কষ্ট নিজের বুকে চেপে কি শীতল রুমকি চূর্ণী। যে স্বামী সংসারের জন্য নিজের ওকালতি ক্যারিয়ার ছেড়েছেন,যে স্বামীকে এত সেবা করে সুস্থ জীবন উপহার দিয়েছেন সেই স্ত্রী মূল্যহীন হয়ে পড়ছে।স্বামীর জুনিয়র কে আকুতি নিয়ে বলছেন “আমি কি করে বাঁচাবো আমার সংসার টা? কি করে জুড়ব?”‘দৃষ্টিকোণ’ র প্রচারে পোষ্টারে কোথাও চূর্ণীর ছবি নেই স্বামীর ছবি হওয়া সত্ত্বেও চূর্ণী নিজ প্রচার লোভ ত্যাগ করেছেন যেন রুমকির মতোই কিন্তু এ ছবির এক জীয়ন কাঠি রুমকি। চূর্ণী তো টেলিভিশন থেকে উঠেছিলেন অথচ টলি সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে টক্কর দিয়েছেন।চূর্ণীর অভিনয়ের জন্য এ ছবি দেখুন। না দেখলে বড় মিস।

জয়া এহেসান ( এক যে ছিল রাজা )

বহু চর্চিত ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার গল্প নিয়েই যে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘এক যে ছিল রাজা’। যা ছিল এবছরের পুজো রিলিজ। চেনা গল্পকে যে সৃজিত নিজের মতো করে বলতে চেষ্টা করেছেন, সেটা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। মেজ কুমারের বোন মৃন্ময়ী দেবীর চরিত্রে জয়ার অভিনয় প্রশংসার দাবী রাখে। যীশুজয়া এ ছবির মূল আকর্ষন। জয়ার অভিনয় দেখতেই বেশী দর্শক এ ছবি দেখেছেন। সবার মুখেই একটাই নাম জয়া আহসান। মৃন্ময়ী দেবীর লড়াই সমগ্র জীবনটা দেখানো হয়েছে এ ছবিতে।তাই জয়াকে আমরা বিভিন্ন মেক আপে বিভিন্ন বয়সের লুকে দেখতে পাই। যৌবন সরসী থেকে স্নিগ্ধ বৃদ্ধা রূপ। এ ছবির ম্যান অব দি ম্যাচ অবশ্যই জয়া আহসান। ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী নারী চরিত্র। সংলাপ, অভিনয় মিলিয়ে জয়া অনন্যা।

জয়া আহসান এখন ঢালিউড তথা টলিউডের এক নম্বর নায়িকা নিঃসন্দেহে।

মমতা শংকর ( ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ )

আমরা বর্ষশেষে সেরা নায়িকা নয় বেছে নিচ্ছি বর্ষসেরা অভিনেত্রী। অগস্টের শেষ দিন দরজা খুলেছিল ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’। আমাদের গা ছমছমে ফ্ল্যাটে ঢুকিয়েছিলেন পরিচালক অরিন্দম ভট্টাচার্য। আবীর-তনুশ্রী জুটির প্রথম ছবি। ছবির আরেক আকর্ষন ছিলেন মমতা শংকর। আবীর তনুশ্রীর পাশের ফ্ল্যাটের মাসিমা। যিনি খুবই অসুস্থ ও ভীত। যে লুক পরিচালক দিয়েছেন মমতা শংকরকে এর আগে কোন ছবিতে এভাবে আমরা মমতা শংকর কে পাইনি।একটমোটা কাঁচের চশমায় যেন চরিত্রটায় মিশে গেছেন মমতা শংকর। এতো দুরন্ত অভিনয় করেছেন যার জন্য ছবিটা অবশ্যই দেখা উচিৎ। ঋতুপর্ণ ঘোষের পর মমতা শংকর কে নতুন ভাবে আবিস্কার করছেন অরিন্দম ভট্টাচার্য তাঁর দুটো ছবিতেই। তাঁর প্রথম ছবি ‘অন্তর্লীন’ এও মমতা শংকর ওইধরনের চরিত্র আগে করেননি। আর ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ এও দুরন্ত মমতা শংকর। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন বৃদ্ধ স্বামীর ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ওনার অভিনয় আর কি বলব সব সময় অপ্রতীম।

চিত্রাঙ্গদা চক্রবর্তী ( আহারে মন )

‘আহা রে’ শব্দটা অনেক যন্ত্রনার মলম হতে পারে। আবার অনেক যন্ত্রনাকে জাগিয়ে দিতে পারে। প্রতিম ডি গুপ্তার একদম ফ্রেশ ছবি। তিতলি (চিত্রাঙ্গদা) ক্যানসারে আক্রান্ত,যে মনের গভীরে স্বপ্নের নায়ককে নিয়ে নিজের কল্পনার রাজ্যে নানান ইচ্ছে বুনে চলেছে। এইরকম বিভিন্ন চরিত্রের ইচ্ছের হদিশ দিতে গল্প বুনেছেন প্রতিম তাঁর ‘আহা রে’ ছবিতে। মাল্টিস্টারকাস্ট ছবিতেও আলাদা করে নজর কেড়েছেন চিত্রাঙ্গদা ও তার লুক।

শ্রীলেখা মিত্র ( রেনবো জেলি )

ছোটদের মনমুগ্ধকর ও বড়দের স্মৃতিমেদুরতার ছবি ‘রেনবো জেলি’ বানিয়েছেন পরিচালক শৌকর্য ঘোষাল। ঘোঁতন গতানুগতিক প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে থাকা অথচ বড় মনের কিশোরের গল্প। তার কাছেই তাকে সাহায্য করতে সাবালক করতে আসে পরী পিসি। পদিপিসি নয়, পরী পিসি! সিনেমাতে লীলা মজুমদারের লেখা ‘পদিপিসির বর্মীবাক্সের’ আলতো প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হলেও, ‘রেনবো জেলি’ আদতে অন্য। পদি পিসি ছায়া দেবীর মতো এখানেও হাজির হন পরী পিসি শ্রীলেখা মিত্র। এই শ্রীলেখাকে আগে আমরা দেখিনি। শ্রীলেখার জীবনের আরেকটি শ্রেষ্ঠ চরিত্র পরী পিসি।শুরুতে শ্রীলেখা সুন্দরী গৃহবধূর চরিত্রে অনবদ্য ছিলেন যদিও ‘স্বাদে আহ্লাদে’ তে সেই শ্রীলেখাকে আজও পাই। তারপর যে যৌনদেবী শ্রীলেখা আর্বিভূতা হলেন তার রেশ অনেকদিন ছিল সেই রূপেই আজকাল তিনি বেশী জনপ্রিয়া যদিও তিনি ছুড়ে ফেলে দেন ‘দুপুর ঠাকুরপো’ দের সস্তা বৌদি হবার অফার। আর জন্ম দেন পরী পিসির। ফুড ফ্যান্টাসি নিয়ে বাংলা ছবি বাঙালি উপহার পেল।আর তার কারিগর পরী। যে সূর্যের সাতরঙে মানুষের মনের রঙ পাল্টে দেবার ক্ষমতা রাখেন। আর ঘোঁতনের নতুন জীবনের চাবিকাঠি নিয়ে আসেন তার এই পরী পিসি। এত সুন্দর সুন্দর রঙের নতুন নতুন রেসিপির রান্না দেখলে মন ভালো হয়ে যাবেই।

নবাগতা/ শিশু অভিনেত্রী

সারা সেনগুপ্ত ( উমা )

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে এলেন যীশু সেনগুপ্ত কন্যা উমা সারা সেনগুপ্ত বাংলা ছবিতে। প্রথম কাজেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে সারা। খুব সাবলীল অভিনয় করেছে ক্লাস সিক্সের কিশোরী সারা যে সৃজিতের এই দুর্গা পুজোর ছবির নাম ভূমিকায়। ভবিষ্যতের ভাবী অভিনেত্রী নায়িকা হতেই পারেন সারা।

বর্ষসেরা বাংলা ছবির অভিনেত্রীদের তুলে ধরলাম যাদের কাজ উল্লেখযোগ্য ছিল ২০১৮ র এ বছর।