“বাংলার ইন্ডিপেনডেন্ট গান বা গায়ক সবসময় আন্ডাররেটেড !” – তিমির বিশ্বাস

তিমির

ফোনের মিউজিক প্লেয়ারে যে বাংলাগুলো লুপে চলতে থাকে সেই তালিকাতে এক নবতম সংযোজন পরিচালক সত্রাজিৎ সেনের “মাইকেল” সিনেমার “ঘরে ফেরার গান”। সিটি সেন্টারে বেশ কিছুদিন আগে যখন সিনেমার মিউজিক লঞ্চ হয় সেই মঞ্চে তিমির বিশ্বাস এই গানটা গাওয়ার পর একদম পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক মানুষ বললেন,”আবার কোথায় শুনতে পাব এই গানটা?” তখনই ঠিক করে ফেলি সাক্ষাতেই জানতে হবে এই গানের ইতিবৃত্তি। গানটা অবশেষে রিলিজ হল এবং প্রচুর মানুষের সাধুবাদও পেতে শুরু করেছে তখনই হোয়াটস অ্যাপ থেকে উধাও শাফাকত আমানত আলির সাথে ডুয়েট করা তিমির বিশ্বাস। নাহ যোগাযোগের সব মাধ্যম ভাগ্যিস ডিলিট করে দেন নি তাই সাক্ষাতটা হল এবং সাক্ষাৎকারও…

হোয়াটস অ্যাপটা হঠাৎ বন্ধ করলে কেন? মনে জায়গা নেই না ফোনে ?

তিমির- (হাসি)…মনে অনেক জায়গা আছে , অসীম…আর আমি যে ফোন ইউজ করছি সেখানেও অনেক জায়গা কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে যে জন্য হোয়াটস অ্যাপ ইউজ করা, কমিউনিকেশন। আমি ঠিক যে ভাবে কমিউনিকেট করতে চাই সেইভাবে করতে পারছি না! আর দিনের কিছু সময় থাকে যখন আমি চাই না আমাকে কেউ বিরক্ত করুক তখনই হয়ত কারুর মেসেজ ঢুকছে মন অন্যদিকে যাচ্ছে ।

কারুর সাথে চূড়ান্ত ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল নাকি?

তিমির- ভুল বোঝাবুঝি ঠিক না, আসলে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে , অনুভূতিগুলোর মধ্যে অনেক সূক্ষ্মতা আছে যেটা সামনাসামনি কথা বলা ছাড়া ঠিক হয় না। অ্যাপে যে স্মাইলিগুলো আছে তার বাইরে কি আর কোন এক্সপ্রেশেন নেই? এই সূক্ষ্মতাটা হোয়াটস অ্যাপে নেই, এটা ভীষণ ভোঁতা একটা জিনিস যেটা আমাকে ডিস্টার্ব করছিল! যার সত্যি দরকার আমাকে ফোন করুক…

১৬তে ১৩টির মত গান সেখানে ১৭তে এখনও ৬টা, পরিসংখ্যান বলছে ২০১৬’র থেকে ১৭’তে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে বছরটা একটু খারাপ গেল, তাই কি?

তিমির-  আমি নিজেকে কোনদিন প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে দেখি নি তাই খারাপ-ভাল প্রসঙ্গে বলতে পারব না তবে এই বছর আমি খুব পছন্দের কয়েকটা প্লেব্যাক করেছি, এখনও ৪টে আনরিলিজড গান আছে তার মধ্যে প্রদীপ্তদা’র সিনেমার দুটো গান আছে। সংখ্যার থেকেও বড় ব্যাপার কটা গান এর মধ্যে মানুষ মনে রাখছে! আমার এর থেকেও বেশি চিন্তার যে আমার লেখা ,সুর দেওয়া গানগুলো কবে রিলিজ করতে পারব? এদিকে বয়স বেড়ে যাচ্ছে (হাসি) একটা মিউজিক ভিডিও শুট করে এলাম জ্ঞানাদা ( সৌমিক দাস )’র সাথে ডিসেম্বরে আসছে, ফকিরার অনেক কাজ বাকি, এইগুলোই বেশি ভাবাচ্ছে…

রিসেন্ট হিট “ঘরে ফেরার গান” শুনে একজনের মন্তব্য, এই গানটা শুনে তোমার রাতারাতি ফ্যান হওয়ার জন্য  যথেষ্ট! ফ্যানসংখ্যা অনেক বেড়েছে ফ্যানক্লাবগুলোর রমরমা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে…

তিমির- (হাসি) আমি কিন্তু ফ্যানক্লাবে বিশ্বাসী নই, আমাদের ইন্ডিপেনডেন্ট মিউজিকের একটা ফ্যানবেস হোক সেটাই চাই, তারা যেমন আমার গান শুনবে সেরকম ফসিলস, ক্যাকটাস  সহ সবরকম ব্যান্ডের গান, ইন্ডিপেনডেন্ট মিউজিক শুনবে । এই ছোট ইন্ডাস্ট্রিতে ভাগবাটোয়ারা কিসের? একটা ফ্যানক্লাব চিনি বর্ধমানে, যে ছেলেটি করেছি ও অনেকদিন আগে থেকেই আমার গান বাজনার সাথে পরিচিত। আমি নিজে মনে করি না আমার বা ফকিরার আলাদা করে কোন ফ্যানক্লাব তৈরি হোক!

গানটাতে শাফাকত আমানত আলি আর তিমির বিশ্বাস’কে বাদ দিলে এক্স ফ্যাক্টরটা কি?

তিমির- অবশ্যই ইন্দ্রদা (ইন্দ্রজিৎ দে )। ইন্দ্রদাকে অনেকদিন ধরে ফলো করেছি যখন আমি কীবোর্ড প্লেয়ার ছিলাম, ফসিলস ১,২ এর খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইন্দ্রদা। সবসময় ইচ্ছে ছিল ওনার সাথে কাজ করার। সত্রাজিৎ’দা কে অনেক ধন্যবাদ এরকম একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য কারণ উনি এমন একজন মিউজিসিয়ান যে ইন্ডিয়ান থেকে ওয়েস্টার্ন একদম নখদর্পনে! ইন্দ্রদা নিজেই একটা এক্স ফ্যাক্টর… এই মানুষটা যেকোন সময়ে গান বানিয়ে দিতে পারে, আমাদের নিজেদের চোখে দেখা…

গানটা প্রথম কোথায় শুনলে?

তিমির- সত্রাজিৎদা’র সাথে আমার আলাপ সেই ‘ইতরপনা’ অ্যালবাম থেকে তারপর আমরা বহু আড্ডা দিয়েছি, কাজ করেছি তবে প্রথম এত বড় কাজ একসাথে তিনজনের ইনফ্যাক্ট রাজীব’দারও, ‘অন্ধপ্রেমিক’ অ্যালবামটা অনেক সাহায্য করেছে রাজীবদা’র এই কাজটা পাওয়ার ক্ষেত্রে…

অ্যাওয়ার্ড শো’র নমিনেশনের থেকেও তো বড় পাওনা এটা…

তিমির- হ্যাঁ একদমই, আমি এটাই মেলাতে পারি না যে অ্যালবাম মানুষের এত ভাল লাগছে, শুনছে সেটা কোন নমিনেশন পায় না, অ্যাওয়ার্ড পায় না! ……( হতাশা কাটিয়ে)… যেটা বলছিলাম,  সত্রাজিৎদা বলেছিল, তোকে ছাড়া আমি এই অ্যালবামটা ভাবছি না। প্রথম গানটা এসেছিল লগ্নজিতার সাথে যেটা সুইং গান পুরো আগে আমি গাই নি কখনো। ইন্দ্রদা অনেক হেল্প করেছিল গাওয়ার সময় এরপর আসে এই “ঘরে ফেরার গান”। ঠিক ছিল এই গানটার তিনটে ভার্সেন বেরোবে একটা রেখা ভরদ্বাজ গাইবেন, একটা আমি আরেকটা শাফাকত আমানত আলি। প্রথমে আমি রেকর্ড করি এবং সেটা শাফাকত’জিকে সুরের রেফারেন্স হিসেবে পাঠানো হয়,  আমার খুব ভাল লাগল আমার গানটা পাঠানো হচ্ছে দেখে…

শুনেই প্রথম কি বললেন উনি?

তিমির- প্রথমেই জানতে চেয়েছিলেন গানটা কে গেয়েছে? (হাসি) তো  সত্রাজিৎদা বলেন, আমাদের এখানেই একজন গেয়েছ ওর আরও একটা গান আছে সিনেমাতে, তখন উনি বলেন ও তো ভালোই গেয়েছে! সেইসময় সত্রাজিৎদা বলে ফেলে এমনিই যে উনি কি চান এটা ডুয়েট করতে? উনি তখনই বলেন নিশ্চয়ই করবো, আমার খুব ভাল লাগবে । এরপর ওনার পার্টটা আসার পর আমি আবার রেকর্ড করি সেটা খুব কঠিন ছিল কারণ যে মানুষটার গান গেয়ে বড় হয়েছি তার সাথে ডুয়েট মানে ঈশ্বর-দর্শনের মত ব্যাপার! সেসময় কেমন একটা ট্রান্সে চলে গেছিলাম…

গানটা ফাইনালি রেডি হওয়ার পর শুনে কি বললেন উনি?

তিমির- আউটপুট শুনে বলেছেন এত দুজনের গলা আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে না…( শিশুর মত হেসে) এই কমেন্টটা আমি বাঁধিয়ে রাখতাম যদি সম্ভব হত!

ন্যাশেনাল ট্রেন্ডিংএ এসেছিল গানটা, তোমার প্রথম কোন গান এল ট্রেন্ডিং এ…

তিমির- হ্যাঁ প্রথম। তবে আমি কিন্তু এই ট্রেন্ডিংএ খুব একটাও বিশ্বাসী নই! আমি বিশ্বাস করি কোন গান গাইলাম তার ৪,৫ মাস পর যদি ষ্টেজ শো বা কোথাও গানটার রিকোয়েস্ট আসে বারবার তখন বুঝি গানটা ট্রেন্ডিংএ আছে…

কিন্তু যখন ট্রেন্ডিংএ যাচ্ছিল তোমার ঘনঘন ফেসবুক আপডেট ছিল…

তিমির- (হাসি) হ্যাঁ সেটার কারণ আমার প্রথম কোন গান ট্রেন্ডিংএ , সেটা নিয়ে এক্সাইটেড ছিলাম এখন তো অনেক বাংলা গানই আসছে ট্রেন্ডিংএ তো সেখানে আমারও গান ঢুকল সেই লিস্টে তাই জন্য। সবথেকে বড় ব্যাপার ছিল এই ট্রেন্ডিংটা ইউজ করে আরও মানুষের কাছে গানটা পৌঁছে দেওয়া কারণ এখনো অনেক মানুষ অ্যাচিভমেন্ট লিস্ট দেখে গান শোনে তবে ট্রেন্ডিং, ইউটিউব ভিউস এটার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ গানটা মনে রাখল কিনা…

অনেকেই চাইছে এই গানটা নিয়ে তোমার একটা সোলো ভার্সেন, পাচ্ছি আমরা?

তিমির- হ্যাঁ, এখানেই প্রথম বলছি , খুব তাড়াতাড়ি এই গানটার সোলোটা আসবে যেখানে ভিডিওতে আমাকে, ইন্দ্রদা ও সত্রাজিৎ’দাকে দেখতে পাওয়া যাবে! সবমিলিয়ে গানটা বেশ সাড়া ফেলেছে…

Gun-পয়েন্ট

এইসময়ের ওভার-হাইপড বাংলা গান

তিমির- (চোখ বড় করে) ওরে বাবা! কোন গানই তো সেভাবে হাইপড হচ্ছে না, আমি চাই হাইপড তো হোক একটু (হাসি)

ওভার-হাইপড সিঙ্গার

তিমির- নাহ কাউকে দেখছি না, বাংলার ইন্ডিপেনডেন্ট গান বা গায়ক সবসময় আন্ডার-রেটেড!…আমরা সবাই আন্ডাররেটেড!

তোমার কাছে ৪টে সিডি আছে, একটায় বেথোভেন মিউজিক, একটায় এ আর রহমান মিউজিক ,একটায় অনুপম রায় মিউজিক, আরেকটায় সাউথ ইন্ডিয়ান আইটেম সং। চারজন আছে (অনুপম রায়, ইন্দ্রজিৎ দে, ইন্দ্রদীপ দাসগুপ্ত, অরিন্দম চ্যাটার্জি) কাকে কোন সিডিটা দিতে চাইবে ?

তিমির- (৫০ সেকেন্ড মত টানা হাসার পর) ইন্দ্রদীপ’দাকে দেব অনুপম রায় মিউজিক, ইন্দ্রদার জন্য সাউথ ইন্ডিয়ান, অনুপম রায়কে এ আর রহমান আর অরিন্দমকে বেথোভেন!

কোন গান রিলিজের পর জানতে পারলে গানটা কপি, কি বলবে?

তিমির- একটাই কথা বলব, ‘কপি’ ব্যাপারটা খুব রিলেটিভ ব্যাপার, আর ডি বর্মনেরও অনেক গান আছে কপি। তবে রিলিজের পর ব্যাপারটা জানতে পারলে একটু তো কষ্ট হয়ই,  আমার বক্তব্য হচ্ছে, স্বচ্ছতাটা থাকা দরকার যদি কোথা থেকে কোন পার্ট কপিও হয় সেটা জানিয়ে দেওয়া উচিৎ মানুষকে।  আমাদের প্রথম অ্যালবামে একটা গানে পিঙ্ক ফ্লয়েডের একটা পার্ট ডেলিবারেটলি ইউজ করেছি লালন ফকিরের সাথে মার্জ করব বলে এবং আমরা সেই অ্যালবাম ডেডিকেটই করি পিঙ্ক ফ্লয়েড ও লালন ফকিরকে। এই স্বচ্ছতা থাকা খুব দরকার এতে কেউ ছোট হয়ে যায় না, মানুষ আজকে অনেক সচেতন!

সত্রাজিৎ সেনের সেকেন্ড সিনেমাতে গান গাইতে না পারলে আফসোস থাকবে?

তিমির- নাহ, একদমই না আর এই সিনেমাটা শুধু সত্রাজিৎদা’র নয় আমাদের সবার স্বপ্ন , মানে আমরা সবাই মিলে চিন্তা করছি ,ইনপুটস দিচ্ছি, আমি নিজে মিউজিকের প্রোমোশনে আইডিয়া দিচ্ছি, হয়ত সিনেমার প্রোমোশনেও আমার কিছু আইডিয়া থাকবে, আর সত্রাজিৎদা’র পরের সিনেমাতে যদি আমার জন্য কোন গান থাকে আমাকে অবশ্যই বলবে…

গত বছর সাক্ষাৎকারে বলেছিলে তুমি বাস-অটো’তে ট্রাভেল করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য, এক বছর পর অবস্থা একই আছে?

তিমির- হ্যাঁ একদম একই আছে, এখন হয়ত পরিচিত একটু বেড়েছে, এই তো সেদিন মেট্রো করে শ্যামবাজার থেকে ফিরছিলাম কিছু মানুষ চিনতে পারল কিছু মানুষ পারল না ,আমার এতে কোন আফসোস নেই, এটাই ভাল কারণ আমি চাই যাদের জন্য গান বানাচ্ছি তাদের মাঝখানেই থাকতে…

প্রশ্নের ওপারে- শুভদীপ কাজলী (এডিটর)।