বলি-টলি’কে ধোঁয়াশাতে রেখে তাহলে এই কাজ হচ্ছিল ?

ধোঁয়াশাতে

২০১৬’র মাঝামাঝি, সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ মাথায় ঘুরছে সিনেমা নিয়ে পড়াশুনা করার চিন্তা, জার্নালিস্ট হওয়ার চিন্তা, কাজ করতে শুরুও করে দিয়েছি এই গুলগালের হয়ে তখনই একটা ইভেন্টে উড়ো খবর পেলাম ভারতের এই মুহূর্তের এক নং গায়ক , অরিজিৎ সিং নাকি সিনেমা বানাচ্ছেন পরিচালক হিসেবে! এই সিনেমাতে আবার নাকি প্রোডাকশনের দায়িত্বে আছেন এবং কলকাতা থেকে টিম বানিয়ে অরিজিৎ ও তাঁর টিমকে মুর্শিদাবাদের শুটিংএ সাহায্য করছে বাংলার অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতা সৌম্যজিৎ মজুমদার আর কাস্টিং করছে  তাঁরই কোম্পানি “লোক ইন্দি স্টুডিও”…

আগস্ট,২০১৭… এই সময় আমার অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি’র সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে একটা গুজবকেই প্রথম প্রশ্ন হিসেবে রাখি, আপনি নাকি মুর্শিদাবাদের কোন এক প্রতন্ত্য গ্রামে চাষবাস করছেন? হেসে জানান, “হ্যাঁ, ওটা অরিজিৎ সিং’র একটা সিনেমার জন্য!” এবং সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গেলে বলেন, “এই সিনেমা একটা অন্য ধারার সিনেমা, ‘পথের পাঁচালী’র পর এরকম কোন সিনেমা হচ্ছে যা এর আগে এখানে হয় নি!” গত সপ্তাহে  ইম্পা চত্বরে একটা খবর চাউর হয় ঐ সিনেমার কাগজপত্র নাকি টাইটেল রেজিস্ট্রেশনের জন্য জমা পড়েছে! একটা সিনেমা যার শুটিং হয়ে গেল বাংলার বুকে তাও আবার অরিজিৎ সিং পরিচালক, এতো বড় স্কুপ নেই কোন মিডিয়াতে! কিন্তু কেন ধোঁয়াশাতে ?  সেই সবকিছুর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে আপনাদের একটু পিছিয়ে নিয়ে যাব ২০১২’র দিকে কারণ সাংবাদিকতার জীবনে ঢোকার আগে বেড়ে ওঠার কিছু স্মৃতি এই ঘটনা চক্রে ফেসবুকের টাইমলাইন ট্র্যাক করতে গিয়ে ভেসে উঠলো আরও কিছু সত্যি যেটা হয়তো এই সিনেমার ধোঁয়াশা অনেকটা কাটাবে ও প্রত্যাশা বাড়াবে…

২০১২ সাল, সদ্য স্কুল জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মহানগরীতে আগমন, উদ্দেশ্য উচ্চশিক্ষা কিন্তু তারপাশে বরাবরই ঝোঁক ছিল মিডিয়া, সিনে লাইফ, ইভেন্ট, থিয়েটার, একক সঙ্গীত, অ্যালবামের গান ইত্যাদির দিকে কিন্তু এইসব মিলিয়ে আমার কাছে এগুলো ছিল শৃঙ্খলহীন মেঘের মত। তাই বাছ-বিচার না করেই ক্লাস বাঙ্ক করে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলাম নন্দন থেকে আইনক্স, অ্যাকাডেমি থেকে ম্যাক্স মুলার, এই ফেজেই হঠাৎ কানে এল ধর্মতলাতে হগ মার্কেটের সামনে নাকি রাস্তার উপর আর্ট ওয়াক হবে! ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক লাগলো!

জুন-জুলাই মাস , ২০১২ এখনো মনে আছে দিনটা, ওখানে পৌঁছে  আস্তে আস্তে হাজার দু’য়েক তরুণ রক্তের ভিড় ঠেলে এগোতেই স্পষ্ট হল, শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের একটা স্বতস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস! রাস্তায় ওরা গাইছে, নাটক করছে, ঠেলাগাড়িতে দড়ি টাঙিয়ে সেখানে ছবি প্রদর্শনী করছে আর সব কিছু ছাপিয়ে এতো তরুণের উন্মাদনা, নাহ এই রেশটা এখনো বেশ তাজা ! সেই ভিড়ে একটা নাম অস্পষ্টভাবে কানে এসেছিল, “লোক ”। Indian youth for arts and Change festival শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে “লোক”র তত্ত্বাবধানে,পরবর্তীকালে এই উৎসব জাতীয় স্তরে সম্মানের সাথে স্বীকৃতি পায়। জানলাম ওরা নাকি স্বতন্ত্রভাবে থিয়েটার করে দেশের অনেক শহরে ঘুরে ঘুরে, একটা স্বাধীন চিন্তায় তৈরি তৎকালীন তরুণ তুর্কির দল!

২০১৩, সব চিন্তা উড়িয়ে সদ্য কেনা স্মার্ট ফোনের প্লে-লিস্টে ঢুকেছে বাংলার গর্বের মুখ অরিজিৎ সিং’র “তুম হি হো”, এই গানটা ছিল একটা নেশা, সিনেমাটা ভালো না লাগলেও শুধু এই গানটা আর বাকি গানগুলোর জন্য হলে শুনতে ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো কেটেছিলাম আইনক্সে কারণ গানটা আরও পরিষ্কারভাবে শুনতে হবে, অনুভব করতে হবে, সেখানেই মজে যাচ্ছি বারবার ঠিক তখনই শেষের দিকে ঝটকা লাগলো একজন বেঁটে সাংবাদিককে দেখে! আরে এ তো “লোক”র কর্নধার, একবছর আগে হগ মার্কেটের সামনে? হ্যাঁ একদম ঠিক, খোঁজ নিলাম ইনি হলেন সৌম্যজিৎ মজুমদার। হলের মধ্যে লোকটার উপর চরম রাগ হলেও ভালো লাগলো যাকে চোখের সামনে দেখেছি তাঁর জন্য সেইসময়ের সব থেকে হিট সিনেমার গল্পটা পরিনতির দিকে এগিয়েছিল! যাই হোক চেষ্টা করলাম ফেসবুক এনাকে খোঁজার, পেয়েও গেলাম কিন্তু অ্যাড করা যাচ্ছিল না…

মে, ২০১৪ ’তে অরিজিৎ সিং’র ফেসবুক পেজের একটা ছবির মধ্যে দেখা যায়  ওঁর বাড়ির দেওয়ালের ছবিগুলো ওঁর সবথেকে প্রিয় বন্ধুদের সম্ভবত সেখানে সেই সাংবাদিক ওরফে সৌম্যজিৎ মজুমদারের ছবি আর তার কিছু মাস পর নভেম্বর, ২০১৪তে ওঁর প্রোফাইলে অরিজিৎ’র সাথে ছবি এবং তার সাথে আবেগপ্রবণ লেখাটি যা নিশ্চিত করে দিল এই বন্ধুত্বটা শুরু হয় সেই “আশিকি ২”র ডাবিং স্টুডিও থেকে। যাই হোক এই দু’জনের বন্ধুত্ব তো বেশ গভীর বোঝা গেল…

এই পোস্ট করা হয় যখন লোক ইন্দি স্টুডিও’র তখন ৬ মাস এখন  এটা “লোক”র অন্যতম প্রধান শাখা যা কলকাতা আর বম্বেকে দিয়ে এসেছে অনেক প্রতিভা, যেমন ধরুন শতাফ ফিগার, ইশান মজুমদার , স্নেহা ঘোষ, এছাড়াও লোক’র থিয়েটার থেকে নতুন প্রজন্মের একঝাক শিল্পী উঠে এসেছে যেরকম নীল ভট্টাচার্য, একতা ভট্টাচার্য থেকে সদ্য রিলিজের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা “প্রজাপতি বিস্কুট”র লিড আদিত্য সেনগুপ্ত । শুধু কলকাতায় নয় বম্বের বেশ কিছু সিনেমা যেমন “কাহানি ২”, “তামাশা”, “তিন”, “পরী” (এখনো রিলিজ হয় নি, অনুস্কা শর্মা’র প্রোডাকশন)’র মত সিনেমাতে করেছে এখন কলকাতার অন্যতম কাস্টিং কোম্পানি লোক ইন্দি স্টুডিও ! কিন্তু অরিজিৎ’র সিনেমার জন্য কাস্টিং-অডিশনের কোন খবর নেই  আর ওদিকে মুর্শিদাবাদের কোন এক প্রতন্ত্য গ্রামে নাকি হয়ে যাচ্ছে সিনেমার শুটিং, বেশ চমকে দেওয়ার মত খবর কিন্তু কোথায় হচ্ছে? কোন গ্রামে? সে ব্যাপারে কোনরকম লিড নেই ইন্ডাস্ট্রি বা মিডিয়ার কাছে , ব্যাপারটা ধোঁয়াশাতে রাখল দুই বন্ধু!

আগস্ট ২০১৭; … ২০১২-১৩ থেকে এখনো অবধি এই দু’জন চুটিয়ে কাজ করে গেছেন বম্বে ও কলকাতায় নিজের নিজের জায়গায়! অরিজিৎ সিং আজ পর্যন্ত টলি-বলি সব জায়গায় একের পর এক হিট হিট গান দিয়েছেন যে এটা নিজেই একটা রেকর্ড আর ওদিকে সৌম্যজিৎ মজুমদারও একের পর এক সিনেমাতে অভিনয় করার দরুন পরিচালকের লিস্টও লম্বা সৃজিত মুখার্জি থেকে অরিন্দম শীল, মৈনাক থেকে বিরসা, তারপর অনিকেত চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিচিগান ,লিস্টটা বেশ ইন্টারেশটিং! তবে সম্প্রতি “আলেয়া”র প্রেস কনফারেন্সে তিনি জানান,এখনো অবধি ২৫টি ভিন্ন ধরনের সিনেমার করার পর অভিনয়কে নন এখন প্রাধান্য দিতে চান ভারতের তথা বাংলার আঞ্চলিক সিনেমাকে গ্লোবাল স্বীকৃতি দেওয়াতে বেশী উদ্যোগী এবং তারজন্য ইনভেস্টরদের সাহায্যে সেই কাজগুলোকে নিয়ে স্বতন্ত্র পথে এগোচ্ছেন। কলকাতার ভিন্নস্বাদের সিনেপ্রেমীদের কাছে খবর আছে এই বছর ইনি কাজ করছেন আরও দুটো ইন্তারন্যাশেনাল সিনেমাতে মুখ্য ভূমিকায়, এই বছর বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ পরিচালক এরিক গ্রাভেল’র “ক্রাশ টেস্ট আগালে”তে অভিনয় করেছেন যেটা কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়েছে, বোধহয় উনিই প্রথম নবীন প্রজন্মের (২৬ বছর) অভিনেতা যার সিনেমা কান, বার্লিন, স্টকহোম, স্ল্যামডান্স’র  মত বিশ্বমানের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখানো হল। তবে এটা অনেকেই জানেন না সৌম্যজিৎ’র ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে কানেকশেন ইদানিং নয়,  প্রথম ডেবিউ সিনেমা “গান্ডু”, যেটা  বার্লিনের মত ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে স্ক্রিনিং হয়!  একটা গুজব শোনা যাচ্ছে ডিসেম্বরে বম্বেতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্ট ফিনান্সিং সামিটও আয়োজন করছেন তিনি এবং আরও শোনা যাচ্ছে এখন টলিপাড়ার বেশ কিছু নামী পরিচালকের প্রোজেক্ট ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু কিসের স্বার্থে?   উত্তরটা হয়তো আপনারা আন্দাজ করতেই পারছেন…

এবার আরেক প্রশ্ন হচ্ছে এতো বড় একজন গায়ক এইরকম মাপের একটা প্রোজেক্ট করছেন তাও টলি-বলি ইন্ডাস্ট্রিকে ও মিডিয়াকে ধোঁয়াশাতে রেখে কেন? সঠিক কোন উত্তর এটার নেই কিন্তু একটা সম্ভাবনা আছে যেটাকে অস্বীকার করারও উপায় নেই… অরিজিৎ সিং এমন একজন গায়ক যিনি যেকোন গানকে নিজের ক্ল্যাসিকাল টাচ দিয়ে একদম অন্য রকম মাত্রা দিয়ে দেন! হিন্দুস্থানি ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের মাস্টার এখন নতুন কিছু করতে চান , সেটা শুধু গানেই নন, নিজের শিল্পসত্ত্বার সবটুকু ব্যবহার করে, হয়তো সেই চিন্তাভাবনা থেকে সিনেমাটা করা এবং সেখানে সিনেমার বিষয়বস্তু মানুষের সাথে কথা বলবে, রিলিজের পরই সেটা সম্ভব তার আগে না কারণ অরিজিৎ যতটুকু কথা বলেছেন নিজেকে নিয়ে মিডিয়াতে সেখানে স্পষ্ট নিজের ঢাক পেটানো তাঁর ধাতে নেই। তাঁর সৃষ্টি সরাসরি কথা বলবে দর্শক,শ্রোতাদের সাথে…প্রোডাকশন আর ডিস্ট্রিবিউশন কনসাল্টেন্ট হিসেবে যার আরেক পরিচয় সেই সৌম্যজিৎ ইম্পাতে ইলেকশেনের ব্যস্ততার সময়েও বন্ধু অরিজিৎ’র সিনেমার টাইটেল রেজিস্ট্রেশন বের করিয়ে নিলেন তবে টাইটেলটা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হলেন আপাতত। অভিনেতা অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি’র মতে, “এই সিনেমা এখন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে ঘুরবে তারপর হয়তো রিলিজ করবে দেশে কিন্তু সেটা পুরোপুরি অরিজিৎ’র উপর নির্ভর করছে”… এখন একটাই কথা বলার, সিনেমাটা আসছে ,সেটা শুট হয়েছে একদম কনফার্ম… এখন এই সিনেমা দেখার পর যেন এই দু’জনকে একসাথে সামনে পেলে একটাই কথা বলতে পারি, “এরকম ধোঁয়াশাটা আগামীদিনেও বজায় রাখুন তাহলে হয়তো প্রত্যেকবার আরও নতুন নতুন শিল্পসৃষ্টির আমেজটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবো!”…

ছবি সৌজন্যে- ফেসবুক।