“সবথেকে ভালো গল্প দেওয়ার লোক আমি পেয়ে গেছি!”- রূপম ইসলাম।

২০১৭’র ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে শীতের রাত, বাংলায় এই মুহূর্তে উঠতি পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম শমিক রায় চৌধুরী তার পরবর্তী চমক ‘জানলা’র ফাইনাল আউটপুট ভিডিও সময়মত রেডি করে পাঠিয়ে দিয়েছে গানের সৃষ্টিকর্তা মানে রূপম ইসলামের হাতে, কিছুক্ষন পরেই একটা ফোন আসে শমিকের ফোনে। ফোনের ওপারে ছিলেন রূপম ইসলাম। ঐদিকের মানুষটার কথাগুলো শোনার পর শমিক আবিষ্কার করলো কেন রূপম ইসলাম এই নামটা নিয়ে মানুষের এত উন্মাদনা? কেন একটা গান রিলিজ হওয়ার পর কোন প্রচার ছাড়াই জাতীয় স্তরে ট্রেন্ডিংএ উঠে আসার ক্ষমতা রাখে? কেন এই মানুষটার দর্শন বাংলার স্বাধীন গায়ক-গায়িকাদের কাজকে বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার রাস্তা দেখাচ্ছে ?… কি এমন মন্ত্র বলেছিলেন উনি, সে ব্যাপারে পরেই না হয় আলোকপাত করছি…ফসিলস ৫ রিলিজ করার পর আস্তে আস্তে যখন একটার পর একটা গান বেরোচ্ছে ততই মানুষের চাহিদা বাড়ছে, “স্তব্ধ জীবন”র ভিডিওতে ইঙ্গিত ছিল “জানলা” আসছে এবং তা হচ্ছে শমিক রায় চৌধুরীর গল্পতেই। অক্টোবরে “পালাও” রিলিজের পর উন্মাদনা আরও বাড়ে যে কবে আসছে “জানলা”। অবশেষে নতুন বছরের শুরুতেই ফসিলস খুলে দিল তার “জানলা”।

বাংলার ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিউজিক ভিডিওতে যোগ হল আরও একটা মাইলস্টোন, যা নিয়ে গেল ইউটিউবে জাতীয়স্তরে ট্রেন্ডিংএ দ্বিতীয় স্থানে। এই ভিডিওর সবথেকে চমৎকার দিক হল, সারল্য! একটা সহজ জিনিসকে সহজভাবে তুলে ধরা, এটা কিন্তু ভীষণ কঠিন কাজ। রূপম ইসলামের সহজ ভাষায় ভারী কথা বলে যাওয়ার সহজাত ক্ষমতা এবং শমিক রায় চৌধুরী’র গল্প বলার সারল্য মিশে তৈরি হল এই ম্যাজিক! আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন না, এই গানটা রূপম ইসলাম লিখেছিলেন ২০১১-১২ নাগাদ, তখন তিনি এটা লিখেছিলেন প্রেমের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিন্তু নতুন করে ভিডিওর জন্য যখন গানটার কথা ভাবা হয় তখন শমিক শেয়ার করে তার আইডিয়া, কেমন লেগেছিল সেই আইডিয়া বলতে গিয়ে ফোনের ওপারে রূপম ইসলাম বলতে শুরু করলেন “জানলা”র ওপারের গল্প,

”হ্যাঁ, গানটা অনেকদিন আগেই লেখা। ও যখন হঠাৎ করে এটার সাথে অমল, ডাকঘর রিলেট করলো তখন আমার খুবই চিত্তাকর্ষক লেগেছিল আইডিয়াটা কারণ আমি এরকম ভাবি নি! একটাই কথা বলেছিলাম যে, গানগুলো লাইনের সাথে যে দৃশ্যগুলো দেখানো হবে সেখানে যেন সামঞ্জস্য বজায় থাকে আর সেখানে ভীষণ সুন্দর কাজ করেছে শমিক!”

এই ভিডিওটা দেখার প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন ছিল ফসিলসের? সে প্রসঙ্গে শমিক বলেন,

“যখন প্রথম আমার মনিটারে ভিডিওটা চলছে তখন রূপমদা আর রূপসাদি তাকিয়ে স্ক্রিনের দিকে আর আমি তাকিয়ে দুজনের মুখের দিকে (হাসি) , আমি স্পষ্ট দেখলাম আস্তে আস্তে রূপমদার চোখদুটো বড় হচ্ছে, সঙ্গে একটা হাসি আর রূপসাদির তো গালভরা হাসি ছিল! আমি খুবই ভাগ্যবান ওঁদের কাজটা এত ভালো লেগেছে বলে…এটা আমার স্বপ্ন ছিল”।

এই গানটার ভিডিওতে শমিকের টিমের কাজ অনবদ্য সেখানে বলতেই হবে প্রসেনজিৎ, বৈশালী, সমৃদ্ধ, সায়ন, ঋষভ সহ পুরো ইয়ং একটা টিম যারা এই মুহূর্তে হয়ে উঠেছে রূপম ইসলামের বৃহৎ পরিবারের সদস্য, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই ট্রেন্ডটা আমি শুরু করতে চেয়েছিলাম যে, নতুনদের সাথে কাজ করা যেতে পারে, তাদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, তাদের স্বাধীনতা দেওয়া যেতে পারে , তাদের উপর ভরসা করেছি আবার একেবারে ছেড়ে দিয়েছি তা নয়! বকুনিও দিয়েছি খুব, নতুন যারা কাজ করেছে আমার সাথে প্রত্যেকেই বকুনি খেয়েছে কিন্তু যে রেজাল্টটা বেরিয়েছে তারপরে সেটা নিয়ে আজকে মানুষ উচ্ছ্বসিত!”

আপনাদের শুরুতেই একটা ফোনকলের কথা বলেছিলাম, আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল ভিডিওতে যে বাচ্চাটি (প্রিয়ম) অভিনয় করেছিল তার ভয়েস নেওয়া সম্ভব হয় নি কারণ তার পরীক্ষা চলছিল ফলত যে ইমোশেনটার প্রয়োজন ছিল সেটা অন্য কারুর গলাতে ফুটে উঠছিল না, আর এদিকে রিলিজ ডেট ঠিক হয়ে গেছে!  সেই সময় ফোনে শমিক পেয়েছিল এই অভিভাবক রূপম ইসলামকেই, যিনি বিশ্বাস করেন, কালকেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে তাই আজকেই আমাদের সর্বস্ব দিয়ে দিতে হবে, এটা মাথায় রেখে শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে!

কাজের প্রতি পারফেকশনই ২০০২ থেকে এখনো অবধি বাংলার স্বাধীন রক মিউজিকে ফসিলসের টিকে  থাকার মূল মন্ত্র। কাজের সাথে কোনরকম আপস করতে রাজি নন তিনি, তার জন্য ভিডিওটা যদি বাতিলও করতে দু’বার ভাববেন না। শেষে এই বাচ্চাটিই রেকর্ড করে এবং রিলিজ হয় ঠিক সময়ে। সবশেষে অভিভাবক দিলেন একটা দরাজ সার্টিফিকেট পরিচালক শমিককে, “ও আমার পরিবারের সদস্য হয়ে গেছে, সিনেমাতে যেমন পরিচালক-সঙ্গীত পরিচালক’র একটা জুটি থাকে তেমনই সিনেমার বাইরে এটা আমাদের একটা বিরাট জুটি! রূপম-শমিক জুটি। আমি মিউজিক ভিডিওগুলোর জন্য গল্প চাইছিলাম আর সবথেকে ভালো গল্প দেওয়ার লোক আমি পেয়ে গেছি, সে হল শমিক!” আপাতত শমিকের পাখির চোখ এখন “মৃত মানুষ”, অপেক্ষায় আছে রূপম ইসলামের গ্রিন সিগন্যালের। ফোন রাখার আগে অবশ্য পাওয়া গেছিল পরিচিত রসিক রূপম ইসলাম’কে,

“অন্য কোন পরিচালক তো আমাকে নিল না তাই আমি নিজেই নিজের পরিচালক তৈরি করে নিলাম!”(হাসি)

ফোনের ওপারে- শুভদীপ কাজলী (এডিটর)।