“দাদা, একটু আস্তে হাসবেন প্লিজ!”

বাংলা সিনেমাতে শেষ কিছু বছর একটা খরা চলছিল, সহজ সরল হাস্যরসের উপাদানগুলো যেন বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছিল আদ্যপান্ত ‘কমেডি’ জনার খ্যাত সিনেমাগুলো থেকে আর যদিও বা কিছু ছিল তাতে রীতিমত জোর করে হাসিটা বেরিয়েছে দর্শকদের থেকে! বোধহয় খরাটা কাটলো নইলে ‘মাইকেল’ দেখতে বসে দুজন মাঝবয়সী ভদ্রলোকের মিনিটে মিনিটে অট্টহাসিকে সামাল দিতে পেছনের সারিতে বসা লোকটির হুমড়ি খেয়ে সবিনয়ে আবেদন,

“দাদা, একটু আস্তে হাসবেন প্লিজ!”…

বেশ বোঝা যাচ্ছিল সত্রাজিৎ সেনের এতো বছরের পরিশ্রম, স্বপ্ন আজ সফল হয়েছে, স্বপ্নের নাম “মাইকেল”। সিনেমার মধ্যে সিনেমা তাকে ঘিরে কমেডি আর পুরো ব্যাপারটাকে ঘিরে আছে একটা সিরিয়াসনেস…এতোগুলো লেয়ারকে হ্যান্ডেল করা মোটেই সহজ কাজ নয়। তবে এই শক্ত কাজে দুটো ফ্যাক্টর ভীষণ স্পষ্ট, প্রথমত অভিনয় বিভাগ আর দ্বিতীয়ত স্ক্রিপ্ট ও মিউজিক। সিনেমার শুরুতে আপনাদের স্বস্তিকার লাস্যময়ী রূপে চুরমার হয়ে মীরের লিপস্টিক মাখা চুমু খেয়ে ঢুকতে হবে মাইকেলের সিনেমা বানানোর সফরে। সেখানে মজা তো আছেই সাথে শুরুর দিকে মাঝে মধ্যেই উস্কে দিচ্ছিল অঞ্জন দত্ত মার্কা একটা ফিলিং আর শেষেপাতে একটু রাজেশ খান্না মার্কা ফিলিংও পাবেন..কেন এই কথাগুলো বলা তার জন্য সিনেমাটা দেখতে হবে আপনাদের।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত একজন লেজেন্ডকে এইভাবে ট্রিবিউট করা যায়, না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না! ওনার মত সিরিয়াস অভিনেতাকে এইরকম একটা রঙিন চরিত্রে দেখে আপনার মনটাও রঙিন হয়ে যাবে এবং ওনাকে অবশ্যই যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে মীর, স্বস্তিকা, অরুণিমা, তনুশ্রী, সায়নীরা… বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী’র চরিত্রে ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য মীর-স্বস্তিকা জুটি।

হাসি-মজা, মান-অভিমান সব মিলিয়ে এই জুটি সিনেমার সেরা প্রাপ্তিগুলোর মধ্যে একটা। ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের অনেক সত্যি ঘটনা বেশ মজা করে দেখিয়েছেন পরিচালক সেন। মাইকেল আর ময়ূরবাহনের কাণ্ডকারখানা উপভোগ করার মাঝে যদি লগ্নজিতার গলায়, “হয়তো মন সাতকাহন ঘরে ফিরতে চায়…” শুনে নিজের মধ্যে হারিয়েও যান তারপরই মীর (মাইকেল) বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (ময়ূরবাহন) দায়িত্ব নিয়ে আপনার মুখের হাসি ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।

এই সিনেমার আরেক বড় প্রাপ্তি সঙ্গীত পরিচালক ইন্দ্রজিৎ দে, নিজের প্রথম সিনেমার অ্যালবাম অবশ্যই মানুষ মনে রাখবেন। ূতবে কিছু ফাঁকফোকরও আছে সিনেমাতে, স্ক্রিন-প্লে’তে আরও কাজ করার জায়গা ছিল, কিছু চরিত্রে অভিনয় করার সেইভাবে জায়গা ছিল না এবং দু’এক জায়গায় টেকনিক্যাল ত্রুটি থাকলেও পুরো ব্যাপারটা বেশ চাপা পড়ে গেছে কমেডি আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্যারিশমাতে।

প্রথম বাংলা ছবিতে অনেকটাই আশা জাগালেন পরিচালক সত্রাজিৎ সেন, তাই আপনারাও অবশ্যই দেখে আসুন “মাইকেল” আপনার কাছের সিনেমাহলে। আর যে দুই ভদ্রলোকের কথা বলে শুরু করেছিলাম, তারা পেছনের লোকটির ‘বারণ’ সত্ত্বেও চেপে রাখতে পারেন নি নিজেদেরকে অগত্যা সিনেমার দ্বিতীয়ভাগে পেছনের সারিতে বসা লোকটিও সব ছেড়ে সামিল হয় অট্টহাসিতে… এবার আপনাদের পালা!