“মাঝে মাঝে মনে হত, কেন এলাম এখানে?”- কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়।

“বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো/ সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও” এটাই সবসময় যেকোন বাঙালির স্পিরিট, সারা বিশ্ব ঘুরে দেখার স্পিরিট আর এই আত্মবিশ্বাসকেই সম্বল করে এক বাঙালি বেরিয়ে পড়েছিলেন এক দুর্গম অভিযানে, তিনি কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় অ্যামাজনের বিপদসঙ্কুল পরিবেশ থেকে শুটিং শেষ করে সফলভাবে ফিরে এসেছেন এবং অপেক্ষার প্রহর গুনছেন এতোটা ঝুঁকি নিয়ে কেন শুট করে এলেন তার উত্তরটা বড়পর্দায় দেওয়ার জন্য, হ্যাঁ আগামী ২২শে ডিসেম্বর আসছে শঙ্করের দ্বিতীয় পর্ব “অ্যামাজন অভিযান”, তার আগে পরিচালক অবশ্য আমাদের সাথে ভাগ করে নিলেন সেইদিনগুলোর কিছু কথা…

বাংলার পরিচালকরা ইদানিং বেশ সাহসী হয়ে গেছে, সৃজিত মুখার্জি দুর্গম পাহাড়ে শুট করে এল, তুমি যে জঙ্গলে গেছিলে সেখানে কোন সুস্থ মানুষ যাওয়ার আগে দশবার ভাববে! ট্রেন্ডটা কি ‘চাঁদের পাহাড়’ থেকেই শুরু করেছিলে?

কমলেশ্বর- (স্মিত হেসে) আমি শুরু করেছি বলে নয় আসলে বিষয়টা হচ্ছে যে দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ছবি ঘরের মধ্যে আটকে থাকছিল! সেটা আমাদের সকলেরই মনে হচ্ছিল তাই সাহস করে একটু বাইরে বেরিয়ে কিছু করার চেষ্টা এবং আমার বিশ্বাস বাংলা ছবি নতুন মোড় নেবে এখান থেকে..

‘চাঁদের পাহাড়’এর পর ঠিক কোন ব্যাপারটা তোমাকে আবার ভাবালো এই দ্বিতীয় সংস্করণের জন্য..

কমলেশ্বর- আমি ছোটবেলায় ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’ বলে উপন্যাসটা পড়েছিলাম তো তখন থেকেই আমার অ্যামাজোনিয়া নিয়ে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তারপর যখন ঠিক হয় শঙ্করের নতুন অভিযান হবে তখন তাকে পৃথিবীর কোন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া যায়? এবং ভেবে দেখা হল অ্যামাজোনিয়ার যে রেনফরেস্ট , অ্যামাজন সংলগ্ন দুদিকের যে উপত্যকা সেখানে যে বর্ষাবরণ জঙ্গল, ওখানে যদি শুট করা যায়! আমরা জানতাম জায়গাটা অতন্ত্য দুর্গম, শুট করা তো আরও কঠিন তবু চেষ্টা করে দেখা যাক ভেবে বেরিয়ে পড়া অ্যামাজন অভিযানে…

তাহলে আগে লোকেশন ঠিক করে তারপর শুরু হয় গল্প লেখা?

কমলেশ্বর- গল্পটা কিন্তু প্যারালালি চলছিলই, প্রথমে লোকেশন দেখা হয়, তারপর কিছু রিসার্চ, পড়াশুনা চলেছিল এবং সঙ্গে গল্পটাও এগোয়। সব মিলিয়ে শঙ্করের এই অভিযানটা স্থির করা হয়।

‘চাঁদের পাহাড়’এর সময় মজা করে বলেছিলে জঙ্গল-পশুপাখি-দেব ছাড়াও একজন হিরোইন থাকলে ভালো হয়, সেখান থেকেই কি অ্যানা ফ্লোরিয়ানের চরিত্রটা তৈরি করা?

কমলেশ্বর- (হাসি) নাহ ঠিক তা নয়, ঠিক হিরোইন নয়, আমার সবসময় যেটা মনে হয়েছে যে, এগুলো তৈরি করা হচ্ছে বাচ্চাদের কথা মাথায় রেখে। সেক্ষেত্রে ছেলে বাচ্চাদের ইগো আইডিয়াল হয়ে ওঠে শঙ্কর, তবে মেয়েদের কে হবে? সেটা ভেবেই এই চরিত্রটা তৈরি হয়…

শঙ্করের আগের অভিযানের সময়কাল ছিল ১৯০৯-১০ সাল তাহলে এই গল্পে কোন সময়টাকে ধরা হয়েছে?

কমলেশ্বর- সেটা হল ১৯১৩,১৪,১৫ সালটাকে ধরা হয়েছে।

কিছু কি পরিবর্তন দেখতে পেলে মানে ঐ সময়কাল’কে ধরতে অসুবিধে হয় নি?

কমলেশ্বর- নাহ জঙ্গলের ভেতরটা সেরকম কোন পরিবর্তন হয় নি, কারণ বহু জায়গায় মানুষের পা পড়ে নি, তবে হ্যাঁ ম্যানাও শহর যেখান থেকে অভিযানটা স্টার্ট হয়, সাঁও পাওলো শহর এইসব  তো অবশ্যই পাল্টে গেছে, যাওয়ার রাস্তাও অনেক পাল্টেছে তাই সেই পরিবর্তনগুলো মাথায় রেখে কম্পিউটার গ্রাফিক্স ব্যবহার হয়েছে আর পুরো সময়কালটাকে ১৯১৩-১৪ তে বেঁধে রাখার সব প্রচেষ্টা করা হয়েছে…

প্রথম যেদিন অ্যামাজনে দাঁড়িয়ে অ্যাকশেনটা বলো, মনে কি চলছিল?

কমলেশ্বর- ভীষণ গর্বিত ছিলাম! আনন্দিত ছিলাম যে আমি এই সুযোগটা পেয়েছি এরকম একটা জায়গায় শুটিং করার, এই সৌভাগ্য সবার হয় না!

আর শেষ যেদিন প্যাকআপটা বলো..

কমলেশ্বর- …..সবার চোখে জল এসে গেছিলো…আমাদের নিজেদের ইউনিট, ব্রাজিলের যারা লাইন প্রোডিউসার ছিলেন, অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রত্যেকের খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল কারণ এরকম একটা জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে আর সত্যি জানা নেই কোনদিন এখানে আসা সম্ভব হবে কিনা!

শুট করতে করতে কোনসময় মনে হয়েছিল, আর থাকা সম্ভব নয়, হাল ছেড়ে দিয়েছিলে!

কমলেশ্বর- একবার নয় অনেকবার মনে হয়েছিল! কিন্তু পারি নি হাল ছাড়তে কারণ যে গল্পটা বলতে চেয়েছি তার জন্য শুটিংটা করতেই হবে। বেশির ভাগ সময় জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে বা আন্ডার ওয়াটারে গিয়ে যখন শুটিং করতে হচ্ছিল বা জঙ্গল মাড়িয়ে শুট করতে যেতে হচ্ছে তখন প্রচুর পোকা মাকড় কামড়েছে, গায়ে হাতে পায়ে এলার্জিক র‍্যাশ! প্রচুর ভয়ের কারণ তৈরি হচ্ছিল চোখের সামনে ব্ল্যাক ক্লেভ্যান , অ্যানাকোন্ডা দেখে। তার উপর যখন তখন বৃষ্টি! …মাঝে মাঝে মনে হত কেন এলাম এখানে? কিন্তু শেষমেষ মনের জোর নিয়ে শুট করা হয়েছে, সেই সিনেমা এবার মুক্তি পাবে এই ভেবে আজকে পেছনের দিকে তাকিয়ে আর কষ্ট হয় না!

তাহলে আবার হাতে ক্যামেরা দিয়ে দুর্গম জায়গায় ছেড়ে দিলে আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে…

কমলেশ্বর- আমি বারবার, যত বার সুযোগ পাবো পৃথিবী দেখার এবং দেখানোর, হাতে ক্যামেরা দিয়ে দিলে আরও দুর্গম জায়গার দিকে এগিয়ে যাব তো বটেই!

অ্যামজনে অভিনেতা দেবের হিংস্রতাটা কতোটা মনে হল?

কমলেশ্বর- অভিনেতা দেব আগের থেকে অনেক বেশি পরিনত হয়েছে, অনেক বেশি সহনশীল হয়েছে। ও অনেক রিস্ক নিতে শিখেছে যেটা কোন কোন সময় আমাদের বিরাট ভয়ের কারণও হয়েছে। তবে দেবের ডেডিকেশন দেখলে বোঝা যায় একজন মানুষ কতোটা ঝুঁকি নিয়ে এরকম জঙ্গলে শুট করতে পারে, সমস্ত স্ট্যান্ট ও নিজে করেছে । এরজন্য আমি শুধু কৃতজ্ঞ নই ওর কাছে, আমার ভালো লাগে যে একজন বাঙালি এই কান্ডগুলো ঘটিয়েছে!

এই গল্পটা তোমার লেখা এবং বিভূতিভূষণের সাথে অনেকেই একটা তুলনা টানার চেষ্টা করছেন! এটা তো ভীষণ চাপের, সেখানে কি এই অ্যাডভেঞ্চার গল্পকে আলাদা ভাবে ব্র্যান্ডিং করতে পারতে ?

কমলেশ্বর- প্রথম কথা হচ্ছে আমি বিভূতিভূষণের ভক্ত, ওনার পাশে দাঁড়ানোর জায়গা আমার নেই আর আমি সাহিত্যিকও নই। একজন ফিল্মমেকার, চেষ্টা করি সিনেমা বানানোর সেই জায়গা থেকে বিভূতিভূষণের ফুটস্টেপ ফলো করে একটা গল্পের আকার দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাঁর সঙ্গে আমার কোন তুলনাই হয় না এবং প্রশ্নও ওঠে না। উনি একজন আন্তর্জাতিক মানের লেখক, আসলে ওনার সারা পৃথিবী ঘুরে দেখার যে স্পিরিট, সেটাই তো একজন বাঙালির স্পিরিট, আমাদের সকলের মধ্যে একটা শিশু আছে যে চায় সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে সেই শিশুটাকে আরও মুক্ত করে দেওয়ার এটা একটা প্রচেষ্টা, এরমধ্যে কোনরকম প্রলোভন বা ঔদ্ধত্য কিছুই নেই !

ট্রেলার দেখে সবাই একটা কথা বলছে যে এতদিনে বাংলার সিনেমার ভিএফএক্স নাবালক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হল! এটা কত বড় প্রাপ্তি?

কমলেশ্বর- এটা বিরাট বড় প্রাপ্তি  কারণ আমরা যে পরিধির মধ্যে দাঁড়িয়ে গ্রাফিক্সের কাজ করি সেটার মধ্যে কোথাও না কোথাও বাধা থাকেই আমরা বিদেশে গিয়ে সেই কাজ করাতে পারি না বা বম্বের বড় বড় হাউসকে দিয়েও করাতে পারি না তা বলে গ্রাফিক্সের কাজ করাবো না তা হয় না কারণ শুধু বাংলা সিনেমাতে নয় ওয়ার্ল্ড সিনেমাতেও গ্রাফিক্স একটা বড় জায়গা নিয়ে নিতে চলেছে তাই সেই জায়গা থেকে বাংলা কেন পিছিয়ে থাকবে? আমাদেরও শিক্ষিত হতে হবে তাই অ্যামাজন অভিযানে গ্রাফিক্সের কাজ করেছি ও বাধ্যও হয়েছি কিছুটা করতে এবং আমার বিশ্বাস এই প্রচেষ্টা আংশিক ভাবে সফল হবেই…

তাহলে যারা ‘বুনিপ’ নিয়ে রসিকতা করেছিল তখন তাদেরকে যোগ্য জবাব দিতে প্রস্তুত?

কমলেশ্বর- নাহ আমি কাউকে জবাব দিতে চাই না। আমরা যখন বুনিপ তৈরি করেছিলাম সেটা কলকাতায় বসে করেছিলাম তখন মানুষের হয়তো অতোটা বিশ্বাসযোগ্য লাগে নি, ভালো লাগে নি কিন্তু আবার একটা কথা বলি শুধু বাংলা সিনেমাই নয় সারা পৃথিবীর সিনেমার দর্শক শুধুমাত্র গ্রাফিক্স দেখতে যান না, সেখানে সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, অ্যাক্টিং, মিউজিক , সাউন্ড, স্ক্রিনপ্লে সব মিলিয়ে মানুষ সিনেমাটা দেখতে যান। সেখানে শুধুমাত্র গ্রাফিক্স দিয়ে বিচার করাটা ঠিক হবে না, সবসময় যে গ্রাফিক্স ভালো হয় তা নয় আবার খারাপ হয় তাও নয়, তাই  এটা নিয়ে আমার মনে হয় না রসিকতার প্রয়োজন আছে বরং আমাদের আত্মানুসন্ধান করার প্রয়োজন  যাতে আরও ভালো করে কাজটা করতে পারি!

এখনো অবধি ‘অ্যামাজন অভিযান’ সবথেকে বিগ বাজেটের বাংলা সিনেমা, কেমন ছিল সেই অঙ্কটা?

কমলেশ্বর- আমি পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নই ব্যাপারটায় তবে যতটুকু জানি ১৯ কোটির কাছাকাছি গেছে…

ইন্ডাস্ট্রিতে একটা মজাদার ব্যাকবাইটিং শোনা যায় তোমাকে নিয়ে..

কমলেশ্বর- আমাকে নিয়ে একটা কথা চলে যে..অনেকে বলেন আমি নাকি সিনেমা করে অনেক টাকা নষ্ট করেছি! তাঁদের জন্য আমার উত্তর হল যাদের টাকা তারা যদি আমাকে খুশি হাতে নষ্ট করতে দেন সেখানে আমার কি করার আছে?

এই মুহূর্তের বাংলার সবথেকে বিগ বাজেটের দুটো সিনেমা তোমার ঝুলিতে তাহলে এই সেগমেন্টে হ্যাট্রিক করার প্ল্যান কি রেডি হয়ে গেছে?

কমলেশ্বর- (হাসি) নাহ সেরকম কিছু রেডি নেই! তবে মানুষের যদি ভালো লাগে তাহলে নিঃসন্দেহে শঙ্কর আবার নতুন কোন দুর্গম জায়গায় এগিয়ে যাবে…শঙ্কর আবার ফিরে আসতে পারে…

প্রশ্নের ওপারে- শুভদীপ কাজলী (এডিটর)।